Hiroshima Nagasaki Survivor

পরমাণু হামলায় আহত হয়ে অন্য শহরে গিয়ে ফের পরমাণু হামলার শিকার, বাঁচেন দু’বারই! তার পরেও ইনি পৃথিবীর ‘আনলাকিয়েস্ট ম্যান’!

হিরোশিমার পরমাণু বিস্ফোরণের সময় হিরোশিমায় ছিলেন জাপানের সুতোমু। আবার তার ঠিক তিন দিন পর যখন নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলা হল, সেখানেও উপস্থিত ছিলেন তিনি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ ১০:৪৪
Share:
০১ ১৯

পরমাণু হামলা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু এমনও এক জন ছিলেন যিনি সরকারি হিসাবে পৃথিবীর বুকে হওয়া দু’টি পরমাণু হামলা থেকে বেঁচে ফেরা একমাত্র ব্যক্তি। তিনি সুতোমু ইয়ামাগুচি। বিবিসির তকমা অনুযায়ী, ‘দ্য আনলাকিয়েস্ট ম্যান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে অভাগা মানুষ।

০২ ১৯

সুতোমু যে অভাগা, তা তাঁর জীবদ্দশায় স্বীকার করে নিয়েছিল জাপানের সরকারও। আজ থেকে ৮১ বছর আগে হিরোশিমা এবং নাগাসাকি— জাপানের উভয় শহরেই পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের সময় উপস্থিত ছিলেন তরুণ প্রযুক্তিবিদ সুতোমু। সেই স্বীকৃতি পাওয়া ‘অভাগা’, যাঁর যাওয়া-আসার পথে সাগরের জল শুকোয় না। পরমাণু বিস্ফোরণ হয়!

Advertisement
০৩ ১৯

হিরোশিমার পরমাণু বিস্ফোরণের সময় হিরোশিমায় ছিলেন সুতোমু। আবার তার ঠিক তিন দিন পর যখন নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলা হল, সেখানেও উপস্থিত ছিলেন তিনি।

০৪ ১৯

অদ্ভুত ভাবে প্রতি বারই বিস্ফোরণস্থল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ছিলেন সুতোমু। ফলে বিস্ফোরণের তীব্রতায় গুরুতর জখম হন তিনি। সাময়িক ভাবে অন্ধ হয়ে যান। শ্রবণশক্তিও হারিয়ে ফেলেন। তবে বেঁচে যান।

০৫ ১৯

পেশায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সুতোমু জাপানের সংস্থা মিৎসুবিশির জন্য তেলবাহী জাহাজের নকশা তৈরি করতেন। ১৯৪৫ সালের ৬ অগস্ট, অর্থাৎ হিরোশিমায় পরমাণু বিস্ফোরণের দিন কর্মসূত্রেই সেখানে ছিলেন তিনি। তিন মাসের সফর সেরে সে দিনই তাঁর বাড়ি ফেরার কথা ছিল হিরোশিমা থেকে।

০৬ ১৯

ভোরবেলা দুই সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে হিরোশিমা স্টেশনের দিকে রওনা দিয়েছিলেন সুতোমু। কিন্তু মাঝপথ থেকেই ফিরে আসতে হয় তাঁকে। তিনি খেয়াল করেন সরকারি পরিষেবার জন্য তাঁর জরুরি পরিচয়পত্র বা ‘হ্যাংকো’ অফিসে ফেলে এসেছেন তিনি। তাই সহকর্মীদের স্টেশনে যেতে বলে সেই পরিচয়পত্র নিতে আবার অফিসের দিকে রওনা দেন সুতোমু।

০৭ ১৯

সকাল সওয়া ৮টায় সুতোমু অফিসের কাছাকাছি পৌঁছে যান। নিশ্চিন্তে হাঁটছিলেন বন্দরের পাশ দিয়ে। বন্দরলাগোয়ো অফিসে ঢুকতে যাবেন, তখনই হামলা হয়। আমেরিকার বোমারু বিমান থেকে হিরোশিমা শহরের ঠিক মাঝখানে নিক্ষেপ করা হয় পরমাণু বোমা ‘লিটল বয়’কে।

০৮ ১৯

আত্মজীবনীতে সুতোমু লিখেছেন, বোমারু বিমানটিকে আকাশে দেখেছিলেন তিনি। ঠিক তখন দু’টি প্যারাশ্যুটও নামতে দেখেন। সুতোমুর কথায়, ‘‘তার পরই আকাশে একটা প্রচণ্ড আলোর ঝলকানি। আমি ছিটকে পড়লাম।’’ হিরোশিমার ওই বিস্ফোরণে কানের পর্দা ফেটে গিয়েছিল সুতোমুর। কিছু ক্ষণের জন্য অন্ধও হয়ে গিয়েছিলেন জাপানি প্রযুক্তিবিদ।

০৯ ১৯

বিস্ফোরণস্থলের কাছাকাছি থাকার কারণে রাসায়নিক বিকিরণে শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গের অনেকটাই ঝলসে যায় সুতোমুর। জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরতেই প্রথমে দুই সহকর্মীর খোঁজ করেন সুতোমু। খোঁজ না পেয়ে জখম শরীরকে কোনও মতে টেনে নিয়ে গিয়ে স্টেশনে পৌঁছোন তিনি। চড়ে বসেন বাড়ি ফেরার ট্রেনে। হিরোশিমা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলেও অদ্ভুত ভাবে তখনও ট্রেন পরিষেবা চালু ছিল।

১০ ১৯

সুতোমুর বাড়ি নাগাসাকিতে। হিরোশিমার দুর্ঘটনার পরের দিন ৭ অগস্ট নিজের শহর নাগাসাকি পৌঁছে যান তিনি। হিরোশিমার বিস্ফোরণে জখম হয়েছিলেন সুতোমু। তা সত্ত্বেও গোটা গায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে ৯ অগস্ট কাজে হাজির হন প্রযুক্তিবিদ। তাঁকে দেখে তাঁর সহকর্মীরাও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

১১ ১৯

এর পর ঊর্ধ্বতন কর্তাকে হিরোশিমার ঘটনার বিবরণ দিতে যান সুতোমু। কিন্তু সেই কর্তা সুতোমুকে ‘পাগল’ বলে ঠাট্টা করেন। এর কিছু ক্ষণের মধ্যেই জাপানের বুকে ঘটে যায় আর একটি ভয়াবহ পরমাণু বিস্ফোরণ। ৯ অগস্ট সকাল ১১টায় পরমাণু বিস্ফোরণ হয় নাগাসাকিতে।

১২ ১৯

সুতোমুর অফিস থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ফেলা হয়েছিল আমেরিকার পরমাণু বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’। তবে অলৌকিক ভাবে সেই বিস্ফোরণ থেকেও বেঁচে যান সুতোমু। শারীরিক আঘাত না পেলেও নাগাসাকির বিস্ফোরণের পর টানা এক সপ্তাহ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। সমানে বমিও হচ্ছিল।

১৩ ১৯

নাগাসাকি বিস্ফোরণের সময় সুতোমুর স্ত্রীও ছিলেন শহরে। তিনিও বেঁচে যান দুর্ঘটনা থেকে। দু’জনে পরে দুই কন্যার জন্মও দেন। পরে নিজের বইয়ে সুতোমু লিখেছিলেন, সেই সময় ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ভুলতে চেয়েছিলেন তিনি। বিষয়টি যে অতীত, এটুকু ভেবেই নিশ্চিন্ত ছিলেন তিনি।

১৪ ১৯

এর পর অনেক দিন পর্যন্ত কর্মহীন ছিলেন সুতোমু। বছর পাঁচেক পরে ১৯৫০ সালে অনুবাদক হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। পরে পুরনো অফিস মিৎসুবিশিতেও ফিরে যান। আগের মতোই আবার জাহাজের নকশা করার কাজ শুরু করেন। ‘স্বাভাবিক’ জীবনযাপন শুরু করেন।

১৫ ১৯

তবে তখনও পর্যন্ত সরকারি খাতায় সুতোমু শুধুই নাগাসাকির বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে ফেরা মানুষ। তাঁর হিরোসিমার অভিজ্ঞতার কথা তখনও জানে না জাপানের সরকার। অন্য দিকে, সুতোমুর সন্তানেরা তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবং শারীরিক ক্ষতির ভার বয়ে নিয়ে চলছিলেন নিজেদের শরীরে।

১৬ ১৯

বয়স যখন প্রায় আশি, তখন সুতোমু ঠিক করেন অভিজ্ঞতার কথা লিখে রাখবেন তিনি। পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহতার কথা জানাবেন দেশের মানুষকে। সেইমতো আত্মজীবনী লিখেছিলেন সুতোমু। তাঁর সেই বই অবাক করে দেয় জাপানের মানুষকে।

১৭ ১৯

২০০৬ সালে সুতোমুকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি হয়। ছবির প্রদর্শন হয় আমেরিকাতেও। সেখানে শক্তিশালী দেশগুলির উদ্দেশে একটি বার্তা দিয়েছিলেন দু’বার মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া সুতোমু। তিনি বলেছিলেন, ‘‘আপনারা দয়া করে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করুন। অস্ত্র তৈরি করা বন্ধ করুন।’’ ২০০৯ সালে হলিউডের পরিচালক জেমস ক্যামেরন দেখা করেন সুতোমুর সঙ্গে। তাঁকে নিয়ে ছবি বানানোর কথাও বলেন। তবে তত দিনে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সুতোমু।

১৮ ১৯

বিকিরণের তীব্র প্রভাব পড়েছিল সুতোমুর শরীরে। শেষ বয়সে ছানি, লিউকোমিয়ার মতো অসুখে আক্রান্ত হন। ২০০৯ সালে সুতোমু জানতে পারেন, তিনি পাকস্থলীর ক্যানসারেও আক্রান্ত। তত দিনে ক্যানসারে স্ত্রীকে হারিয়েছেন তিনি। মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সেই সময় সুতোমুর মনে হয়, তাঁর জোড়া পরমাণু বোমা অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি থাকা দরকার। তাঁর নিজের জন্য নয়, ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র সম্পর্কে সাধারণ মানসে সচেতনতা তৈরি করতেই ওই স্বীকৃতি দরকার।

১৯ ১৯

এর পরেই সরকারের কাছে অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে আবেদন করেন সুতোমু। স্বীকৃতি পেয়েও যান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যাঁর দু’টি বিস্ফোরণেরই সাক্ষী হওয়ার কথা মেনে নেয় জাপানের সরকার। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে মারা যান সুতোমু। ওই বছরই ডিসেম্বরে তাঁকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করে বিবিসি। অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দ্য আনলাকিয়েস্ট ম্যান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। অনুষ্ঠানটিতে সুতোমুর ঘটনাটিকে ব্যঙ্গাত্মক ভাবে উপস্থাপন করার জন্য সমালোচিত হয়েছিল বিবিসি। শেষে প্রকাশ্যে ক্ষমাও চাইতে হয় তাদের।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement