সম্প্রতি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য তন্দুরের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে দিল্লিতে। তন্দুরের এই ধোঁয়ায় এয়ার কোয়ালিটির মান যেমন খারাপ হয়, দীর্ঘ দিন সেই ধোঁয়ায় শ্বাস নিলে নানা সমস্যাও তৈরি হতে পারে। আর এই তন্দুরে তৈরি মাংসের পদ নিয়মিত খেলে তা থেকেও হতে পারে নানা সমস্যা। রোস্টেড পদ কী ভাবে রাঁধবেন, তার উপরেই নির্ভর করছে খাবারের গুণমান ও স্বাস্থ্য।
তন্দুরি বা রোস্টেড খাবারে সমস্যা কোথায়?
ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট প্রিয়াঙ্গী লাহিড়ী বলছেন, “তন্দুরের ধোঁয়াটা স্বাস্থ্যকর নয়। এই ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে যাঁরা দীর্ঘ দিন কাজ করেন, তাঁদের সিওপিডির সমস্যা হতে পারে। তন্দুরে তৈরি খাবারের সঙ্গেও কিন্তু এই স্মোক খানিকটা চলে যায় আমাদের শরীরে। কাঠকয়লা থেকে কার্বন মোনোক্সাইড তৈরি হয়। অনেক সময়ে কয়লা বিশুদ্ধ না হলে সালফার ডাই অক্সাইড তৈরি হতে পারে। এগুলো শরীরের পক্ষে বিষাক্ত।” তাই যে সব বাচ্চার হাঁপানি আছে বা বয়স্কদের হার্টের সমস্যা আছে, তাঁদের এই খাবার নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে দেওয়াই ভাল।
তন্দুরে তৈরি মাংসের পোড়া অংশ খাওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। “উচ্চ তাপমাত্রায় মাংসজাতীয় খাবার রান্না করলে এইচসিএ (হেটারোসাইক্লিক এমিনস) তৈরি হয়, যেগুলো কার্সিনোজেনিক। তাই এই পোড়া অংশ খাওয়া চলবে না। খেলেও নিয়মিত খাওয়া যাবে না। মাঝেমাঝে খেলে সে ভাবে কোনও সমস্যা নেই,” বলে জানালেন প্রিয়াঙ্গী।
তন্দুরি বা কাবাব জাতীয় খাবার নিয়মিত খাওয়া না হলেও বাড়িতে বেগুনপোড়া খাওয়া হয়। লঙ্কা, পেঁয়াজ পুড়িয়ে ভর্তা বানিয়ে খাওয়ার চল রয়েছে অনেক বাড়িতে। অনেকে আবার লিট্টি খান। প্রিয়াঙ্গী বললেন, “মাংস উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ালে এইচসিএ তৈরি হয়, কিন্তু আনাজপাতি বা লিট্টি যেহেতু স্টার্চ-সমৃদ্ধ ফুড... এগুলোয় এইচসিএ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, লিট্টি পোড়ানোর সময়ে তাতে সোনালি রং ধরলেই নামিয়ে নিতে হবে, কালো হতে দেওয়া যাবে না। বেগুন বা আনাজপাতি পুড়িয়ে খেলে যে কালো অংশ তৈরি হচ্ছে, সেগুলো ভাল করে বাদ দিয়ে খাওয়ার উপযুক্ত করে নিন। এ ভাবে খেলে কোনও সমস্যা নেই।” তবে যে কোনও খাবারই অতিরিক্ত পুড়ে কালো হয়ে গেলে পিএএইচ অর্থাৎ পলিঅ্যারোম্যাটিক হাইড্রোকার্বনস তৈরি হয়, যা স্বাস্থ্যকর নয়। তাই পোড়া অংশ বাদ দিয়ে খেলেই ভাল। কোনও ভাজাভুজি করার ক্ষেত্রেও খেয়াল রাখবেন, তেল যেন পুড়ে না যায়। পোড়া তেলে রান্না করবেন না।
তা হলে কি তন্দুরি, কাবাব খাওয়া যাবে না?
খাদ্যতালিকা থেকে পুরো বাদ না দিয়ে বরং সতর্ক থাকতে হবে বলে জানাচ্ছেন প্রিয়াঙ্গী। কারণ উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না না করে কম আঁচে বেশিক্ষণ ধরে রান্না করা অনেক স্বাস্থ্যকর। আর গ্রিল, রোস্ট করার ক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভ বা এয়ার ফ্রায়ারে রান্না করা নিরাপদ বলে মনে করছেন প্রিয়াঙ্গী। কারণ এই দুই পদ্ধতিতেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
আর একটা জিনিসও মাথায় রাখতে হবে যে, এখনও গ্রামাঞ্চলে বা অনেক বাড়িতে কাঠকয়লা বা ঘুঁটে ব্যবহার করে রান্না হয়। “এই ওপেন বায়োমাস ফায়ার থেকে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, তা যদি কোনও বদ্ধ জায়গায় তৈরি হয়, তা হলে তার প্রভাব ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাবের চেয়েও বেশি। তাই এ রকম জায়গায় দীর্ঘ দিন কাজ করলে ভেন্টিলেশনের উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে,” বলে জানালেন প্রিয়াঙ্গী।
এত দিন ধরে যে ভাবে রান্না হয়ে এসেছে, তা নিয়ে এখন এত বিধিনিষেধ কেন? আসলে পৃথিবীর দূষণ ক্রমশ তার জৈব জগতে ঢুকে পড়ছে। আগে যে কাঠকয়লা পাওয়া যেত, তার চেয়ে এখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল দূষণ, কীটনাশক... এই সবই কয়লায় চলে আসছে। ফলে যখন তা উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে আসছে, তা বিষাক্ত বায়ু ও রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করছে। সেই জন্য এই ধরনের রান্নায় কয়লার ব্যবহার নিয়ে সতর্কতা বাড়ছে।
কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করছেন, সেই সম্পর্কে তাই সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। রান্না যদি ঠিক ভাবে করা হয় তা যতটা পুষ্টিকর, পদ্ধতিতে গলদ থাকলে তা ততটাই ক্ষতিকর। তাই এই ধরনের খাবার খাওয়ার সময়ে নিরাপদে রান্নাটা হচ্ছে কি না, সেটা নিশ্চিত করুন। আর রেস্তরাঁ থেকে এই ধরনের খাবার উৎসব-অনুষ্ঠানে বা মাঝেমাঝে অর্ডার করে খেলেও নিয়মিত এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস না করাই ভাল। বিশেষত খুব ছোট বাচ্চাদের বাইরে থেকে কিনে তন্দুরি, কাবাব বেশি না দিয়ে বাড়িতে কম তাপমাত্রায় গ্রিলড ফুড বা এয়ারফ্রাই করে বানিয়ে দিতে পারেন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে