অনুরাগীদের জন্য তাঁর বান্দ্রার বাড়ির দরজা খুলে দিলেন নৃত্যশিল্পী তথা কোরিয়োগ্রাফার টেরেন্স লুইস। ফরহা খানের ভ্লগে এ বার তাঁর বাড়ির অন্দরসজ্জা প্রকাশ্যে এল। গোটা বাড়িতে শৈল্পিক ছোঁয়া ভারি স্পষ্ট। বাড়ির কোনায় কোনায় তাই লুকিয়ে রয়েছে চমকের পর চমক। কেবল বৈভব নয়, বাড়ি সাজানোয় প্রকাশ পেয়েছে টেরেন্সের রুচিও। বাড়ি যে কেবল চার দেওয়াল আর আসবাব নয়, তা প্রমাণ করে দিলেন নৃত্যশিল্পী। সমস্ত খুঁটিনাটিতে প্রকাশ পেয়েছে টেরেন্সের ব্যক্তিত্বও। কী কী রয়েছে তাঁর বাড়িতে?
একাধিক শিল্প্বস্তু, ভ্রমণের স্মৃতিবাহী জিনিস, দামি আসবাবপত্রের ভিড়েও আলো-হাওয়ার খামতি নেই টেরেন্সের বা়ড়িতে। বেশ খানিকটা অংশ ফাঁকা রাখা হয়েছে পোষ্যদের খেলাধুলোর জন্য। বাড়ির নকশায় প্রাকৃতিক আলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বড় জানলা এবং উন্মুক্ত জায়গা ঘরকে আরও প্রশস্ত ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
তবে বাড়ির দরজাতেই চমকের সূচনা। ঘরের ভিতরে এমন এক দরজা রয়েছে, যা কেতাদুরস্ত ধাতব কারুকার্যে বানানো। প্রকাণ্ড দরজাটি আসলে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। রাজস্থানের জয়পুর থেকে আনা হয়েছে সেই দরজাটি। তার সামনে আড়াআড়ি ভাবে একাধিক রড রেখে মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন টেরেন্স। ওই দরজার পাশে রয়েছে এক মস্ত বারান্দা। সেখানে রয়েছে নানাবিধ গাছ এবং মাতা মেরির একটি মূর্তি। গোটা বাড়িতে ক্যাথলিক চার্চের ছোঁয়া মেলে।
টেরেন্সের বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলির মধ্যে একটি হল বসার ঘরে ব্যবহার করা আসল গাছের ছাল। প্রকৃতিকে ঘরের মধ্যে নিয়ে আসার এই ভাবনা তাঁর অন্দরসজ্জাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। আধুনিক সাজসজ্জার সঙ্গে প্রাকৃতিক উপাদানের মেলবন্ধন ঘরে এক ধরনের উষ্ণতা এবং স্বতন্ত্র চরিত্র তৈরি করেছে। মেঝে থেকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সেই ছাল ছুঁয়ে ফেলেছে ঘরের সিলিং।
তবে ১৫ বছরের পুরনো এই বাড়িতে আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে যথেষ্ট। আর তার প্রমাণ মিলবে স্নানঘর বা শৌচালয়ে। সাধারণত শৌচাগারের সজ্জা নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখা যায় না। কিন্তু টেরেন্স সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। এই অংশের নকশা বিশ্ববিখ্যাত স্পেনীয় সুররিয়্যাল শিল্পী সালভাদোর দালির শিল্পভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত।
এখানে কমোডের উপরে নিখুঁত ভাবে বসানো হয়েছে একটি রাজসিংহাসন। সেই আসনের নীচেই রয়েছে কমোড। যা দেখে চমকে গিয়েছেন প্রযোজক-পরিচালক ফরহাও। বাথরুমে ঢুকলেই চোখে পড়ে রাজসিংহাসনের মতো সেই বিশাল আসনটি। সাধারণ বাথরুমের ধারণা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এই নকশা জায়গাটিকে প্রায় একটি শিল্পপ্রদর্শনীর অংশে পরিণত করেছেন টেরেন্স।
