West Bengal CM 2026

৮৩ দিন থেকে টানা ২৩ বছর! শুভেন্দুর আগে বাংলার মসনদে বসেছেন কোন আট জন? একাধিক বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন কারা?

তৃণমূলের পরাজয়ের পর রাজ্যে পালাবদলে ক্ষমতায় বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই জল্পনা বিভিন্ন মহলে। কে বসতে চলেছেন বাংলার মসনদে? সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসলেন ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গ পেল তার নবম মুখ্যমন্ত্রীকে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ১১:৫১
Share:
০১ ৩২

১৫ বছর পর রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি। দেড় দশক পর রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী রাজ্যবাসী। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয়ী হয়ে প্রথম বার ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে পদ্মশিবির।

০২ ৩২

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বৃহস্পতিবার, ৭ মে। ইস্তফা না দিলেও আনুষ্ঠানিক ভাবে ওই দিন পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু ৭ তারিখ পেরোনোর পর তাঁর মুখ্যমন্ত্রী পদের মেয়াদ শেষ। তিনি হয়েছেন প্রাক্তন।

Advertisement
০৩ ৩২

২৫ বৈশাখ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে রাজ্যের নয়া মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। এ রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ উপস্থিত ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে গত কয়েক দিন জল্পনা ছিল। কে বসতে চলেছেন বাংলার মসনদে? সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসলেন ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গ পেল তার নবম মুখ্যমন্ত্রীকে।

০৪ ৩২

বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পরে শুক্রবার রাজ্যে আসেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পরিষদীয় দলনেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেওয়া এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিতির জন্যই ছিল শাহের এই সফর। শুক্রবারই পরিষদীয় দলের বৈঠক ডাকা হয়। অমিত শাহের নেতৃত্বে ওই বৈঠকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বেছে নেওয়া হয়। শুক্রবারই রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা করেছে বিজেপি।

০৫ ৩২

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে লক্ষ লক্ষ কিউসেক জল। ১৯৪৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেছেন একাধিক কিংবদন্তি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কংগ্রেস থেকে বাম। সুদীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের পর ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। তার দেড় দশক পর এল বিজেপি। গত ৭৯ বছরে বাংলা পেয়েছে একাধিক মুখ্যমন্ত্রীকে।

০৬ ৩২

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর গোড়ার দিকে বাংলায় একচ্ছত্র শাসন ছিল কংগ্রেসের। এই রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থির প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি। দেশভাগের জেরে উদ্বাস্তু সঙ্কট এবং প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্বদল ঘটাতে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব বেছে নিয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্রের মতো মেধাবী ছাত্র ও প্রেসিডেন্সি কলেজের (অধুনা বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপককে।

০৭ ৩২

১৯৪৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। পরবর্তী কালে কংগ্রেসের হাইকম্যান্ডের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে পদত্যাগ করেন তিনি।

০৮ ৩২

১৯৪৮ সালের ১৫ জানুয়ারি বিধানচন্দ্র রায় পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। ওই বৈঠকেই প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়। বাংলার দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হন বিধানচন্দ্র রায়। শোনা যায়, দেশভাগ এবং স্বাধীনতার অল্প দিন বাদে এক কঠিন সময়ে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করতে রাজি করিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী।

০৯ ৩২

দেশভাগের ক্ষত, ওপার বাংলা থেকে শরণার্থীদের স্রোত, রাজ্যে কর্মহীনতা, আর্থিক চাপ, খাদ্যসঙ্কট সব মিলিয়ে সরকার তখন নাজেহাল। বিধানচন্দ্র মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন স্বাধীনতার পাঁচ মাস পরে। ১৯৪৮-এর ২৩ জানুয়ারি। প্রশাসক হিসাবে অত্যন্ত কঠোর, আপসহীন ও দাম্ভিক বলে পরিচিত ছিলেন বিরোধীমহলে। বামেদের খাদ্য আন্দোলনে রাজ্য তখন জ্বলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রফুল্ল সেনকে খাদ্যমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করেননি তিনি।

