Saree Draping Tips

শাড়ির সহজ-পাঠ! বারো হাতের সাজে আসুক স্বাচ্ছন্দ্যও, শিখে নেওয়া যাক পরার নয়া ধরন

সরস্বতী পুজো মানেই শাড়ি। কিন্তু শাড়ির কদর কমে আসছে নতুন যুগে। নেপথ্যে কি যাপন শৈলীর পরিবর্তন অথবা আধুনিক জীবনের হাজার বায়নাক্কার দোহাই দিয়ে স্বীয় সংস্কৃতির প্রতি এক দায়হীন উদাসীনতা। কিন্তু এই বারো হাত শাড়িই ব্যস্ত জীবনের উপযুক্ত পোশাক এবং কেতাদুরস্ত সাজ হয়ে উঠতে পারেন। সেই শাড়ি পরার ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়েই লিখছেন শর্মিলা বসুঠাকুর।

Advertisement

শর্মিলা বসুঠাকুর

শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮
Share:

শাড়ি পরার সহজ-পাঠ। — নিজস্ব চিত্র।

শাড়ি ভাবলেই বেশ একটা আদুরে, আলসে, আরামের ছবি ভেসে ওঠে। বেশ লেপ্টে থাকা ভালবাসায় জড়ানো। খেয়াল খুশি মতো সাজানো যায় তাকে। আটপৌরে, মায়াময় আবার চটকদারও বটে। এখানেই শাড়ির মাহাত্ম্য। সে বহুমুখী। বৈপরীত্যে দিশেহারা নয়। রান্নাঘরের আটপৌরে ধরন থেকে শুরু করে কলেজের ফর্মাল স্টাফ রুম, সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি থেকে কর্পোরেট মিটিং, আকাশপথে অতিথিসেবা থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মঞ্চ, সর্বত্র এর অনায়াস, অবাধ, অক্লেশ গতিবিধি। বন্ধনহীন, বিস্তৃত এই মায়া নিরাকার। কিন্তু যথাযথ অবয়বে সে-ই আবার চোখধাঁধানো, লাস্যময়ী। এই বারো হাতের মায়ার বন্ধনে এক বার জড়ালে তাঁহা, ফ্যাশনিস্তাও স্বেচ্ছায় বশ্যতা স্বীকার করে। এত ক্ষণ ধরে এই যে শিবের গীত গাইছি, তার কারণ এই গুণীর কদর আজকাল আমরা করে উঠতে পারছি না। তার পিছনে কিছু সঙ্গত কারণ থাকলেও সবটাই কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয়। দুরন্ত গতির জীবন চক্করে শাড়ি বেশ পিছনের সারিতে স্থান নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু যাপন শৈলীর পরিবর্তনই কি তার একমাত্র কারণ? নাকি আধুনিক জীবনের হাজার বায়নাক্কার দোহাই দিয়ে স্বীয় সংস্কৃতির প্রতি এ এক দায়হীন উদাসীনতা?

Advertisement

আমাদের ছোটবেলায় বা বলা ভাল, কিশোরীবেলায় পুজো-পার্বণ, বাড়িতে বিয়ে কিংবা গানের স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান মানেই তো শাড়ি। এখন সে সব পাট একেবারে চুকেবুকে গিয়েছে, তা কিন্তু বলছি না। কিন্তু চলতে ফিরতে চারপাশটা নজর করলে কোথাও একটা তফাত চোখে পড়ে। আমাদের এই প্রিয় পরিধানের প্রতি প্রীতি, ভালবাসার একটা অভাব ঘটেছে। আসলে সব ভালবাসাকেই জিইয়ে রাখতে যত্ন করতে হয়, মায়ায় লালন করতে হয়, তবেই না সে শিকড়বাকড় বিছিয়ে পাকাপাকি ভাবে বসত করে। চলুন আমাদের এই অনন্য পরিধানের প্রতি ভালবাসা জিইয়ে রাখতে, তাকে নতুন করে ভালবাসতে এই বারো হাতের তেরো কাহন শোনাই আপনাদের।

ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন ধরনের শাড়ি বোনা হয়। আসলে শাড়ি মানে তো শুধুই একটা বারো হাতের বস্ত্রখণ্ড নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নির্দিষ্ট সেই দেশের বা অঞ্চলের জলবায়ু, আবহাওয়া, ইতিহাস, উপাদানের সহজলভ্যতা, সংস্কৃতি, পেশা, জাতিগত রীতি-রেওয়াজ, তাঁতি পরিবারের পরিশ্রম আর মুন্সিয়ানার গল্প। মানে হ্যান্ডলুম বা তাঁতে বোনা শাড়ির কথা বলছি। আমার যেহেতু হ্যান্ডলুম শাড়ির প্রতি বিশেষ ভালবাসা, তাই তাকে দিয়েই শুরু করলাম (হ্যান্ডলুম শাড়ির প্রতি বিশেষ ভালবাসা রয়েছে বলে, তা দিয়েই শুরু করা যাক)। যদিও টিকে থাকার লড়াইয়ে আজ সে জেরবার, ক্লান্ত, কিছুটা পরাজিতও বলা যেতে পারে। ভাল সুতোর আকাশছোঁয়া দাম, বিজাতীয়, সস্তা, খারাপ মানের সুতোর রমরমা, মুনাফার লোভ, পারিবারিক পেশায় নতুন তাঁতি প্রজন্মের আগ্রহের অভাব এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত ভাল জিনিসের প্রতি কিছুটা অনীহা এবং অজ্ঞতা, এমন সব নানা কারণে তাঁতের শাড়ির স্নিগ্ধ বৈভব আজ অনেকটাই বিপন্ন। তবুও ওড়িশা, গুজরাত, তামিলনাড়ু বা দক্ষিণের অন্যান্য প্রদেশে এখনও ভাল কাপড় চোখে পড়ে।

Advertisement

শাড়িটি হাতে বহরে অনেকটাই বড়। তাই ধুতি স্টাইলে পরাতে সুবিধে হয়েছে। — নিজস্ব চিত্র।

এ বার আসি শাড়ি পরার ধরনধারণ নিয়ে। ফ্যাশনের ব্যাকরণের জটিল খুঁটিনাটি নিয়ে মাথা না ঘামিয়েও একটা কথা সহজেই বলা যায়, স্বাছন্দ্যই হল গোড়ার কথা। তাই বলে কূপমণ্ডূক হয়ে থাকলেও চলবে না কিন্তু। একটু উদার মানসিকতার দখিনা বাতাস বয়ে যেতে দিলে, স্বাছন্দ্য আর উদারতার যথাযথ ভারসাম্যে আপনার ফ্যাশন অভিধান একেবারে ঝকঝকে, আধুনিক।

শাড়ি পরার রীতিনীতি নিয়ে বিশদে গবেষণা করেছেন ঋতা কপূর চিস্তি। দিল্লির বাসিন্দা এই গুণী মহিলার পেল্লায় এক বই আছে। ‘সারিজ়, ট্র্যাডিশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’ তার নাম। শাড়ি ‘ড্রেপিং’, অর্থাৎ শাড়ি পরার আকর গ্রন্থ বলা যেতে পারে। ঋতার শাড়ি ‘ড্রেপিং’-এর কর্মশালায় গিয়ে দেখেছিলাম, আমাদের প্রিয় পোশাকের পরিধান ও স্টাইলিংকে কী ভাবে এক শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়! বাংলা, বিহার,ওড়িশা, গুজরাত, কেরল, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, গোয়া, বিভিন্ন প্রাদেশিক রীতি তো আছেই, তা ছাড়াও আছে আরও বহু বিকল্প, যা শহুরে, সহজ, নজরকাড়া। আমাদের রোজের শাড়ি পরার ধরন ছাড়াও ওই একই শাড়িকে শুধুমাত্র পরার কায়দার পরিবর্তনে একেবারে একটা ভিন্ন রূপ দেওয়া যায়। নানা ধরনের ‘ড্রেপিং’-এর সুবিধে হল, সহজেই সবার মাঝে অনন্য হয়ে ওঠা যায়। আনারসি বেনারসি, হিরে জহরতের মাঝেও আপনি অমল আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন শুধুমাত্র আপনার শাড়ি পরার কায়দার অনন্যতায়। খুব সাধারণ শাড়িও অসাধারণ হয়ে ওঠে পরার কায়দায়। সঙ্গে ব্লাউজ়, গয়নার যথাযথ সঙ্গত থাকলে তো আর কথাই নেই। সেই পথ তো আজ থেকে বহুযুগ আগে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী দেখিয়ে গিয়েছেন। আমাদের সাধারণ ভাবে শাড়ি পরা, যাকে বলে, ঠাকুরমা-দিদিমারা যেমন ভাবে পরতেন, কাঁধে আঁচলের খুঁটে চাবির গোছা ফেলে, পানটি মুখে গুঁজে নিলেই তাঁদের সাজ সম্পন্ন। সেই আটপৌরে পরার ধরনেরই অনেক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে পারে, শিখিয়েছেন ঋতা।

জলপাইগুড়ি স্টাইলে পরানো এই ‘ড্রেপ’ দেখে ‘ড্রেস’ বলে ভুল হতে পারে। — নিজস্ব চিত্র।

ওড়িশার বুনটের জুড়ি মেলা ভার, তাই সেই প্রদেশের তিন শাড়ি বেছে নিতে পারি। তিন রকম ভাবে পরানো যেতে পারে। টুকটুকে লাল সুতির শাড়িতে সরু পাড়ের বুনটে ঐতিহ্য ধরা রয়েছে। শাড়িটি হাতে বহরে অনেকটাই বড়। তাই ধুতি স্টাইলে পরাতে সুবিধে হয়েছে। শাড়ি উজ্জ্বল, তাই খাদি ব্লাউজ়ে ধূসরতার ছোঁয়া। কাঞ্জিভরমেও এই ‘ড্রেপিং’ খুব ভাল দেখাবে। মাটি ছোঁয়া লম্বা আঁচল পিছনে প্লিট করে রাখতে পারেন অথবা সামনে ঘুরিয়ে কোমরেও গুঁজতে পারেন। শীতের সময়ে ফুলহাতা স্কিভি দিয়েও দারুণ মানাবে।

অফ হোয়াইট আর লালের যুগলবন্দির শাড়ির আঁচল ঠাস বুনটে ভরা। তাই সেই আঁচলের কদর তো আমাদের করতেই হবে। এই শাড়ি পরার শুরুটা আমাদের সাধারণ ভাবে পরার মতোই। তার পর পিছন থেকে আঁচল ভাঁজ করে সামনে পেটের কাছে গিঁট বাঁধা হয়েছে। জলপাইগুড়ি স্টাইলে পরানো এই ‘ড্রেপ’ দেখে ‘ড্রেস’ বলে ভুল হতে পারে। সঙ্গে লম্বা হাতা ব্লাউজ, শার্ট, ক্রপ টপ পরতে পারেন। বমকাই, বেগমপুরী, ভুজরি— যে সব শাড়ির আঁচল ভারী এবং সুন্দর, সেই সব শাড়িতে এই কায়দা মানানসই হবে।

এই শাড়িতে সামনে কুঁচিতে বক্স প্লিট করে, পিছন থেকে আঁচল ডান কাঁধের উপর দিয়ে সামনে আনা হয়েছে। — নিজস্ব চিত্র।

গোলাপি সিল্ক শাড়িটি রঙেই বাজিমাত করেছে। তাই সামনে কুঁচিতে বক্স প্লিট করে, পিছন থেকে আঁচল ডান কাঁধের উপর দিয়ে সামনে আনা হয়েছে। সঙ্গে বেগনি শার্ট। শার্ট যাঁরা পরেন না, বা শার্ট কলার হয়তো সবাইকে মানাবেও না, তাঁরা অন্য যে কোনও নেক লাইনের লম্বা শার্ট বা টপ পরতে পারেন। সঙ্গে আবক্ষ হার বা লম্বা হার।

শাড়ি পরার ধরন অনন্ত। কোথায় যাবেন, কখন যাবেন, কী শাড়ি পরবেন, তার উপরে নির্ভর করবে আপনি কেমন ভাবে শাড়ি পরবেন। ‘‘শাড়ি পরা খুব ঝক্কির’’, ‘‘আমাকে একেবারে মানায় না’’, ‘‘সময়ের অভাব’’— এই সব যুক্তি কিন্তু একেবারেই গ্রাহ্য নয়। শাড়ি সবচেয়ে সুন্দর ভারতীয় পোশাক, আমাদের পরিচিতি, আমাদের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সেই ঐতিহ্যের বিস্তারে আমরা সচেষ্ট হব না!

(ছবি: দেবর্ষি সরকার, সাজশিল্পী: শর্মিলা বসুঠাকুর, রূপটান: রাহুল নন্দী)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement