যখন মা হওয়া নয় মুখের কথা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মা কে? মা কী ভাবে হয়? মাতৃত্ব কী? এই সব কিছু নিয়ে ভেবে দেখার অবসর বড় একটা হয় না আমাদের। জন্ম থেকে মৃত্যু আমরা নানান জৈবিক প্রক্রিয়ার উপর ভরসা করে কাটিয়ে দিই। তাই মাতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গর্ভে ধারণ করা, স্তন্যপান করানো, আর এ সবের মধ্যে দিয়েই আমরা মনে করি একজন নারী মা হয়ে ওঠেন। অথচ ‘মা’ শব্দটা সম্ভবত শরীরের চেয়ে বেশি, অন্তত এমনটাই মত আমার। তাই যখনই মা হওয়ার কথা ভেবেছি, আমার নিজের ডিম্বাণু, রক্ত— কিছুর উপর কোনও মায়া হয়নি। আমি কেবল চেয়েছি, যে ইতিমধ্যে এসে পড়েছে পৃথিবীতে আমি যেন সুযোগ পাই তাকে গ্রহণ করার আর আমি যেন যোগ্য হই যাতে সে আমাকে গ্রহণ করে। এই ভাবনা যখন ভাগ করে নিলাম অরূপের (আমার জীবনসঙ্গী) সঙ্গে, তখন অনেক দিন নানা আলোচনায় মত্ত থেকেছি আমরা। অবশেষে অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্তে দুজনেই স্থির করলাম, জৈবিক প্রক্রিয়া নয়, প্রথম বার অভিভাবক হওয়ার স্বাদ আমরা দত্তকের মাধ্যমেই পেতে চাই। পৃথিবীতে জনসংখ্যার অভাব নেই, কিন্তু অভাব আছে ‘সম্পর্কের’, ‘বন্ধুত্বের’। অভাব আছে অভিভাবকত্বের।
আইনি ভাবে দত্তক নিতে গেলে সরকারি ওয়েবসাইট সিএআরএ (সেন্ট্রাল অ্যাডপশন রিসোর্স অথরিটি)-র মাধ্যমে নিতে হয়। ফলে আমরাও শুরু করে দিলাম সেই সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর্ব। অরূপ ছাড়া এই সব দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আমি বিপাকেই পড়তাম। লেখা ছাড়া অন্য কোনও কারণে কাগজ দেখতে বা দেখাতে ভাল লাগে না। কিন্তু উপায় কী! শিশুর স্বার্থেই উচিত সমস্ত কাগজ ঠিক রাখা। যে দিন আবেদনপত্র জমা দিলাম, সে দিন এক আশ্চর্য অনুভূতি হয়েছিল। নিকটজনদের, বন্ধুদের ডেকে ডেকে বলেছিলাম। এই বোধ বা সিদ্ধান্ত আমার লুকোতে ইচ্ছে করেনি কোনও ভাবে, বরং এই আনন্দ উদ্যাপন করতে ইচ্ছে করেছিল। তার পর পেরিয়ে গেল প্রায় চার বছর। কখনও কাজের মধ্যে ডুবে গিয়ে মনে হয়েছে যে, আর বুঝি এ দায়িত্ব নেওয়া যাবে না, বয়স বেড়ে যাচ্ছে। কখনও আবার দু’জনে বসে স্বপ্ন দেখেছি, কেমন হবে জীবন? যখন একজন ছোট্ট মানুষ চলে আসবে আমাদের জীবনে? পুরোটা ঠাহর করতে পারিনি। কিন্তু স্বপ্ন বুনেছি একটু একটু করে। কখনও ভয় পেয়েছি ‘পারব তো?’ অরূপ ভরসা জুগিয়েছে, ‘পারব’। আসলে এই ভয়, কুন্ঠা এই সব কিছু কিন্তু গোটা প্রক্রিয়াটারই অংশ।
মেয়ের সঙ্গে। নিজস্ব চিত্র।
অবশেষে প্রায় চার বছরের মাথায় এক শীতের দুপুরবেলা হঠাৎ খবর এল, আমরা মা বাবা হয়েছি। আনন্দে চোখে জল এসে গেছিল, যে চোখে আনন্দে আর জল আসে না বহু বছর। আবারও কাগজপত্র, আবারও নানান প্রক্রিয়া পেরিয়ে আমরা প্রথম বার কোলে নিলাম সাড়ে তিন মাসের ছোট্ট ‘ঝুঁটি’কে। হ্যাঁ, আদর করে নাম রেখেছি ‘ঝুঁটি’। আর সেই প্রথম বারই ও এক গাল হেসেছিল আমাদের দেখে। যেন জ্যোৎস্নার কাঁথা গায়ে কোথাও একটা ছেদ পড়েছিল আমাদের একসঙ্গে পথ চলার আর আজ এই ইঁট কাঠ পাথরের জঙ্গলে এই ফের দেখা হল আমাদের। সব আইন-কানুন জানার পরেও আজও মনে হয়, যেন কোন দৈবের বশে, কোন পুণ্যের ফলে ঝুঁটি চলে এলে আমাদের জীবনে। প্রায় চার মাস পেরিয়ে গিয়েছে। এখন যখন এই লেখা লিখছি, আট মাসের ঝুঁটি ঘুমোচ্ছে, একটু পরেই দুধ খাওয়ানোর সময় হয়ে যাবে। শুরু হবে আমার মশারিবেলা। এই চার মাস কি কেবলই স্বপ্নের মতো কেটেছে? এ কথা বললে মিথ্যে বলা হবে। “স্পাইনের ইঞ্জেকশনটা তো নিতে হয়নি”, “ব্রেস্ট ফিড তো করাতে হচ্ছে না”, এই সব সত্যি হলেও এটা সত্যি নয় যে, আমার বা আমাদের সবটা মসৃণ।
গর্ভাবস্থা মানুষকে খানিক প্রস্তুত করে। এ ক্ষেত্রে রাতারাতি জীবন বদলেছে আমাদের। অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করার দরুণ আমার কোনও ছুটি মেলেনি, অনেক লেখার ডেডলাইন, অনেক মিটিং, অনেক অনেক কাজ সামলাতে গিয়ে ঝুঁটিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছি। মনে হয়েছে, পারছি না। শুরুর দিকে রাতের পর রাত জেগে পরের দিন মিটিংয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। কখনও দেখাশোনার করার লোক পাইনি বলে দিশেহারা হয়ে ভেবেছি, কাজ ছেড়ে দিতে হবে। আবার কখনও ঝুঁটির ভীষণ জ্বরে হাঁকপাক করেছি। নতুন মা আমি, কুঁকড়ে গিয়েছি ভয়ে। কখনো ঝুঁটির দিদু দাদু, কখনও ঝুঁটির পিসি-ঠাম্মা ভরসা জুগিয়েছেন। আবার কখনও মনে হয়েছে, যেন আমার মুক্ত জীবনে শিকল পরে নিলাম। আর এই মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে কী তীব্র অপরাধবোধ! ঝুঁটিকে তো আমরাই চেয়েছি, সে তো নির্বাচন করেনি আমাদের, তা হলে ‘শিকল’ ভাবছি কোন অধিকারে! নিজের ভিতর প্রশ্ন জেগেছে, মায়েরা কি এমন ভাবতে পারে? তাদের কি অস্থির লাগতে পারে? ভালোবাসা সত্ত্বেও কি বন্দি মনে হতে পারে? সে এক আশ্চর্য উথাপাথাল নিয়ে এগোতে এগোতে মনে হয়েছে, হয়তো পারে। মা তো মানুষই। মা তো কোনও অতিমানব নয়। প্রচণ্ড ভালোবেসেও তো নতুন নিয়মে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খেতে পারে একজন মা। তার তো ইচ্ছে করতে পারে, আগের মতো বন্ধুর সঙ্গে কফি নিয়ে বসতে? আমার তো করেছে। আমি বসেওছি। কারণ এই উথালপাথালের ভিতর বুঝেছি শিখেছি যে, আমি নিজেকে ভাল না বাসলে কাউকেই পূর্ণ ভাবে ভাল বাসতে পারব না, সম্ভবত আমার সন্তানকেও নয়।
রোজ রাতে আমাদের মাঝখানে শুয়ে যখন ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না কার কাছ ঘেঁষে শোবে ও, মায়ের না বাবার? তখন ইংরেজি অক্ষর এইচের মাঝখানের সেতুর মতো ঘুরে শোয়। মাথাটা একজনের পেটে, পা আর একজনের। আমি মজা করে বলি “দেখ অরূপ, ও কিন্তু আমাদের দুজনেরই পেটের সন্তান।” আমাদের তিন জনের এই পরিবারে কখনও আমি মা, অরূপ বাবা। আবার কখনও অরূপ মা, আমি বাবা। সমাজের স্থির করে দেওয়া সংজ্ঞায় এভাবেই বদলাতে থাকে আমাদের রোল প্লে। একটু বড় হয়ে উঠলে ঝুঁটিও নিশ্চয়ই আমাদের আর একটা মা হয়ে উঠবে।
‘ঝুঁটির জন্য মুখে মুখে অনেক ছড়া বানানো হয়েছে, ঘুমপাড়ানি গান বানানো হয়েছে।’ নিজস্ব চিত্র।
ঝুঁটির জন্য মুখে মুখে অনেক ছড়া বানানো হয়েছে, ঘুমপাড়ানি গান বানানো হয়েছে। ‘হয়েছে’ বলছি, কারণ আপনিই হয়েছে সেসব। ভেবে লিখিনি। ও আমার মুগ্ধ শ্রোতা, আর আমি একমাত্র ওরই সভাকবি। মাঝে সাঝে একটু সুকুমার রায়, একটু রবিঠাকুর শোনাই। “তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে” বলতে শুরু করলে মুখটা আলো আলো হয়ে ওঠে ওর। কবিতাটার একদম শেষদিকটা ওকে অনেক বার বলি, আট মাস বয়সে কিছুই নিশ্চয়ই বোঝে না, তবু খুব মন দিয়ে শোনে।
“যেই ভাবে মা যে হয় মাটি তার/ ভালো লাগে আরবার / পৃথিবীর কোণটি”
তার পর জাপটে নিয়ে বলি, “এই পৃথিবীতে আমাদের এক এক জন মা থাকে ঠিকই, কিন্তু আমাদের আসল মা কে দেখলি তো? আমাদের আসল মা হল মাটি”, একগাল হেসে ওঠে । আমি মনে মনে প্রার্থনা করি, এই হাসি যেন বহাল থাকে চিরকাল… আর আমরা একসঙ্গে মাটিকে প্রণাম করে যেন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি মা মেয়ের এই বন্ধুত্ব। ওহ্, ঝুঁটির ভালনাম অরণ্যানী। ও আমাকে প্রতিদিন শেখাচ্ছে, কী ভাবে আরও দায়িত্বশীল হতে হয়, কী ভাবে আরও শান্ত হতে হয়, আর কী ভাবে আরও ধারণ করতে হয়… আসলে সব ধারণ তো গর্ভে হয় না… কিছু ধারণ গর্বে হয়… আমি ভারী গর্বিত মা। মেয়ের অহঙ্কারে নয়। মেয়ের কাছে শিক্ষানবিশ হয়ে।
মাদার্স ডে-তে, ঝুঁটির মা হিসেবে সব মায়েদের বলব, নিজেদের ভীষণ ভালোবাসুন, যত্ন করুন, তা হলে ঝুঁটিরাও শিখবে নিজেকে ভালোবাসতে হয়, যত্ন করতে হয়। এই লেখা এই বলে শেষ করব, আগামীর সমাজে ঝুঁটি যেন একটা বোধ নিয়ে অন্তত বড় হয়, আর তা হল সাম্যের। জাত, ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, বর্ণ, শ্রেণি— এই সমস্ত কিছুর নিরিখে যেন সাম্যের বোধ ওর থাকে। বাকিটা ওর জীবন, ও সাজিয়ে নেবে। আগামী দিনে নিশ্চয়ই আমাদের সব মত মিলবে না, মতান্তর হবে। কিন্তু সন্তান তো আমার সম্পত্তি নয়! কেবল সেইটুকু বন্ধুত্ব যেন থাকে, যাতে সেই মতান্তর নিয়ে আলোচনা করবার জন্য ওর সঙ্গেই এক কাপ কফি নিয়ে বসে যেতে পারি সে দিন।