জাপানি শহরে অবৈধ ভাবে মসজিদ নির্মাণ! এ বার তাতেও নাম জড়াল সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়া পাকিস্তানের। ফলে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে টোকিয়ো ও ইসলামাবাদের মধ্যে ক্রমশ চওড়া হচ্ছে কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব। সূত্রের খবর, খুব শীঘ্রই ওই বেআইনি মসজিদ ভাঙার নির্দেশ দেবে স্থানীয় প্রশাসন। ফলে প্রবল অস্বস্তিতে প্রবাসী পাকিস্তানিরা। অন্য দিকে, মসজিদ ভাঙলে দুই দেশের সম্পর্কে যে বড়সড় চিড় ধরবে, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের এপ্রিলে জাপানি শহর কাওয়াগোতে মসজিদ উদ্বোধন করে প্রবাসী পাক নাগরিক সমাজ। অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন ইসালামাবাদ নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আবদুল হামিদ। কিন্তু, মাত্র এক মাসের মধ্যেই জানা যায় বেআইনি ভাবে জমি দখল করে তৈরি হয়েছে ওই ইমারত। আর তাই সেটি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করছে স্থানীয় সাইতামা ‘প্রিফেকচার’। যদিও এই নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি।
উল্লেখ্য, জাপানে মোট ৪৭টি প্রশাসনিক এবং বিচার বিভাগীয় অঞ্চল রয়েছে। এর পোশাকি নাম ‘প্রিফেকচার’। এগুলিকে কতকটা ভারতের পুরনিগম বা পুরসভার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এদের অনুমতি ছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রে যে কোনও ধরনের নির্মাণকাজ নিষিদ্ধ। টোকিয়োর অভিযোগ, আইন মোতাবেক সেই ধরনের কোনও আবেদন না করেই সংশ্লিষ্ট মসজিদটি নির্মাণ করেছে প্রবাসী পাক নাগরিক সমাজ।
সম্প্রতি, এই ইস্যুতে বিবৃতি দেয় সাইতামা ‘প্রিফেকচার’। সেখানে বলা হয়, ‘‘কাওয়াগোতে শহরে পাক প্রবাসীরা একটি মসজিদ তৈরি করেছে, যেটা আমাদের প্রশাসনিক এলাকার অন্তর্গত। এই নির্মাণকাজের জন্য কোনও রকমের অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাই ভবনটিকে (পড়ুন মসজিদ) অবৈধ নির্মাণ হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।’’
সাইতামা ‘প্রিফেকচার’-এর কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মসজিদটি ভেঙে ফেলার প্রস্তাব এসেছে, যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির দাবি, অবৈধ নির্মাণের দায় স্বীকার করেননি কোনও পাক প্রবাসী। শুধু তা-ই নয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের দূরে রাখার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে টোকিয়োর পাক দূতাবাস। বেআইনি কোনও বিষয়ের সঙ্গে তাঁদের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
২০২৪ সালের অক্টোবরে কাওয়াগো শহরে অবৈধ মসজিদ নির্মাণের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসে। সঙ্গে সঙ্গে তদন্তে নামে তারা। জানা যায়, পাহাড়ি বনাঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত এলাকার ৪,৫০০ বর্গকিলোমিটার দখল করে ওই ধর্মস্থানটি তৈরি করছেন পাক প্রবাসীরা।
জাপানি গণমাধ্যম ‘আসাহি শিম্বুন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর পর বেআইনি ভাবে তৈরি হওয়া জমির আসল মালিককে খুঁজে বার করে তদন্তকারী দল। জানা যায়, ফুজিমির বাসিন্দা সেই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে একজন রিয়্যাল এস্টেট এজেন্ট। তিনি জানান, পাহাড়ি বনাঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত এলাকাটি বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। ফলে সেখানে তৈরি হওয়া কোনও ইমারতের দায় তাঁর নয়।
এ ব্যাপারে জাপানি গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ওই রিয়্যাল এস্টেট এজেন্ট। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা এর সঙ্গে জড়িত নই। ক্রেতার পরিচয় তদন্তকারীদের দিয়েছি। তবে সেটা সংবাদমাধ্যমে বলব না। কারণ, আমি কোনও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে পারি না।’’ এই পরিস্থিতিতে মসজিদ নির্মাণের বরাতপ্রাপ্ত ঠিকাদার সংস্থার সন্ধানে কোমর বেঁধে লেগে পড়ে ‘প্রিফেকচার’ প্রশাসন।
তবে বহু খোঁজাখুঁজি করেও সেই ঠিকাদারের কোনও হদিস পাননি তারা। ফলে বাধ্য হয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মসজিদ নির্মাণের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয় স্থানীয় প্রশাসন। তত দিনে অবশ্য ‘প্রিফেকচার’ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি রিপোর্ট জমা করেছে তদন্তকারী দল। সেখানে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য দেয় তারা।
ওই রিপোর্ট থেকে স্থানীয় প্রশাসন জানতে পারে, ২০২৫ সালের মার্চে কাওয়াগোয়ে সাইটের ঠিকানায় একটি সংস্থার কাছে জমিটি হস্তান্তর করে ‘ফুজিমি’ রিয়্যাল এস্টেট এজেন্ট। তাদেরই বর্তমান মালিক ধরে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ করেন ‘প্রিফেকচার’ কর্তৃপক্ষ। গত মার্চে সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি জানিয়ে দেয়, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ভেঙে ফেলা হবে ওই ভবন। এই মর্মে মুচলেকাও জমা করে তারা।
কিন্তু, আশ্চর্যজনক ভাবে এ বছরের এপ্রিলে মসজিদটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নির্মাণকারী সংস্থা। সেখানে হাজির হন পাক রাষ্ট্রদূত হামিদ-সহ বেশ কয়েক জন বিদেশি নাগরিক। ফলে নতুন করে ‘প্রিফেকচার’ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা পড়ে অভিযোগ। তাতে অনুমোদনহীন ভবন কেন সরানো হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এলাকাবাসী।
গত ১৯ মে অবৈধ মসজিদ নির্মাণ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে স্থানীয় জাপানি প্রশাসন। ফলে জমির মালিক হিসাবে চিহ্নিত সংস্থাটির উপর চাপ বাড়ছিল। বাধ্য হয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেয় তারা। বলে, ‘‘আমরা জানতাম না যে এই জমিতে কোনও ভবন নির্মাণ করা যাবে না। এ ব্যাপারে আইন না জেনেই জমিটা কেনা হয়েছিল।’’
কিন্তু, কয়েক দিনের মধ্যেই গণমাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলেন সংস্থার হয়ে বিবৃতি দেওয়া ব্যক্তির বাবা। তাঁর দাবি, ‘‘এটা আমাদের প্রার্থনার জায়গা। আমরা জমিটা কেনার আগেই এখানে মসজিদ ছিল। আমরা কোনও ভবন নির্মাণ করিনি।’’
সাইতামা ‘প্রিফেকচার’ কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই ধরনের বিভ্রান্তিকর মন্তব্যকে পাত্তা দেয়নি। খুব দ্রুত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে তারা। সেখানে বলা হয়, ‘‘এটা যে অবৈধ নির্মাণ সেটা সবাইকে বুঝতে হবে। কেউ এই ভবন ব্যবহার করতে পারবেন না। আমরা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছি।’’
স্থানীয় প্রশাসন মসজিদটিকে অবৈধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দায় ঝেড়ে ফেলতে তৎপর হয় টোকিয়োর পাক দূতাবাস। ১ জুন এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) এই নিয়ে একটি পোস্ট করে তারা। তাতে বলা হয়, ‘‘জাপানে বসবাসকারী পাক নাগরিকদের কাছে এই দেশের আইন মেনে চলতে আমরা আন্তরিক ভাবে আবেদন করছি। উপাসনালয় নির্মাণের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য।’’
এর পাশাপাশি পাক নাগরিকদের স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনও নির্মাণ কাজ করা যাবে না বলে স্পষ্ট নির্দেশ দেয় ইসলামাবাদের দূতাবাস। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এ বছরের ৩১ মে এ ব্যাপারে একটি পৃথক অ্যাডভাইসরি জারি করে তারা। সেখানেও প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া মসজিদ নির্মাণ উচিত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
অবৈধ মসজিদ নির্মাণ বিতর্কের মধ্যেই আবার বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদাকে। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত জাপানে ইসলামীয় উপাসনালয়ের সংখ্যা ছিল ১৬০। তার মধ্যে ১৭টি মসজিদই সাইতামা প্রিফেকচারে অবস্থিত।
জাপানি নাগরিকদের মধ্যে ইসলামীয় ধর্মপ্রচার এবং সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়া নিয়ে যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে। অতীতে ফুজি সাওয়া শহরে মসজিদ নির্মাণে বাধা দেন তাঁরা। এ ছাড়া হোকুরিকু এলাকাতেও মসজিদ নির্মাণের কাজ প্রশাসনিক উদ্যোগে বন্ধ করার নজির প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে রয়েছে।