India on Chabahar Port

ট্রাম্পের বজ্র আঁটুনিতে ফস্কা গেরো! নিষেধাজ্ঞা-কাঁটা এড়িয়ে ইরানি বন্দরে ঘুরপথে ব্যবসার ‘কৌশল’ নিল ভারত

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল থেকে ইরানের চাবাহার বন্দর ব্যবহার করা বন্ধ রেখেছে নয়াদিল্লি। সূত্রের খবর, ওই এলাকা হাতছাড়া না করতে এ বার ‘সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না’, এমন পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ ১৫:৫৩
Share:
০১ ১৮

কথায় বলে, ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’। ইরান-আমেরিকা সংঘাতে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি ভারত! কারণ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা-কাঁটায় তেহরানের চাবাহার বন্দর ব্যবহার করতে পারছে না নয়াদিল্লি। ফলে অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা। এই অবস্থায় আমদানি-রফতানি চালু রাখতে বড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্র, যাকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসাবে দেখছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

০২ ১৮

গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে ইরানি চাবাহার বন্দর ব্যবহার নিয়ে ভারতের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও কয়েক দিনের মধ্যেই সেই কড়াকড়ি শিথিল করে আমেরিকা। ওই সময় সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দেয় নয়াদিল্লির বিদেশ মন্ত্রক। সেখানে বলা হয়, ২৯ অক্টোবর থেকে ছ’মাসের জন্য চাবাহারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে ওয়াশিংটন। ফলে আপাতত ওই এলাকায় চালু থাকবে পণ্যের লেনদেন।

Advertisement
০৩ ১৮

কিন্তু, বছর ঘুরতেই আরও জটিল হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গী করে ইরান আক্রমণ করে বসে আমেরিকা। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে বেধে যায় যুদ্ধ। তার মধ্যেই ২৯ এপ্রিল মার্কিন ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলে তেহরানের উপর নিষেধাজ্ঞার নাগপাশ আরও শক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তখন থেকেই চাবাহার ব্যবহারের ‘ফাঁক’ খুঁজে বার করতে একরকম মরিয়া হয়ে ওঠে নয়াদিল্লি।

০৪ ১৮

সূত্রের খবর, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই ইরানি বন্দরে পণ্যের লেনদেন বজায় রাখতে একটি বিশেষ পদ্ধতি নিচ্ছে কেন্দ্র। জানা গিয়েছে, চাবাহারের অংশীদারি তেহরানের একটি স্থানীয় সংস্থার হাতে সাময়িক ভাবে হস্তান্তরিত করবে নয়াদিল্লি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকাকালীন বন্দর পরিচালনার ভার থাকবে তাদের কাঁধে। পরে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ফের তা ফিরে আসবে ভারতের হাতে। মোদী সরকারের এ-হেন সিদ্ধান্ত যে ‘বাস্তবচিত এবং কৌশলী’, তা বলাই বাহুল্য।

০৫ ১৮

বিশেষজ্ঞদের দাবি, সাময়িক ভাবে চাবাহারের নিয়ন্ত্রণ ইরানি সংস্থার হাতে দিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে নয়াদিল্লি। কোনও অবস্থাতেই তেহরানের এই বন্দর হাতছাড়া করতে নারাজ কেন্দ্র। সাবেক পারস্যের সংস্থা সাময়িক ভাবে সেটিকে পরিচালনা করলে অনায়াসে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে পারবে ভারত। শুধু তা-ই নয়, সে ক্ষেত্রে ‘খামখেয়ালি’ ট্রাম্পের রোষের মুখেও পড়তে হবে না মোদী প্রশাসনকে।

০৬ ১৮

অবস্থানগত কারণে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের ব্যবসা করা বেশ কঠিন। কারণ সেখানকার আফগানিস্তান, উজ়বেকিস্তান, কাজ়াখস্তান, কিরঘিজ়স্তান বা তাজিকিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলি মূলত স্থলবেষ্টিত। ফলে সামুদ্রিক রাস্তায় ওই দেশগুলিতে পণ্য পাঠানো সম্ভব নয়। আমদানি-রফতানি হতে পারে একমাত্র স্থলপথে। কিন্তু, সেই রাস্তায় আবার মূর্তিমান দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘চিরশত্রু’ পাকিস্তান।

০৭ ১৮

এই পরিস্থিতিতে ২১ শতকের গোড়ায় একটি বিকল্প রাস্তার খোঁজ পায় ভারত। ঠিক হয়, চাবাহার বন্দর ব্যবহার করে ইরানের মধ্যে দিয়ে এ দেশের পণ্য মধ্য এশিয়ায় নিয়ে যাবে নয়াদিল্লি। এতে পাকিস্তানকে এড়িয়ে ব্যবসা চালাতে কোনও অসুবিধা হবে না এ দেশের শিল্পপতিদের। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে ২০০৩ সালে তেহরানের দ্বারস্থ হয় কেন্দ্র। দু’পক্ষের মধ্যে শুরু হয় আলোচনা।

০৮ ১৮

২০১৫ সালে চাবাহার নিয়ে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করে ফেলে নয়াদিল্লি। ঠিক হয়, সমুদ্র বন্দরটিতে দু’টি টার্মিনাল তৈরি করবে ভারত। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ইরান সফরকালে সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় সই করে দুই দেশ। সেখানে ৫০ কোটি ডলার লগ্নির পরামর্শ দেয় কেন্দ্র। বিনিময়ে বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ বকলমে হাতে পায় নয়াদিল্লি।

০৯ ১৮

পরবর্তী বছরগুলিতে চাবাহারকে সাজিয়ে তুলতে বিপুল লগ্নি করে কেন্দ্র। শুধু তা-ই নয়, ধীরে ধীরে সেখানকার মুনাফাও ঘরে তুলেছে নয়াদিল্লি। গত বছর (২০২৫ সাল) এই ইস্যুতে সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে মোদী সরকার জানায়, শেষ পাঁচ বছরে চাবাহারে পণ্য পরিবহণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ। ২০২০-’২১ সালে সেটা ছিল ১২ লক্ষ ২৪ হাজার ৩৪৫ টন। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে সেটা বেড়ে ২২ লক্ষ ৩২ হাজার ২ টনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১০ ১৮

ইরানি শব্দ চাবাহারের অর্থ হল ‘চারটি ঝর্না’। গুজরাতের কান্দলা থেকে এর দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৫০০ নটিক্যাল মাইল। সংশ্লিষ্ট বন্দরটির কৌশলগত অবস্থানও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি পারস্য উপসাগরের হরমুজ় প্রণালীর উপর অবস্থিত। এই সামুদ্রিক রাস্তাটিকে পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলির খনিজ তেল পরিবহণের ব্যস্ততম রুট বলা যেতে পারে। ফলে চাবাহারকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, কাতার, বাহরিন এবং ওমানের মতো দেশগুলির সঙ্গেও পণ্য লেনদেন বৃদ্ধির সুযোগ পেয়ে থাকে কেন্দ্র।

১১ ১৮

দ্বিতীয়ত, ২০১৮ সালে রাশিয়ার ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’ বা আইএনএসটিসি (ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রাম্পপোর্ট করিডর) প্রকল্পে যোগ দেয় নয়াদিল্লি। সমুদ্র, রেল ও স্থলপথের ৭,২০০ কিলোমিটার লম্বা এই পরিবহণপথের একটা বড় অংশই থাকছে পারস্য দেশে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, চাবাহারকে আইএনএসটিসির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে লোহিত সাগর ও সুয়েজ় খালের প্রথাগত রাস্তা এড়িয়ে মুম্বই থেকে মস্কো পর্যন্ত পণ্য লেনদেন করতে পারবেন এ দেশের ব্যবসায়ীরা।

১২ ১৮

ভারত মহাসাগর ও পারস্য উপসাগরকে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’র মাধ্যমে কাস্পিয়ান সাগরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিবহণ রুটটি শেষ হবে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে। ফলে এর মাধ্যমে সহজেই ইউরোপের বাজারে নিয়ে যাওয়া যাবে পণ্য। বিশ্লেষকদের দাবি, আইএনএসটিসি পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে অনেকটাই হ্রাস পাবে আন্তর্জাতিক লেনদেনের খরচ। তখন প্রতি ১৫ টন পণ্যে ২,৫০০ ডলার করে বাঁচাতে পারবেন এ দেশের ব্যবসায়ীরা। আর তাই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।

১৩ ১৮

আইএনএসটিসি বাস্তবায়িত হলে উজ়বেকিস্তান, কাজ়াখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজ়ারবাইজ়ান ও আর্মেনিয়া-সহ মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ পাবে নয়াদিল্লি। চাবাহার এর অন্যতম ‘প্রবেশদ্বার’ হয়ে উঠতে চলেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট বন্দরটি হাতে রাখতে ইরানের সঙ্গে আরও ১০ বছরের চুক্তি করে কেন্দ্রের মোদী সরকার। এর পর এলাকাটির পরিকাঠামোগত উন্নতিতে সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেডের’ মাধ্যমে ৩৭ কোটি ডলার লগ্নি করে ভারত।

১৪ ১৮

ভারতের দিক থেকে চাবাহার হাতে রাখতে চাওয়ার নেপথ্যে আরও একটি যুক্তি রয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে ‘চিন পাকিস্তান আর্থিক বারান্দা’ বা সিপিইসি-র (চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর) অন্তর্গত বালোচিস্তানের গ্বদর বন্দরটি চালু করে ইসলামাবাদ। ফলে সেখানে রাওয়ালপিন্ডি ও বেজিঙের নৌসেনা ঘাঁটি তৈরির সুযোগ পাচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির জন্য যা বিপজ্জনক।

১৫ ১৮

কিন্তু, পাকিস্তানের গ্বদর বন্দর থেকে চাবাহারের দূরত্ব মাত্র ১৭০ কিলোমিটার। এ দেশের গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, আগামী দিনে গ্বদরকে কেন্দ্র করে ভারতের উপর নজর রাখার চেষ্টা চালাবে ইসলামাবাদ ও বেজিং। ইরানি এলাকাটি হাতে থাকলে উল্টে তাঁদের গতিবিধির উপর নজরদারি করা অনেক বেশি সহজ হবে। আর তাই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সেখানে নিজের উপস্থিতি বজায় রাখতে চাইছে কেন্দ্র।

১৬ ১৮

যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে ২৬ এপ্রিল চাবাহার থেকে প্রাথমিক ভাবে সরে আসে নয়াদিল্লি। তবে বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করেনি কেন্দ্র। উল্টে সমস্যা সমাধানে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে লাগাতার আলোচনা চালিয়ে যান মোদী সরকারের পদস্থ আধিকারিকেরা। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কথা বলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও।

১৭ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরান সংঘাত চলাকালীন নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয় ভারত। ফলে যুদ্ধের কারণে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করলেও নয়াদিল্লিকে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের তকমা দিয়ে সেখান থেকে খনিজ তেল নিয়ে যেতে দিয়েছে তেহরান। অন্য দিকে জ্বালানি সঙ্কটের কথা মাথায় রেখে রাশিয়ার তেল কেনায় ভারতকে ছাড় দেয় আমেরিকা।

১৮ ১৮

তবে কোন ইরানি সংস্থা সাময়িক ভাবে চাবাহারের দায়িত্ব পেতে চলেছে, তা অবশ্য আনুষ্ঠানিক ভাবে জানায়নি নয়াদিল্লি। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন এ দেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুনায়েত। তাঁর কথায়, ‘‘সংঘাত এড়িয়ে আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সেটা চাবাহার ছাড়া সম্ভব নয়।’’ সে দিক থেকে কেন্দ্র সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেই মনে করেন তিনি।

ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement