প্রেমের নেপথ্যে থাকা কোন স্মৃতি এখনও বেদনার ভাগ্যশ্রীর জীবনে?
যাঁকে ভালবেসেছিলেন তাঁকেই বিয়ে করেছেন। ‘ম্যায়নে প্যার কিয়া’-র নায়িকা এখন হিমালয় দাসানির ঘরণি। তবে অভিনেত্রীর প্রেমকাহিনি হার মানাতে পারে সিনেমার চিত্রনাট্যকেও। ভাগ্যশ্রী ভুলতে পারেননি সেই মুহূর্তে যখন তাঁদের ভালবাসার চিহ্ন, একে-অন্যকে লেখা চিঠি তাঁর বাবা একটা একটা করে তাঁরই চোখের সামনে পুড়িয়েছিলেন। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘সেই রাতে আমি খুব কেঁদেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, চোখের সামনে আমার ভালবাসা, স্বপ্ন সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। ভয়ানক উথালপাতাল চলছিল বুকের মধ্যে।’’
অভিনয় জগৎ থেকে অনেক দিনই সরে এসেছেন ভাগ্যশ্রী। ৫৭ বছর বয়স তাঁর। ফিটনেস সচেতন অভিনেত্রীকে সমাজমাধ্যমে সর্বদাই হাসিমুখে দেখা যায়। তবে অল্প বয়সে তৈরি মনের ক্ষত যে রয়ে যায়, তা ভাগ্যশ্রীর কথাতেই স্পষ্ট।
মনোরোগ চিকিৎসক শর্মিলা সরকার জানাচ্ছেন, ‘‘যদি অভিভাবকদের মনে হয়, কিশোর বয়সে সন্তান সঠিক মানুষকে বাছতে পারেনি বা এমন সময় প্রেমের জন্য নয়, পড়াশোনার মন দেওয়ার, সেটা তাকে বুঝিয়েও বলা যায়। মারধর, সন্তানকে আটকে রাখা, চিঠি বা তার প্রিয় স্মৃতি তারই সামনে নষ্ট করা মনের মধ্যে গভীর রেখাপাত করতে পারে। বাবা-মা সন্তানের কাছে সব সময়েই কাছের। আবার যার প্রতি তার মনে ভাললাগা তৈরি হয়েছে, সে-ও প্রিয়। ফলে তীব্র টানাপড়েনে ভুগতে পারে সে। অসহায় বোধ করতে পারে।’’
এই টানাপড়েনের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন অভিনেত্রী। কম বয়েসের প্রেমে মান্যতা মেলেনি। অভিভাবকদের চাপে নিজেকে সংযত রেখেছিলেন। কয়েক বছর পরে খানিকটা বড় হয়ে আবার হিমালয়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পুরনো অনুভূতি ডানা মেলে। সে কথা জানার পরে কড়া শাসনের মুখে পড়েছিলেন ভাগ্যশ্রী। গোটা পরিস্থিতিতে তিনি মানসিক ভাবে এতখানি আহত হয়েছিলেন যে, বাবা-মাকে বলেছিলেন, ‘‘তোমরা জন্ম দিয়েছ বলেই, আমার উপর তোমাদের অধিকার আছে। তাই আমি বাধ্য হব তোমাদের কথা মেনে নিতে। তবে এক বছর পর্যন্ত। জোর করে বিয়ে দিতে চাইলে করেও নেব, কিন্তু আমার পক্ষে সেটা সহজ হবে না।’’
১৯ বছর বয়সে অভিভাবকদের অমতেই বিয়ে করেন ভাগ্যশ্রী। সেই হিমালয়ই তাঁর স্বামী। তবে অভিনেত্রী স্পষ্ট করেছেন সেই দিনগুলির কথা। তাঁর সামনে চিঠি পোড়ানোর সময় অসম্ভব কষ্টে ছিলেন তিনি। আসলে চিঠি নিছক কাগজে লেখা কিছু কালির আখর নয় নয়, তা আবেগের আদান-প্রদানের মাধ্যম। প্রিয় মানুষের চিঠি আসলে তার উপস্থিতির মতোই। বেঙ্গালুরুর মনোরোগ চিকিৎসক অনিতা চন্দ এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘‘এমন ধরনের আচরণ (চোখের সামনে চিঠি পুড়িয়ে সামনে) কারও মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তীব্র বিষাদ এবং একই সঙ্গে রাগেরও জন্ম দিতে পারে। কারণ সেগুলি শুধু চিঠি নয়, বরং সেগুলি আবেগ, স্বপ্নের জীবন্ত রূপ।’’
কৈশোরে প্রেম আসে অনেকেরই জীবনে। অভিভাবকদের অনেকেই সেই সময় সন্তানের পড়াশোনায় ক্ষতি হবে বা সিদ্ধান্ত ভুল ভেবে সেই অনুভূতিকে মর্যাদা দিতে চান না। ফলে বিধিনিষেধ আরোপিত হয় তাদের চলাফেরায়। তাদের কঠোর শাসনে বেঁধে ফেলা হয় কখনও কখনও। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সন্তানের জীবনে, মনে করাচ্ছেন মনোরোগ চিকিৎসক শর্মিলা। তিনি জানাচ্ছেন, এক দিকে বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া, অন্য দিকে, ভালবাসা বা পছন্দের মানুষটিও যদি কোনও কারণে তাকে ছেড়ে যায়, তা হলে অনেক সময় এমন বয়সের ছেলেমেয়েরা চরম সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলতে পারে।
শর্মিলার পরামর্শ, বকে, ধমকে বা গায়ে হাত তুলে নয়— যদি মনে হয় সন্তান ভুল পদক্ষেপ করছে, তাকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো দরকার। কৈশোরে ছেলেমেয়েদের শারীরিক-মানসিক বদল তাদের আরও বেশি করে প্রেমের সম্পর্কে আকৃষ্ট করে। অনেক সময় এই ধরনের সম্পর্কের মেয়াদও বেশি দিন থাকে না। পড়ুয়া সন্তানকে বোঝানো যেতে পারে, এই সময় পড়াশোনায় অমনোযোগী হলে তাদের দু’জনেরই ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে। জোর করে তাদের আটকাতে গেলে হিতে-বিপরীত হবে। বরং পড়ার সময় পড়া, দিনে কিছু ক্ষণের জন্য তাদের কথা বলায় ছাড় দেওয়া যেতে পারে। আর যদি অভিভাবকদের মনে হয়, এই সম্পর্ক থেকে তাঁদের সন্তানের বড় ক্ষতি হতে পারে, তা হলে কেন ক্ষতি হবে, তা যুক্তি বা প্রমাণ দিয়ে তাকে বলা যেতে পারে, তবে নরম করে বুঝিয়ে।