১০ ৩২

কলকাতার উপরে চাপ কমাতে কল্যাণী ও সল্টলেক উপনগরীর পরিকল্পনা ছিল তাঁর। রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ, দুর্গাপুরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহণ এবং হরিণঘাটা সরকারি দুগ্ধ প্রকল্প প্রভৃতি তাঁর আমলের। তিনি যোজনা কমিশন থেকে টাকাও বরাদ্দ করিয়েছেন বিভিন্ন প্রকল্পে। দুর্গাপুরে ইস্পাত কারখানা ও শিল্পনগরী গড়ে উঠেছিল বিধানচন্দ্রের উদ্যোগে।

১১ ৩২

ডিভিসি, দুর্গাপুর ব্যারাজ তাঁরই ভাবনার ফসল। দীর্ঘ সময় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বিধানচন্দ্র। ‘পশ্চিমবঙ্গের রূপকার’ ভূষণটি জুড়েছে তাঁর নামের সঙ্গে। কর্মপ্রাণ এই মানুষটিকে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া হয় ১৯৬১ সালে। শরীর তখন অসুস্থ। হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা ধরা পড়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১৯৬২-র ১ জুলাই, যা তাঁর জন্মদিন।

১২ ৩২

১৯৬২ সালের ৯ জুলাই বিধান রায়ের উত্তরসূরি হিসাবে বাংলার তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন। ৪ বছর ২৩৪ দিনের জন্য ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। ১৯২১ সালে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে হাতেখড়ি। দুর্গম এবং ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত হুগলির আরামবাগকে নিজের কর্মকেন্দ্র বেছে নিয়ে দীর্ঘ ৬০ বছর সেখানেই কাটান। কালক্রমে ‘আরামবাগের গান্ধী’ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

১৩ ৩২

গান্ধীজির রাজনৈতিক আদর্শকেই সারা জীবন বয়ে নিয়ে গিয়েছেন প্রফুল্ল। শিক্ষকতাও করেছেন স্কুলে। কংগ্রেস ভেঙে নতুন দল তৈরি হলেও তিনি কংগ্রেস ছাড়েননি। ১৯৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান তিনি।

১৪ ৩২

১৯৬৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন। দীর্ঘ ২০ বছর রাজ্যে ক্ষমতায় কংগ্রেস। মেদিনীপুরের গান্ধীবাদী নেতা অজয় মুখোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল ‘বাংলা কংগ্রেস’ গড়েছেন। প্রফুল্ল সেন ভোটে দাঁড়ালেন আরামবাগ থেকে। সমর্থন জানাল বামেরা। ‘আরামবাগের গান্ধী’ বলে পরিচিত কংগ্রেস প্রার্থীকে ৮০০-এর কিছু বেশি ভোটে হারিয়ে বাংলার জনসমর্থন আদায় করে নিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। হলেন প্রথম যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী। বাংলার চতুর্থ মুখ্যমন্ত্রী।

১৫ ৩২

অজয় মুখোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও। জীবনযাত্রায় একেবারে সরল, সাদাসিধে। যদিও জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আদর্শের জন্য তাঁকে লড়তে হয়েছে। দিতে হয়েছে মূল্যও। তরুণ অজয় স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ১৯৫২ সালে দেশের প্রথম সাধারণ উপনির্বাচনে তমলুক বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হলেন। দাঁড়াতে হল নিজের ভাই বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। বিশ্বনাথ ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) প্রার্থী। অজয় মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সেচ ও জলপথ বিভাগের মন্ত্রী।

১৬ ৩২

দলে তখন গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রবল। তাঁকে জেলা কংগ্রেস এবং রাজ্য সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে বাংলা কংগ্রেস দলের জন্ম। কংগ্রেসের সদস্যপদ যায় তাঁর। অজয়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সরকার টেকেনি একাধিক কারণে। অন্তর্বর্তী নির্বাচনেও মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৬৭-এর মার্চ থেকে ১৯৬৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২৬৫ দিনের জন্য সরকারের প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন তিনি। ১৯৬৯-এর ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭০-এর মার্চ এবং ১৯৭১-এর এপ্রিল থেকে জুন, মোট তিন বার তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন। মাঝের সময়গুলিতে বঙ্গভূমে জারি হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শাসন।

১৭ ৩২

১৯৭১ সালে তৃতীয় বার মুখ্যমন্ত্রী হলেও সরকারের পতন হয় দ্রুত। মাত্র ৮৩ দিনে। তার পরে ফিরেছিলেন কংগ্রেসে। ১৯৭২ সালে তমলুক থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে জয়ী হয়েছিলেন। ৭৭-এর লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়ে রাজনৈতিক অবসর নেন অজয় মুখোপাধ্যায়।

১৮ ৩২

২১ নভেম্বর ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ৯০ দিনের জন্য দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। নির্দল (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট)-এর হয়ে নির্বাচনে জিতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি।

১৯ ৩২

রাজনীতিবিদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের দৌহিত্র সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার হয়ে সিদ্ধার্থশঙ্কর দেশে ফেরেন ১৯৪৬-এ। বয়স তখন ২৬। প্রথম বছর দশেক ওকালতিই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। প্রথম নির্বাচনে লড়েন ১৯৫৭ সালে। জিতে বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভায় আইন ও আদিবাসী উন্নয়ন দফতরের দায়িত্ব পান। ১৯৬২-তে পরবর্তী নির্বাচনেও জয়ী হন।

২০ ৩২

১৯৬৭ সালে সিদ্ধার্থশঙ্করকে কেন্দ্রীয় শিক্ষমন্ত্রী করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭২ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে কংগ্রেস। এ বার মুখ্যমন্ত্রী হন সিদ্ধার্থশঙ্কর। যদিও সেবার ভোটে ব্যাপক রিগিংয়ের অভিযোগ তোলে বামেরা। যা খারিজ করতে সময় নেয়নি দেশের শতাব্দী প্রাচীন দল।

২১ ৩২

১৯৭২ থেকে ’৭৭ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সিদ্ধার্থশঙ্করের বিবিধ সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এমনকি এ-ও অভিযোগ ওঠে, ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখনকার রাষ্ট্রপতিকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তার খসড়া সিদ্ধার্থশঙ্করের তৈরি। শুধু তা-ই নয়, ইন্দিরাকে তিনিই নাকি পরামর্শ দিয়েছিলেন ওই পদক্ষেপ করার জন্য। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন নানা কারণে সিদ্ধার্থশঙ্কর তাঁর দল ও মন্ত্রিসভার অনেকের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ’৭৭-এ রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পরে রাজনীতিতে সিদ্ধার্থশঙ্করের সক্রিয়তা কমে যায়।

২২ ৩২

১৯৮৪ সালে দেহরক্ষীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ইন্দিরা। প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা-পুত্র রাজীব গান্ধী। সিদ্ধার্থশঙ্করও ধীরে ধীরে বাংলায় কংগ্রেসের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করেন। পরের বছর ১৯৮৫ সালের শেষে বোলপুর লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে সিপিএমের সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পর্যুদস্ত হন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। রাজনীতির মূল স্রোত থেকে সরিয়ে রাজীব তাঁকে অশান্ত পঞ্জাবের রাজ্যপাল করার সিদ্ধান্ত নেন। সাড়ে তিন বছর রাজ্যপাল ছিলেন তিনি, ১৯৮৯ পর্যন্ত।

২৩ ৩২

১৯৯১-এ রাজ্যের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন হয় সিদ্ধার্থশঙ্করের, বিরোধী দলনেতা হিসাবে। তখন বাংলার ক্ষমতায় বামফ্রন্ট। ১৯৭৭ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-র নেতৃত্বে বামফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। বামফ্রন্ট পরিচালিত অষ্টম থেকে দ্বাদশ বিধানসভার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। তিনি ছিলেন সিপিআই(এম) দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রথম পলিটব্যুরোর একজন। ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা ২৩ বছর জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

২৪ ৩২

লন্ডনে আইন পড়তে এসে বাম রাজনীতিতে দীক্ষা হয় জ্যোতি বসুর। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি তিনি। তারও আগে ১৯৪০ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। গোটা ভারত তথা বিশ্বে বাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ। বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে তিনি হন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা। ১৯৬৭ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী হন জ্যোতি বসু। এর পর ১৯৭৭ সালের ২১ জুন শপথ নেন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। সাতগাছিয়া থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জ্যোতি বসু নির্বাচিত হলেন। ১৯৭৮ সালে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনের মতো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয় তাঁর সরকার। এ ছাড়া গ্রাম বাংলায় ভূমিসংস্কারেও বিরাট সাফল্য পায় বামফ্রণ্ট।

২৫ ৩২

১৯৯৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে জ্যোতি বসুর নাম বিবেচিত হলেও, পার্টির সিদ্ধান্ত মেনে সেই পদ প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। ২০০০ সালের ২৮ জুলাই সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক চলাকালীন হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন জ্যোতি বসু। টানা ২৩ বছর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করে অবসর নেন তিনি।

২৬ ৩২

পশ্চিমবঙ্গের সপ্তম মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যভার সামলেছেন। সিপিএমের ছাত্র-যুব সংগঠনের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক উত্থান হয় তাঁর। ১৯৭৭ সালে তিনি কাশীপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালে পরাজিত হন। ১৯৮৭ সালে তিনি তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্র পরিবর্তন করে যাদবপুরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই কেন্দ্র থেকে তিনি টানা পাঁচ বার জয়ী হন।

২৭ ৩২

বুদ্ধদেব মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে আসীন হওয়ার পর ২০০১ এবং ২০০৬ সালে বাংলায় বামফ্রন্টের দু’টি বিজয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানা এবং নন্দীগ্রামে পেট্রো-কেমিক্যাল প্রকল্প নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ওঠে বাংলা জুড়ে। বুদ্ধদেব স্রোতের অভিমুখকে ফেরাতে পারেননি। ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের পক্ষে যায়নি। নির্বাচনে ভরাডুবি হয়ে বামেদের। বাংলায় পরিবর্তনের ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার। পদত্যাগ করেন বুদ্ধদেব।

২৮ ৩২

২০১১ সালে ক্ষমতায় আসেন বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বাংলার অষ্টম মুখ্যমন্ত্রী। ৩৪ বছরের বামশাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলার বুকে ঘাসফুলের পতাকা উড়িয়ে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠন করে। ১৯৭০-এর দশকে খুব কম বয়সে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কর্মজীবনের সূচনা হয়। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে বর্ষীয়ান বাম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হন।

২৯ ৩২

১৯৮৯ সালের সিপিএমের মালিনী ভট্টাচার্যের কাছে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে পরাজিত হন মমতা। কিন্তু ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনে কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্র থেকে পুনরায় সাংসদ নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪ ও ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও উক্ত কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালে নরসি‌হ রাও মন্ত্রিসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানব সম্পদ উন্নয়ন, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হন। পরে মতবিরোধ হওয়ায় পদত্যাগ।

৩০ ৩২

১৯৯৭ সালে কংগ্রেস দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন মমতা। ১৯৯৯ সালে মমতা বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে শামিল হন। এই জোট সরকার গঠন করলে তিনি হন রেলমন্ত্রী। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তার পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত একমাত্র তৃণমূল সাংসদ।। ২০০৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয় বার রেলমন্ত্রী হন। যে জমি আন্দোলনের উপর ভর করে মমতার ক্ষমতায় আগমন, তার পরতে পরতে জড়িয়ে দু’টি নাম— সিঙ্গুর এবং সেই সূত্রে ন্যানো। রতন টাটার ‘স্বপ্ন’ এক লক্ষ টাকার গাড়ি শিল্পের জন্য সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে যে বিবাদ তৎকালীন শাসক এবং বিরোধী মধ্যে বেধেছিল, তাকেই বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ দেন মমতা।

৩১ ৩২

তার পর সবটাই ইতিহাস। ২০১১ সালের ১৩ মে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে মমতার মহাকরণের অলিন্দে প্রবেশ। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর সিপিএমকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বাংলার ক্ষমতা দখল করেছিলেন মমতা। তৃতীয় বারের জন্য বাংলার মসনদে বসেছেন তিনি। সামলেছেন স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, ভূমি ও ভূমিসংস্কার, তথ্য ও সংস্কৃতি থেকে শুরু করে একাধিক দফতরের দায়িত্ব।

৩২ ৩২

২০১১ থেকে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন— বল্গাহীন ভাবে ছুটেছে তৃণমূলের বিজয়রথ। সেই রথের চাকা মাটিতে বসে গেল ২০২৬ সালে এসে। ১৫ বছরের তৃণমূল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটল। ২০০-র বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার ভবানীপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মমতা। কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী মমতাকে হারালেন বিজেপির শুভেন্দু। দলও হারল, হারলেন মমতাও। ছিলেন বাংলার অষ্টম মুখ্যমন্ত্রী হলেন প্রাক্তন। তাঁর কুর্সির দখল নিলেন বাংলার নবম প্রশাসনিক প্রধান শুভেন্দু অধিকারী।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement