পদমর্যাদার জোর খাটিয়ে অধস্তন কর্মীকে যৌন উত্তেজনাবর্ধক ওষুধ ও মাদক সেবন করিয়ে ‘যৌনদাস’ করে রেখেছিলেন মহিলা আধিকারিক। এমনই অভিযোগ তুলেছেন সংস্থার প্রাক্তন কর্মচারী। খ্যাতনামী মার্কিন সংস্থা জেপি মরগ্যানের ‘যৌন কেলেঙ্কারি’ প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় কর্পোরেট দুনিয়া। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ পৌঁছে গিয়েছে আইনি লড়াইয়ে।
লরনা হাজ়দিনি নামের তরুণীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও বর্ণবিদ্বেষমূলক হেনস্থার অভিযোগ আনেন অধস্তন কর্মী তথা অভিযোগকারী তরুণ চিরায়ু রাণা। ৩৫ বছর বয়সি চিরায়ু গত মাসে দায়ের করা একটি মামলায় অভিযোগ করেছেন যে, লরনা তাঁকে দিনের পর দিন মাদকসেবন করানোর পর যৌন নির্যাতন করেছেন। তিনি আরও দাবি করেছেন যে, ওষুধ খাইয়ে যৌনমিলনে বাধ্য করতেন তাঁর বস্।
সেই মামলা নিয়ে জলঘোলা শুরু হয়েছে সংস্থার অভ্যন্তরে। এরই মাঝে জেপি মরগ্যানের চলমান বিতর্কে নয়া মোড়। একাধিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দাবি উঠেছে বিতর্কিত যৌন হয়রানির মামলাটি জনসমক্ষে না আনার জন্য খোদ জেপি মরগ্যান কর্তৃপক্ষ মীমাংসা প্রস্তাব দিয়েছিলেন চিরায়ুকে। জেপি মরগ্যান লিভারেজ়ড ফিন্যান্সের এগ্জ়িকিউটিভ লরনার বিরুদ্ধে আনা বিস্ফোরক মামলাটি এড়ানোর জন্য অভিযোগকারী, প্রাক্তন ব্যাঙ্কার চিরায়ুকে ১০ লক্ষ ডলারের একটি মীমাংসা প্রস্তাব দেয় বলে দাবি উঠেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেপি মরগ্যানের প্রাক্তন কর্মী চিরায়ু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা করার আগে সংস্থার কাছে ২ কোটি ডলারের বেশি দাবি করেছিলেন। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মামলাটি প্রকাশ্যে আসার আগে গত বছরের জুন মাসে চিরায়ু এই দাবিটি পেশ করেছিলেন সংস্থার কাছে।
যদিও এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণের দাবি মেনে নেয়নি জেপি মরগ্যান। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, চিরায়ু প্রাথমিক ভাবে ২ কোটি ডলারেরও বেশি দাবি করেছিলেন এবং কোনও চুক্তি না হলে বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশ করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। সংস্থার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য জেপি মরগ্যান পরে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য চিরায়ুকে ১০ লক্ষ ডলারের প্রস্তাব দেয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, সেই প্রস্তাব আসার পর চিরায়ুর বর্তমান আইনজীবী ড্যানিয়েল কে. কাইজার ১ কোটি ১৭ লক্ষ ৫০ হাজার ডলারের একটি পাল্টা প্রস্তাব দেন।
মামলার সাক্ষ্যে চিরায়ুর এক বন্ধু আরও একটি বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন লরনার বিরুদ্ধে বলে জানা গিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, চিরায়ুর ফ্ল্যাটে মাঝরাতে লরনা মদ্যপ হয়ে নানা কাণ্ড ঘটান। এমনকি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে এসে লরনা তাঁকে জাগিয়ে তোলেন। তাঁদের সঙ্গে শোয়ার ঘরে যেতেও অনুনয়-বিনয় করেন লরনা বলে অভিযোগ করেছেন চিরায়ুর বন্ধু। সেই রহস্যময় সাক্ষীর দাবি, লরনা তাঁকে বলেছিলেন ‘‘তোমারও আমাদের সঙ্গে এক ঘরে শোয়া উচিত।’’
সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলে জেপি মরগ্যানের এক মুখপাত্র বলেছেন, যদিও সংস্থার গোপনীয় আলোচনা ও কৌশল সম্পর্কে মন্তব্য করা অনুচিত। তবে তিনি এ-ও জানিয়েছেন তাঁর সংস্থাটি যে মামলা-মোকদ্দমার সময় ও খরচ এড়াতে এবং এক কর্মীর সুনাম বজায় রাখার জন্য একটি সমঝোতায় পৌঁছোনোর চেষ্টা করেছিল। কারণ সংস্থার সুনাম ক্ষুণ্ণ করার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। যদিও সংস্থার সুনাম ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্ত লরনা এবং তাঁর আইনি পরামর্শদাতারা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এমনকি সহকর্মীরা এই দাবিগুলোকে সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। জেপি মরগ্যানও এই অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে চিরায়ুর অভিযোগের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থার কর্তারা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সময়ের ইমেল এবং ফোনের রেকর্ড পর্যালোচনা করে লরনা সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু চিরায়ু করেননি।
গত ১৫ বছর ধরে জেপি মরগ্যানের মতো খ্যাতনামী আর্থিক সংস্থায় উচ্চ পদে কর্মরত লরনা। বর্তমানে সংস্থার লেভারেজড ফিন্যান্স বিভাগের নির্বাহী পরিচালক বা এগ্জ়িকিউটিভ ডিরেক্টর পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে হয় তাঁকে। কর্পোরেট গ্রাহকদের জন্য বিপুল পরিমাণ ঋণের ব্যবস্থা করা বা বন্ড ইস্যু করার মতো কাজগুলি তাঁর বিভাগের অধীনে।
চিরায়ু মামলায় উল্লেখ করেছেন, লরনা তাঁকে হুমকিও দিয়েছিলেন যে তাঁর কথামতো না চললে পদোন্নতি তো হবেই না, উল্টে বোনাসও কেটে নেওয়া হবে। চিরায়ুর দাবি, তাকে ‘রোহিপনল’ এবং ‘ভায়াগ্রা’র মতো জিনিস খাইয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন করেছেন লরনা। এমনকি তাঁর প্রতি বর্ণবিদ্বেষী মনোভাবও পোষণ করতেন লরনা, অভিযোগ চিরায়ুর।
অভিযোগ, পদমর্যাদার জোর খাটিয়ে অধস্তন কর্মীকে যৌন উত্তেজনাবর্ধক ওষুধ ও মাদক সেবন করিয়ে ‘যৌনদাস’ করে রেখেছিলেন ৩৭ বছরের লরনা। এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে আমেরিকা জুড়ে। সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষস্থানীয় মহিলা আধিকারিক লরনার বিরুদ্ধে প্রথমে ‘জন ডো’ ছদ্মনামে মামলা দায়ের করেন ওই প্রাক্তন ব্যাঙ্কার চিরায়ু।
বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং সমাজমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, জেপি মরগ্যানের প্রাক্তন কর্মী চিরায়ু জাতিগত বিদ্বেষের অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, লরনা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করার সময় তাঁকে ‘আমার ছোট্ট বাদামি ছেলে’ বলে সম্বোধন করতেন।
জেপি মরগ্যানে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে এসেছেন লরনা বলে দাবি। ২০১১-র এপ্রিল থেকে ২০২৬-এর মার্চ পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবন নিষ্কলঙ্ক। কোনও বিতর্ক বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি লরনার বিরুদ্ধে। ২৬ এপ্রিল প্রাক্তন কর্মী চিরায়ুর চাঞ্চল্যকর অভিযোগের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অভিযোগকারী চিরায়ু দাবি করেছেন যে, এই নির্যাতন ২০২৪ সালে শুরু হয়েছিল।
যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলা চিরায়ুর বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এর আগে চিরায়ু জেপি মরগ্যানের সুপারভাইজ়ারদের কাছে ছুটির আবেদন করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন যে তাঁর বাবা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মারা গিয়েছেন। ফলে তাঁর দীর্ঘ ছুটির প্রয়োজন। কিন্তু পরে জানা যায় যে তাঁর বাবা সেই সময় জীবিত ছিলেন।
যৌন হেনস্থা ও নিপীড়নের মামলায় করা দাবিগুলোতেও বেশ কিছু ফাঁকফোকর পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি। চিরায়ু দাবি করেছিলেন যে, লরনা তাঁর বোনাস পাওয়া-না পাওয়ার বিষয়টি নির্ধারণ করতেন।
‘দ্য পোস্ট’-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী চিরায়ু প্রকৃতপক্ষে সরাসরি লরনার অধীনে কাজ করতেন না। যদিও তাঁরা দু’জনেই লেভারেজড ফিন্যান্স টিমে কাজ করতেন। তবে তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন ম্যানেজারের অধীনে ছিলেন। এই বিষয়টিই মামলার একটি মূল দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে।