আশা ভোঁসলে।
আশাজিকে একদম ছোটবেলা থেকে দেখেছি। আমার বাবা, সঙ্গীত পরিচালক মানস মুখোপাধ্যায়ের বহু কাজ করেছেন উনি। স্টুডিয়োয় যখন আসতেন রেকর্ডিংয়ের সময়ে, আমরা ভাই-বোনে বসে থাকতাম। এলেই প্রথমে পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিতাম। বাবার শেষ কাজ ছিল ‘বান্ধবী’ বলে একটা বাংলা ছবি। সেখানেও দুটো গান গেয়েছিলেন আশাজি। আমার বিয়েতেও এসেছিলেন। ওঁর সঙ্গে এত ব্যক্তিগত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, বলে শেষ করা যাবে না। ২০০৪-এ আশাজির সঙ্গে একটা বড় অনুষ্ঠান করেছিলাম। তখন আমার বড় ছেলের বয়স দু’বছর। স্টেজে উঠে বললেন, “এই বাচ্চাটাকে দেখছেন? ওর ঠাকুরদার সঙ্গে আমি কাজ করেছি, ওর বাবার সঙ্গে শো করছি, ও বড় হলে ওর সঙ্গেও গাইব।” এই কথাটা শুনলেই বোঝা যায়, কতটা জীবনীশক্তিতে ভরপুর একজন মানুষ ছিলেন!
আমি ওঁর সঙ্গে একাধিক হিন্দি, বাংলা গান রেকর্ড করেছি। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ে আলাদা আলাদা রেকর্ডিং হত। বরং অন্য সময়ে ওঁর কাছ থেকে গাওয়ার ব্যাপারে প্রচুর উপদেশ পেতাম। একবার রাজু সিংহের স্টুডিয়োয় ওঁর সামনে গাইছি। আমার গান শুনে বেশ কয়েকটা টিপস দিয়েছিলেন, মনে আছে— ‘গলার কম্পন যেন বেশি না হয়’, ‘নাক দিয়ে একদম গাইবে না’, ‘যে কোনও ‘আ-কার’-অন্ত শব্দের উচ্চারণ খুব স্পষ্ট ভাবে করবে’... ইত্যাদি। ওঁর গান বার বার শোনাটাই একটা বড় শিক্ষা। বিশেষ করে উচ্চারণ, অভিব্যক্তি। আমার ‘জবসে তেরে নয়না’ গানটা খুব পছন্দ করতেন উনি, বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেটা একাধিক বার বলেওছেন। বলতেন, “শানের গলায় দানা আছে, যেটা আমার খুব ভাল লাগে।” সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে আশা ভোঁসলের কাছ থেকে এমন প্রশংসা পেয়েছি... আর কী চাই!
কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, আশাজির গাওয়া আমার প্রিয় গান কোনগুলো, সবচেয়ে আগে মনে পড়ে পঞ্চমদার সঙ্গে ওঁর গানগুলোর কথা। বিশেষ করে পুজোর গান। বাঙালি হওয়ার একটা বিরাট সুবিধে হল, আমরা আশাজির বাংলা গানগুলোর স্বাদ গ্রহণ করতে পারি। ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও, তাতে আগুন পাবে...’র মতো গান আর কি হবে? আরডি বর্মণ-আশা ভোঁসলে জুটির সব ক’টা গানই যেন— এ বলে আমায় দ্যাখ, ও বলে আমায়!
আশাজি সব সময়েই নিজের একশো শতাংশ দিতেন... সেটা লাইভ শো হোক কিংবা কোনও রিয়্যালিটি শোয়ের বিচারকের আসনে। মন দিয়ে শুনে, খুব ভেবেচিন্তে মতামত দিতেন। ওঁর আর একটা বড় গুণ, মনে আর মুখে এক ছিলেন। কোনও ভণিতা ছিল না।
৯০ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে আমি ওঁর একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেই সময়ে গানবাজনা নিয়ে প্রচুর আড্ডা হয়েছিল। তা ছাড়া মাঝে মাঝেই ফোনে গল্প হত। আশাজি হঠাৎ করে ফোন করতেন। কোথাও কোনও আর্টিকল পড়ে, বা কোনও শো দেখে ফোন করে একেবারে মায়ের মতো করে বলতেন। একবার আমি কোনও একটা রিয়্যালিটি শোয়ে একটু নেচেছিলাম। ফোন এল পরদিন। বললেন, “কেয়া রে! তু ডান্স কর রহা হ্যায়? তু সিঙ্গার হ্যায়, ভুল যাতা হ্যায়? নাচনে কি কেয়া জ়রুরত থি?” একটু বকাবকি করলেন। কিছু সপ্তাহ পরে আবার ফোন। সে বার প্রচুর প্রশংসা, অনেক উৎসাহ দিলেন। ওঁর করা শেষ ফোনটা মনে থাকবে। বেশ রাতে, প্রায় ১২টা নাগাদ হঠাৎ একদিন ফোন এল আশাজির— “তোমার ছেলেও গাইছে শুনলাম? ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো একদিন, গান শুনি, আশীর্বাদ দিই।” আমার ছোট ছেলে মাহীর সঙ্গে ফোনে কথাও বললেন তার পর, আশীর্বাদ দিলেন। তবে ওঁর কথা আমি রাখতে পারিনি। ছেলেকে নিয়ে আর যাওয়া হয়নি ওঁর কাছে। আবার ওঁর ফোন আসবে, এই অপেক্ষায় ছিলাম। তবে সেটা আর কখনও আসবে না।
যে কোনও বড় শিল্পীর লক্ষণ, তাঁরা পারফেকশনিস্ট হন। আশাজিও ব্যতিক্রম ছিলেন না। সুর, তালের এতটুকু বিচ্যুতি হত না। সব ধরনের গান নিজের মতো করে নিয়ে গাইতেন। গজ়ল, ক্যাবারে, ভজন— সব ধরনের গানে আলাদা অ্যাপ্রোচ। এত বৈচিত্র আর কারও গানে নেই। আশাজির মতো হওয়া তো মুশকিল, কিন্তু উনি এটা দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন, চাইলে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। একজন শিল্পীর কাছে যদি কোনও আশা থেকে থাকে, তার নাম আশাজি।
অনুলিখন: সায়নী ঘটক
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে