শিফনের অবাধ গতি গ্রীষ্মেও। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
প্যাচপ্যাচে গরম শুরু হয়ে গিয়েছে। মাঝে মধ্যে কিঞ্চিৎ মেঘলা আবহ কিংবা বৈশাখী হাওয়া ক্ষণিক স্বস্তির আশ্বাস দিলেও গরম এবং ঘামই সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে। কিন্তু তাই বলে অনুষ্ঠানের কমতি নেই। নেমন্তন্নের অভাব নেই। পার্টি, গেট টুগেদার, কফি মিট, লাঞ্চ, ডিনার, নিদেনপক্ষে ঘরোয়া আড্ডা লেগেই আছে। যদিও আমাদের আজকের জীবন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, তবুও শীতকালের মতো ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে গরমে ঠিক যেন সাজগোজ করা যায় না। আর আপনি যদি শাড়ি পরতে ভালোবাসেন, তা হলে তো ক্ষেত্র আরও সীমিত। কী পরব ভাবতে বসলেই মনে হয় এটা মোটা, ওটা চড়া রং, এটা ফুল হাতা। আলমারির প্রায় সব জামাকাপড়ই বাইরে স্তূপীকৃত, তবুও গরমকালের আদর্শ পোশাক বেছে ওঠা গেল না। এটা আপনার একার সমস্যা নয়, অনেকেরই এমন চুল ছেঁড়া অবস্থা হয় গরমকালের সাজপোশাক নির্বাচনের সময়। নেমন্তন্ন ছাড়াও রোজকার কাজের জায়গা তো রয়েছেই।
গরমে সেজেগুজে ফুরফুরে মেজাজ বজায় রাখতে শিফন শাড়ির জুড়ি মেলা ভার। শিফন নিজেই ফুরফুরে মেজাজের, লাস্যময়ী, আদরে আবেগে জড়িয়ে ধরতে ভালবাসে, আর স্যুটকেস কিনতে গেলে বিক্রেতারা গর্বের সঙ্গে যে বিশেষণটি ব্যবহার করেন, ‘লাইট ওয়েট’, সেটি এই মোহময়ীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই বার এই হালকা, আবেদনময়ী কন্যের গুণরাশি যদি মন দিয়ে দেখেন, তা হলে এককথায় বলা যায়, তিনি ‘সামার ফ্রেন্ডলি’। শিফনের সামারি দাঁড়ালো এই।
গরমে সেজেগুজে ফুরফুরে মেজাজ বজায় রাখতে শিফন শাড়ির জুড়ি মেলা ভার। — নিজস্ব চিত্র
আচ্ছা, শিফন বললেই এক লহমায় কার কথা মনে পড়ে বলুন তো? রাজমাতা গায়ত্রী দেবী। সুন্দরী, সম্ভ্রান্ত, কেতাদুরস্ত এই রমণীর অঙ্গে অধিকাংশ সময়েই শিফন শাড়ি, গলায় মুক্তোর মালা। লাস্যময়ী শিফন কন্যার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। রাজমাতার অঙ্গে তিনি তাঁর হাস্য-লাস্য ছেড়ে বেশ বনেদি মেজাজের। শিফনের ঘোমটায় তাই তো গায়ত্রী দেবী রাজকীয় স্বমেজাজে। ভারতীয় ফ্যাশন মানচিত্রে বিলাসিতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে শিফনকে তুলে ধরার পিছনে কোচবিহারের মাহারানি, গায়ত্রী দেবীর মা ইন্দিরা দেবীর অবদান অনেকখানি। ফ্যাশনের মক্কা প্যারিস বেড়াতে গিয়ে রানিমার নজর পড়ে খাঁটি সিল্ক থেকে তৈরি শিফন কাপড়ের দিকে। ফ্রেঞ্চ শিফনের থান। যেমন নাম, তেমন দাম। সেই শুরু। প্যারিস থেকে শিফন থান আসত, তার পর কখনও এম্ব্রয়ডারি, কখনও পাড় বসিয়ে তৈরি হত রানিমাদের শাড়ি।
বিলাসিতার উচ্চাসন থেকে শুরু করে গরমে আরাম দিতে সে সমান ভাবে স্বচ্ছন্দ। — নিজস্ব চিত্র
পরবর্তী কালে নাইলন, পলিয়েস্টারের আগমনে সৃষ্টি হয় সাধ্যের মধ্যে সাধের শিফন। ফ্লোরাল প্রিন্ট, জরিপাড় কিংবা শুধুই ঢালা একরঙা শিফন শাড়ি। একরঙা শিফন বললেই তো চোখের সামনে ভেসে ওঠে যশ চোপড়ার ‘চাঁদনী’ ছবিতে শ্রীদেবীর নীল, হলুদ উড়ুউড়ু শিফন শাড়িতে সুগঠিত দেহভঙ্গিমার অনুরণন। কিংবা ‘সিলসিলা’ ছবিতে রেখার লাল রঙের শিফন, সঙ্গে একই রঙের হল্টারনেক ব্লাউজ। বলিউডে শিফন শাড়ির বহুল ব্যবহার আমরা সবাই জানি। কখনও টিউলিপের বাগানে, কখনও বৃষ্টিভেজা সমুদ্র সৈকতে, কখনও বা চূড়ান্ত নাটকীয় মুহূর্তে শিফন তার অনায়াস মেজাজে উপস্থিত। ফরাসি ফ্যাশন সাম্রাজ্য থেকে রাজবাড়ির অন্দরমহল হয়ে বলিউডের হাত ধরে আমাদের আটপৌরে জীবনে ঢুকে পড়ার যাত্রাপথে শিফনের বহুমুখী প্রতিভাই প্রকাশ পায়। বিলাসিতার উচ্চাসন থেকে শুরু করে গরমে আরাম দিতে সে সমান ভাবে স্বচ্ছন্দ।
কখনও টিউলিপের বাগানে, কখনও বৃষ্টিভেজা সমুদ্র সৈকতে, কখনও বা চূড়ান্ত নাটকীয় মুহূর্তে শিফন তার অনায়াস মেজাজে উপস্থিত। — নিজস্ব চিত্র
এবারে শুধু শাড়ির কথাই বললাম। ড্রেসের আঙিনায়ও শিফন দারুণ জনপ্রিয়। পরে সে কথা হবে।
(মডেল: সুনীতা, ছবি: সহেলি দাস মুখোপাধ্যায়, ভাবনা ও পরিকল্পনা: শর্মিলা বসুঠাকুর।)