শখ ছিল বড় মাপের অভিনেতা হওয়ার। কিন্তু স্বপ্নের টিনসেল নগরী মুম্বইয়ে গিয়েও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারছিলেন না। পকেটে মাত্র ৮৪ টাকা নিয়ে নতুন শহরে পৌঁছেছিলেন। বাবার কাছ থেকে টাকা ধার করে দীর্ঘ সময় সংসারও চালিয়েছিলেন গৌরব গেরা ওরফে ‘ধুরন্ধর’-এর আলম ভাই।
১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে হরিয়ানার ফরিদাবাদে জন্ম গৌরবের। সেখানে বাবা-মা এবং ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন তিনি। গৌরবের বাবা ভুবনেশ্বরের আইআইটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে গৌরবের ভাইও ইঞ্জিনিয়ারিংকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু গৌরব হেঁটেছিলেন অন্য রাস্তায়।
এক সাক্ষাৎকারে গৌরব জানান, ছোটবেলা থেকে শিল্প-সংস্কৃতির উপর গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। সেই প্রভাব পড়ত পরীক্ষার ফলাফলেও। পড়াশোনার চেয়ে শিল্পকলা সংক্রান্ত বিষয়ে সব সময় বেশি নম্বর পেতেন তিনি।
স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি শিল্পকলা সংক্রান্ত কোনও বিষয় নিয়ে কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবার অনুরোধে তিনি ফ্যাশন ডিজ়াইনিং নিয়ে ভর্তি হতে হয়েছিল। প্রথমে আপত্তি জানালেও বাবার অনুরোধ রাখতে তিনি ফ্যাশন নিয়েই পড়াশোনা শেষ করেছিলেন।
গৌরব জানতেন, ফ্যাশন নিয়ে পড়াশোনা করে আদতে তাঁর কোনও লাভ হবে না। বরং পড়াশোনার জন্য তাঁর বাবার এত খরচ জলেই যাবে। তবুও গৌরবকে তাঁর বাবা বলেছিলেন, ‘‘তুই কলেজ ছাড়ার পর ছ’-সাত মাস চাকরি করে ছেড়ে দিয়ে যা খুশি তা-ই করিস। আমি তোকে বাধা দেব না।’’
কলেজের পড়াশোনা শেষ করার পর বেশ কয়েক মাস চাকরি করেছিলেন গৌরব। তার পর সেই চাকরি সত্যিই ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। অভিনয় নিয়ে কেরিয়ার গড়ার আশায় মুম্বই চলে যান গৌরব। এমনকি, একটি নাটকের দলেও যুক্ত হন তিনি।
অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করতে মুম্বই গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু অর্থাভাব ছিল গৌরবের। তাঁর পকেটে মাত্র ৮৪ টাকা ছিল। নামমাত্র পুঁজি নিয়ে হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছিলেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে গৌরব জানিয়েছেন, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর অর্থাভাবের সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। যে হেতু তাঁর বাবা সেই সময় রোজগেরে ছিলেন, সে হেতু গৌরবের সমস্ত খরচ বহন করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
গৌরব সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘আমি যখন মুম্বইয়ে ছিলাম, তখন বাবা আমায় চিঠি লিখতেন। সেই চিঠিগুলো এখনও আমার সঙ্গে রয়েছে। এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ২ হাজার টাকার বেশি পাঠানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না।’’
২০০১ সালে ক্যামিয়ো চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ছোটপর্দায় কেরিয়ার শুরু করেন গৌরব। কেরিয়ারের গোড়ার দিকে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করলেও ২০০৩ সালে সুবর্ণসুযোগ পেয়ে যান তিনি। ‘জসসি জ্যায়সি কোয়ি নহি’ নামের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নন্দুর চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি।
একটি বিশেষ ধারাবাহিক থেকে জনপ্রিয়তা পেলেও তার ফলে কেরিয়ারে খুব একটা লাভ হয়নি গৌরবের। বেশ কয়েকটি হিন্দি ধারাবাহিকের পাশাপাশি রিয়্যালিটি শোয়েও অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন তিনি।
২০০৪ সালে ‘কিঁউ…! হো গয়া না’ ছবির মাধ্যমে বড়পর্দায় অভিনয় শুরু করেন গৌরব। ‘নীল অ্যান্ড নিক্কি’, ‘ওহ মাই গড’, ‘এমপিথ্রি’-এর মতো একাধিক হিন্দি ছবিতে কাজের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বল্পদৈর্ঘ্যের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যেত তাঁকে।
গৌরব সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘একসময় আমার এমন অবস্থা হয়েছিল যে, পকেটে টাকা ছিল না। যাতায়াতের পথে ব্যাঙ্কের সামনে দিয়ে গেলে প্রণাম করার জন্য দাঁড়িয়ে পড়তাম। মনে মনে বলতাম, ‘আমার খেয়াল রেখো।’’’
২০২৫ সালে গৌরবের কেরিয়ারের মোড় ঘুরে যায়। আদিত্য ধরের পরিচালনায় ‘ধুরন্ধর’ ছবির দুই পর্বেই অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। আলম ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় গৌরবকে। ছবি মুক্তির পর আলমের মুখে ‘ডার্লিং ডার্লিং দিল কিঁউ তোড়া, পিলো পিলো আলম দুধ সোডা’ সংলাপটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কেরিয়ারের গোড়ায় যে অভিনেতার জীবন সংগ্রামে ভরা ছিল, বর্তমানে তিনি আলোর রোশনাইয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।