নিরাপত্তা দিতে পারছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অত্যন্ত স্নেহের’ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ফলে প্রাণের ভয়ে পেশোয়ার থেকে পাততাড়ি গোটানোর সিদ্ধান্ত নিল আমেরিকার কনস্যুলেট (দূতাবাসের আঞ্চলিক দফতর)। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল। এ বার কি তবে খাইবার পাখতুনখোয়া হাতছাড়া হতে চলেছে পাকিস্তানের? ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ সম্পর্কে ধরবে ফাটল? তুঙ্গে জল্পনা।
পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের মধ্যে অন্যতম হল উত্তর-পশ্চিমের খাইবার পাখতুনখোয়া। এর সঙ্গে আফগানিস্তানের লম্বা সীমান্ত রয়েছে। এই প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারে দীর্ঘ দিন ধরেই চলছিল মার্কিন কনস্যুলেট। চলতি বছরের ৬ মে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তা বন্ধ করার বিজ্ঞপ্তি জারি করে আমেরিকার বিদেশ মন্ত্রক। শুধু তা-ই নয়, সেখানকার যাবতীয় কাজকর্ম এ বার থেকে ইসলামাবাদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস পরিচালনা করবে বলে জানিয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
বিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতিও দিয়েছে মার্কিন বিদেশ দফতর। সেখানে বলা হয়েছে, ‘‘বিদেশে কর্মরত কূটনীতিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। আর তাই পেশোয়ারের কনস্যুলেট বন্ধ করা হচ্ছে। এতে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের নীতিগত সম্পর্কের কোনও বদল হবে না।’’ তবে ইসলামাবাদ, লাহৌর ও করাচিতে অবস্থিত দূতাবাস ও অন্য দু’টি কনস্যুলেট খোলা থাকছে বলে স্পষ্ট করেছে আমেরিকা।
বিশ্লেষকদের দাবি, পেশোয়ারের দফতর বন্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, গত কয়েক বছর ধরেই খাইবার পাখতুনখোয়ায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি নামের বিদ্রোহী গোষ্ঠী। কট্টরপন্থী জঙ্গি সংগঠন তকমা দিয়েও এদের বাগে আনতে পারছে না ইসলামাবাদ। উল্টে তাঁদের চোরাগোপ্তা হামলায় প্রায়ই প্রাণ যাচ্ছে রাওয়ালপিন্ডির অফিসার থেকে শুরু করে সাধারণ সৈনিকদের।
পাকিস্তানের অভিযোগ, পর্দার আড়ালে থেকে টিটিপিকে মদত ও আশ্রয় দিচ্ছেন আফগানিস্তানের তালিবান শাসকেরা। খাইবার পাখতুনখোয়ায় তাদের সৈনিকদের উপর হামলার ‘মূল চক্রী’ নাকি ভারত। নয়াদিল্লির প্রশ্রয়েই নাকি সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ইসলামাবাদের এ-হেন দাবি অবশ্য পত্রপাঠ উড়িয়ে দেয় দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র। কিন্তু, তাতেও দমে না গিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে কাবুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন রাওয়ালপিন্ডির ফিল্ড মার্শাল মুনির।
এর ফলে পাক-আফগান সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে খাইবার পাখতুনখোয়া। তালিবান লড়াকুদের ছোড়া একের পর এক আত্মঘাতী ড্রোন আছড়ে পড়ে পেশোয়ার-সহ একাধিক শহরে। তবে শক্তিশালী বিমানবাহিনী থাকার কারণে লড়াইয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে ইসলামাবাদ। আফগানদের রাজধানী কাবুলে ঢুকে বোমাবর্ষণ করে তারা। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, প্রতিশোধ নিতে আগামী দিনে ফিদায়েঁ হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে টিটিপি ও তালিবান।
সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, সেই ভয় থেকেই পেশোয়ারের কনস্যুলেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা। পাকিস্তানকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের আঞ্চলিক দফতরকে যখন-তখন নিশানা করতে পারে তালিবান ও টিটিপি। এতে তাদের কর্মীদের মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আর তাই আগেভাগে পাক-আফগান সীমান্তের ‘ব্যাটেলগ্রাউন্ড’ থেকে সরে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
দ্বিতীয়ত, পেশোয়ারের মার্কিন কনস্যুলেট বন্ধ হওয়ার নেপথ্যে অনেকে আবার ইরান যুদ্ধকেও দায়ী করেছেন। তাঁদের যুক্তি, অচিরেই তেহরানে নতুন করে আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াবে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। সেই লক্ষ্যে বর্তমানে প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই ‘সুপার পাওয়ার’। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তেল আভিভে ৬,০০০ টন গোলা-বারুদ পাঠায় ওয়াশিংটন। পাশাপাশি, পশ্চিম এশিয়ায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ডার্ক ইগল’ মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমেরিকার মোকাবিলায় অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করে তেহরান। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ। ফলে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরিন এবং ইরাকের দূতাবাস। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। ফলে আগামী দিনে তাদের নিশানায় পেশোয়ারের কনস্যুলেট থাকা একেবারেই বিচিত্র নয়।
সাবেক সেনাকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, সেই ভয় থেকেই পাক দূতাবাসের ওই আঞ্চলিক দফতর বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা। তা ছাড়া গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যৌথ অভিযানে প্রাণ হারান ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। ধর্মীয় কারণে ওয়াশিংটনের এই ‘আগ্রাসন’ মেনে নেয়নি ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর আমজনতা।
ফলে খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই পাকিস্তানে শুরু হয় গণবিক্ষোভ। মার্কিন দূতাবাস এবং কনস্যুলেটগুলির সামনে তা হিংসাত্মক আকার নিয়েছিল। বিক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় মুনির বাহিনীকে। উন্মত্ত জনতাকে থামাতে তাদের বিরুদ্ধে ওঠে গুলি চালানোর অভিযোগ। তাতে প্রাণ হারান ৩৫-৫০ জন। আহত হন শতাধিক আন্দোলনকারী।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর ফলে পেশোয়ারে কনস্যুলেট খুলে রাখা আর নিরাপদ বলে মনে করেনি আমেরিকা। তা ছাড়া ইরানে ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ চালানোর ইচ্ছা রয়েছে ট্রাম্পের। সেই অভিযানে পাক ভূমি যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার করতে পারে মার্কিন ফৌজ। আর্থিক দুরবস্থার কারণে ওয়াশিংটনের সেই আবদার ফিল্ড মার্শাল মুনির মেনে নিলে পাক সেনায় দেখা যাবে বিদ্রোহ। তখন তাদের হামলার মুখে পড়তে পারে পেশোয়ারের কনস্যুলেট।
এ-হেন পরিস্থিতিতে মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্পের মধুর সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকার ভিতরেই উঠছে নানা প্রশ্ন। চলতি বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ফক্স নিউজ় ডিজিটালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই ইস্যুতে মুখ খোলেন সামরিক নজরদার সংস্থা ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্র্যাসি’-এর সিনিয়র ফেলো বিল রোগিয়ো। তাঁর কথায়, ‘‘প্রেসিডেন্টের কোনও অবস্থাতেই পাকিস্তানকে বিশ্বাস করা উচিত নয়। কারণ, অতীতে আফগানিস্তানের যুদ্ধে পিঠে ছুরি বসানো বন্ধুর ভূমিকা পালন করেছে ইসলামাবাদ। আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তালিবানকে সমর্থন জুগিয়ে গিয়েছে তারা। ইরানের ক্ষেত্রেও তেমনই মতলব রয়েছে মুনিরের।’’
ইরান সংঘর্ষে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। কিন্তু, সেখানেও ইসলামাবাদের ‘ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ পাচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত পাক সেনাকর্তা আহমেদ সইদ। তিনি জানিয়েছেন, তেহরানের মূল ফৌজ ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির বহু কমান্ডারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে মুনিরের। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কুর্দ ফোর্সের সাবেক জেনারেল কাসেম সুলেমানি। ২০২০ সালে ইরাকে ড্রোন হামলায় তাঁকে হত্যা করে মার্কিন সেনা।
পাশাপাশি, আইআরজিসির কমান্ডার হুসেন সালামির কথাও বলা যেতে পারে। গত বছরের (২০২৫ সাল) জুনে ইজ়রায়েলি বিমানহানায় মৃত্যু হয় তাঁর। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বর্তমানে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে দু’নৌকায় পা দিয়ে চলার চেষ্টা করছেন মুনির। তাঁর উদ্দেশ্য হল, সাহায্যের নাম করে ট্রাম্পের থেকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া। এই অর্থ আগামী দিনে পাক জঙ্গি সংগঠনগুলিকে ফুলেফেঁপে উঠতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, গোপনে ইরানি ফৌজকে মদত জুগিয়ে লড়াই চালু রাখতে চাইছেন তিনি।
এ ব্যাপারে অবশ্য আরও একটা তত্ত্ব প্রকাশ্যে এসেছে। সেটা হল, ইরান যুদ্ধে পাক ফৌজের সাহায্য চেয়ে ট্রাম্প যে চাপ তৈরি করতে পারেন, তার ইঙ্গিত আগেই পেয়ে গিয়েছেন ইসলামাবাদের ফিল্ড মার্শাল। আর তাই প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে দেরি করেননি তিনি। মুনিরের নির্দেশে ফেব্রুয়ারিতেই হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে হামলা শুরু করে রাওয়ালপিন্ডির বিমানবাহিনী। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে সক্ষম হন পশ্চিমের প্রতিবেশীর সেনা সর্বাধিনায়ক।
এপ্রিল আসতে আসতে অবশ্য অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে পাক-আফগান যুদ্ধ। যদিও সীমান্তে অশান্তি লেগেই রয়েছে। ফলে ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’-এর জন্য ইসলামাবাদের জমি ব্যবহার করতে চাইলে, আমেরিকার সামনে নাটক করার সুযোগ পাবেন মুনির। পঠানভূমির সঙ্গে সংঘর্ষের কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন তিনি। এই একটি রাস্তা বাদ দিলে তাঁর সামনে সেনা বিদ্রোহ ঠেকানোর আর কোনও রাস্তা নেই বলেই মনে করে ওয়াকিবহাল মহল।
মুনিরের এ-হেন দু’মুখো নীতির কারণে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে ইজ়রায়েল। তার মধ্যেই পেশোয়ারের কনস্যুলেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত আমেরিকা নেওয়ায় ইসলামাবাদের উপর চাপ বাড়ল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।