স্নানঘরের দেওয়ালগুলিও ছোট ছোট আয়নায় সাজানো। রয়েছে মস্ত এক ঝাড়লণ্ঠন। এমন আলোকসজ্জা সাধারণত স্নানঘরে দেখা যায় না। কমো,ড থুড়ি সিংহাসনের উপরে ছোট্ট জানালাটিও ছকভাঙা ডিজ়াইনে তৈরি। বেসিনও তৈরি হয়েছে দালির শিল্পভাবনার আদলেই।
টেরেন্স কিন্তু তাঁর বাড়িতে বইপত্রের জন্য আলাদা ঘর রাখতে ভোলেননি। গ্রন্থাগার নয়, স্টাডি রুম বলাই ঠিক হবে। তাতে রয়েছে সোফা, টিভি এবং কাজ করার বন্দোবস্ত। তা ছাড়া একটি মস্ত কালো বোর্ড রয়েছে সেই ঘরে। যেখানে নিজের পরিকল্পনার খুঁটিনাটি লিখে রাখেন নৃত্যশিল্পী। এই ঘরটি মূলত কাজের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন তিনি।
বাড়িতে পা রাখার সদর দরজার পাশেই রয়েছে গাছের ছাল ও শিকড় দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ ধরনের বেঞ্চ। টেরেন্সের কথায়, ‘‘এই বেঞ্চটি আসলে কাঠ থেকে আসবাবে পরিণত হওয়ার যে যাত্রাপথ, তাকেই তুলে ধরেছে।’’ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে একটি যোগসূত্র তৈরি হয়েছে সেখানে।
কোরিয়োগ্রাফারের বসার ঘর দেখে বোঝা যায়, বাড়ির সাজসজ্জায় আধুনিক নকশার পাশাপাশি বিভিন্ন পুরনো ও সংগ্রহযোগ্য জিনিসও ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা আসবাব, অলঙ্করণ এবং শিল্পবস্তু ঘরের প্রতিটি কোণকে আলাদা চরিত্র দিয়েছে।
দেশবিদেশে ঘুরে বেড়ানোর স্মারক এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দিয়ে রুচিশীল ভাবে সাজানো বসার ঘরটি। এই ঘরের সজ্জার মধ্যে রয়েছে, একটি ভিনটেজ ঝাড়বাতি, একটি প্রকাণ্ড পিয়ানো, উন্মুক্ত ইটের দেওয়াল, বন্ধুদের আপ্যায়ন করার জন্য সোফা-সহ একটি আরামদায়ক কোণ। আর একটি আলমারি ভর্তি ব্যক্তিগত জিনিসপত্র।
তবে রান্নাঘরের কথা বাদ দিলে চলবে না। বাড়ির অন্যান্য অংশের তুলনায় এর আকার ছোট, কিন্তু সাজসজ্জায় কোনও খামতি রাখেননি নৃত্যশিল্পী। প্রথমেই চোখে পড়বে সিলিংয়ে ঝোলানো আলো। নানা ধরনের চায়ের কেটলি দিয়ে আলো বানানো হয়েছে সেখানে।
এই বাড়ির প্রতিটি অংশে রয়েছে শিল্পচেতনা, অভিনবত্ব এবং ব্যক্তিগত রুচির স্পষ্ট ছাপ। বিশেষ করে তাঁর বাথরুমের নকশা এখন অন্দরসজ্জাপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। জয়পুর থেকে আনা দরজা এবং ইট, কাঠ, পাথরের এমন ব্যবহারও মন কেড়েছে অনেকের। সঙ্গে গাছগাছালিতে ভরা রয়েছে তাঁর এই ঠিকানা।
এই সব ছোট ছোট বিষয়ই কখনও কখনও একটি বাড়িকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তুলতে পারে। আর সেই কারণেই টেরেন্সের এই বাড়ি শুধু থাকার জায়গা নয়, বরং এক জীবন্ত শিল্পকর্ম বললেও অত্যুক্তি হবে না।
১৫ বছরের পুরনো এই বাড়ির অন্দরসজ্জা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টাতেও থাকে। শিল্পীমন সময়ের সঙ্গে উপযোগী জিনিসপত্র দিয়ে বার বার সাজ বদলাতে ভালবাসে। ফলে সব মিলিয়ে এই বাড়ি প্রমাণ করে, কল্পনাশক্তি থাকলে ঘরের প্রতিটি অংশই হয়ে উঠতে পারে এক একটি শিল্পকর্ম।