‘বোকা’ হওয়াই যখন বুদ্ধিমানের কাজ! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
পিনপিনে যান্ত্রিক আওয়াজে ঘুম ভাঙল। চোখ না খুলে হাতড়ে যে ফোনটা হাতে পেলেন, তার সারা গায়ে ছোট ছোট বোতাম। ‘অন’ করতেই ছোট্ট ডিজিটাল পর্দায় আলো জ্বলল। রঙিন নয়, সাদা-কালো। তাতে ফুটে উঠলো ভাঙা ভাঙা অমসৃণ হরফে লেখা সময়, তারিখ। ব্যাস ওটুকুই।
হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়া নোটিফিকেশন নয়। নিউজ় আপডেট নয়। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা মেসেঞ্জারের চ্যাটবক্সে জমে থাকা চ্যাটের পাহাড় নয়। ফোন খুলতেই রিল-ভিডিয়োর লম্বা লিস্টও নয়, বোতাম টিপলেই গোটা দুনিয়ার সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার মাথাব্যথা? নাহ্, সে সবও নেই। শুধুই সাদাকালো হরফে সময় আর তারিখ। ফোন করা যাবে। দেখা যাবে মেসেজ লিস্টে শেষ আসাযাওয়া এসএমএস-ও। তার বাইরে অবসরে বড়জোর খেলা যাবে সাপের বল গেলার খেলা। তা-ই বা কত ক্ষণ! সাপের লম্বা চেহারাকে এ দিক সে দিক ঘোরাতে গিয়ে আঙুল ব্যথা হলেই ক্ষান্তি। চোখ সরতে বাধ্য ফোন থেকে।
স্বপ্ন নয়। টাইম মেশিনে চেপে পঁচিশটা বছর পিছিয়েও যাননি। বরং এমন দৃশ্যের শরিক হতে পারেন নিজেই। ২০২৬ সাল থেকে ভবিষ্যতের দিকে আরও বছর বিশেক এগিয়ে গেলে। যে বদলের বীজ ইতিমধ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে পাতা মেলতে শুরু করেছে। স্মার্টফোনের ‘অত্যাচারে’ খানিক বিরক্ত হয়েই তাকে বিদায় জানাতে শুরু করেছেন মানুষ।
ব্যাপারটা খানিকটা উপরে উঠতে থাকা এসক্যালেটর বেয়ে জোর করে নীচে নামার মতো। অসম্ভব জেনেও শেষ চেষ্টা। আর সেই চেষ্টাই করতে শুরু করেছেন কিছু মানুষ। কারণ, তাঁরা বুঝছেন, চলন্ত সিঁড়ি যে স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে, সেখানে পৌঁছোনোটা কোনও ভাবেই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।
জেনে বুঝেই তাঁরা বেছে নিচ্ছেন সেই ফোন, যাতে ইন্টারনেট নেই। নেই ঝকঝকে রঙিন ছবি দেখাতে পারঙ্গম এলইডি পর্দা। নেই যখন তখন সব ভুলে হারিয়ে যাওয়ার ওটিটি অ্যাপ বা সমাজমাধ্যম। যে ফোন আঙুলের আলতো টোকা পেয়েই ‘ডোরেমন’-এর জাদু দরজার মতো একটানে অন্য দুনিয়ায় নিয়ে যাবে না। তেমন ফোনের কাছেই ধীরে ধীরে ফিরতে চাইছেন মানুষ। কারণ, চালাক চতুর ‘স্মার্ট’ ফোন তার নানা লোভনীয় পসরা নিয়ে ভাগ বসাচ্ছে এ যুগের সবচেয়ে দুর্মূল্য জিনিসটিতে— সময়।
প্রতি দিন নানা দুর্লভ মুহূর্ত হাতে ধরা দিয়েও ফসকে যাচ্ছে স্মার্টফোনের জন্য। সে কথা যে মানুষ জানেন না, তা নয়! কিন্তু অনেকেই আন্দাজ করতে পারছেন না, অদূর ভবিষ্যতে ওই প্রবণতা কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারে। বুঝতে পারছেন না, হাতে ধরা এক ছোট্ট রঙিন জানলা দিয়ে ধীরে ধীরে শরীরের অর্ধেকটা গলিয়ে দেওয়া হয়ে গিয়েছে। এ ভাবে চললে এক সময় পুরোটাই যাবে। মৌলিক সত্তা বলে কিছু থাকবে না। ফোনের সামনে পড়ে থাকবে কিছু অদৃশ্য হাতের মগজধোলাইয়ের ফলাফল। চুরি যাবে ষোলআনা নিজস্বতা। চুরি যাবে এবং এখনও যাচ্ছে আরও অনেক কিছুই, যা করার সাহস পায়নি অপেক্ষাকৃত কম স্মার্ট বোতাম টেপা ফোন। যাকে এখন ‘বোকা’ বা ‘ডাম্ব’ ফোন বলা হচ্ছে। আর এই উপলব্ধিই স্মার্টফোনের প্রতি বিরাগের পালে হাওয়া টেনেছে। দুনিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে ‘ডাম্ব ফোন মুভমেন্ট’।
ঘটনার সূত্রপাত বছর কয়েক আগে। ২০২৩ সালে আমেরিকায় এক টিকটক ব্যবহারকারী প্রথম ‘ব্রিংব্যাকফ্লিপফোন’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে ভিডিয়ো পোস্ট করার পরেই সেই ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছিল। তথাকথিত আধুনিকতম প্রজন্ম জেন জ়ি তো বটেই, অজস্র ‘মিলেনিয়াল’ অর্থাৎ তাদের আগের প্রজন্মের প্রতিভূও সমর্থন জানিয়েছিলেন তাতে। তার পরে একে একে এমন বহু প্রচার চলেছে। কোনও দল চেয়েছে স্মার্টফোনের বদলে ব্ল্যাকবেরিকে ফিরিয়ে আনতে। কোনও দল চেয়েছে স্মার্টফোনের বদলি হিসাবে সেই প্রথম জমানার ইটের মতো ভারী আর শক্ত ‘নোকিয়া ১১১০’ ফিরিয়ে আনতে। ব্রিটেনে স্মার্টফোন-মুক্ত শৈশবের পক্ষেও পথে নেমেছেন বাবা-মায়েরা। আর এই সব কিছু যার দাবিতে, তার কেন্দ্রে রয়েছে সেই প্রথম যুগের বোতাম টেপা ফোন। ‘ডাম্ব’ ফোন।
এমন ফোন, যা মুখ ফুটে বলার আগে বুঝে নেবে না, কী খুঁজতে চাইছেন। আড়চোখে নজর রাখবে না ফোনের তথ্য ভাণ্ডারে, যে ফোন অ্যালগরিদমের আঁক কষে সূক্ষ্ম ভাবে সাজিয়ে দেবে না সারা দিনে আপনি কী দেখবেন, কতটা দেখবেন আর কী দেখবেন না। কোনটা দেখলে মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ হবে, কোনটা দেখলে ঠোঁটের কোণে ফুটবে হাসির রেখা, কী কী দেখতে থাকলে চোখ সরবেই না স্মার্টফোন থেকে। ২০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন, ৪০ সেকেন্ডের প্রচারও সহ্য করে নেবেন শুধু পরের কন্টেন্ট-এ কী আছে জানার জন্য। সুখী হরমোনের গোড়ায় আরও সুড়সুড়ি খাওয়ার জন্য। সর্ব ক্ষণের সঙ্গী যে ফোন, তার স্মার্টনেসের আড়ালে কষা মগজধোলাইয়ের ওই জটিল অঙ্কটি যত স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে, ততই মানুষ উপলব্ধি করছে আশু বিপদসঙ্কেত। আর তখনই অতি স্মার্টনেসে ভয় পেয়ে ‘জব উই মেট’ এর করিনা কপূরের মতো তারা বলে উঠছে, ‘ইস ফোন কো অব বোরিং বনা দো!’
এক রকম সাধ করেই ‘বোকা’ হওয়ার এই বিপ্লব। তবে বিদেশে ইতিমধ্যেই তা প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অস্কারজয়ী সিনেমা ‘থিয়োরি অফ এভরিথিং’-এর নায়ক এডি রেডমেন আইফোন ছেড়েছেন বেশ কয়েক বছর আগেই। বদলে কিনেছেন, সস্তার একটি ডিজিটাল ফিচার ফোন এবং এডি জানিয়েছেন, ওই বদল তাঁর জীবনের ভার খানিকটা হলেও কমিয়েছে। আগের থেকে এখন অনেক বেশি হালকা বোধ করেন তিনি। স্মার্টফোন থেকে বিরতি নিয়েছেন সেলেনা গোমেজ়, জাস্টিন বিবার, এড শিরানের মতো তারকারাও। কারণ হিসাবে এঁরা নানা ভাবে জানিয়েছেন, এতে নিজের সঙ্গে কথোপকথনের সুবিধা হয়েছে। হলিউডের অভিনেতা মাইকেল সেরা স্মার্টফোন ছেড়ে বেছে নিয়েছেন ফ্লিপফোন, ‘পার্ল হার্বার’ অভিনেত্রী কেট বেকিনসেলও স্মার্টফোন ছেড়ে ফ্লিপফোন বেছে নিয়েছেন মানসিক সুস্থতার কথা ভেবে। অভিনেকা ক্রিস পাইন আবার আইফোন ছেড়ে ৪ বছরের জন্য ডাম্ব ফোনে ব্যবহার করে আবার স্মার্টফোনে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘এ যুগে ব্যাপারটা কঠিন। স্মার্টফোন ছেড়ে থাকতে মনের জোর লাগে। যাঁরা পেরেছেন, তাঁদের আমার অভিবাদন। আর আমি বলব, প্রতি মুহূর্তে স্মার্টফোন বর্জনের লড়াইটা চালিয়ে যাব। যদি কাল পারি, তবে কালই আবার ফিরব ডাম্বফোনে। কারণ, এই আধুনিক মেশিনটা বড় খারাপ। শরীরের জন্য তো বটেই, মনের জন্যও।’’
যদিও এ লড়াই কেবল ব্যক্তিগত লক্ষ্যপূরণের লড়াই নয়, এ লড়াইয়ের এই মুমূর্ষু পৃথিবীকে একটু শান্তিতে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যও। কারণ, স্মার্টফোন উষ্ণায়ণেরও পরোক্ষ কারণ।
অনেকেই জানেন আবার অনেকে হয়তো জানেন না যে, কলকাতায় বসে যখন কেউ স্মার্টফোনের পর্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাই-ডেফিনিশন ভিডিয়ো স্ট্রিম করেন বা কেউ যখন এআইয়ের সঙ্গে নানা অকাজের গল্পে মাতেন বা নানা তথ্য খুঁড়ে বার করতে বলেন, তখন গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের আগুনে একটু একটু করে ঘি পড়তে থাকে। দুনিয়ার মানুষের ‘ডেটা হাঙ্গার’ বা তথ্যের খিদে মেটানোর দায়িত্বে আয়ারল্যান্ড বা আমেরিকায় যে অতিকায় ‘ডেটা সেন্টার’ বা সার্ভার রুমগুলি রয়েছে, সেগুলি গনগনে গরম হয়ে ওঠে দিবারাত। আর তাকে ঠান্ডা করতে শুধু বিপুল বিদ্যুৎই পোড়ে না, গ্যালন গ্যালন পরিষ্কার জলও খরচা করতে হয়। সেই অপচয়ে তিলে তিলে আরও তপ্ত হতে থাকে পৃথিবী।
সেইখানে দাঁড়িয়ে বিচার করলে ডাম্ব ফোন পরম স্বস্তির জিনিস। এর ব্যাটারি এক বার চার্জ দিলে অনায়াসে সপ্তাহ পার করে। নিজের কাজের জন্য সে কোনও রাক্ষুসে সার্ভারকেও দিবারাত ব্যতিব্যস্ত করে তোলে না। অথচ যোগাযোগের কাজে যে খুব বেশি অসুবিধা হয়, তা-ও নয়। পরিবেশবিদেরা তাই ডাম্বফোন মুভমেন্টকে আগামীর এক অন্য ধরনের ‘সবুজ বিপ্লব’ হিসেবেও দেখছেন। এমনকি, ডিজিটাল দুনিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারেরা, যাঁদের রুজি রুটি বন্ধ হতে পারে স্মার্ট ফোন না থাকলে, তাঁরাও ‘স্লো লিভিং’-এর দোহাই দিয়ে বলছেন, ‘বোকা ফোন’ বেছে নেওয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ। বস্তুত তাদের প্রয়াসেই সূচনা হয়েছিল এই বিপ্লবের।
আসলে লড়াইটা কোনও যন্ত্রের বিরুদ্ধে নয় বরং যন্ত্রের হাত থেকে রাশ কেড়ে নেওয়ার। যে প্রযুক্তি একদা হাতের মুঠোয় বিশ্বকে এনে দিয়েছিল, এখন তারই হাতে বকলস বন্দি হয়ে এক রকম দাসত্ব করছে দুনিয়া। এই বিপ্লব সেই লাগাম নিজের হাতে নেওয়ার।
‘ডাম্ব ফোন’ মুভমেন্ট তাই কেবল কোনও খাপছাড়া ‘ট্রেন্ড’ নয় যে, ঢেউ দু’দিন উঠেই বুদবুদের মতো মিলিয়ে যাবে। বরং বোকা আর বোরিং হওয়ার এই বিপ্লব হচ্ছে একটা প্রবল ঝাঁকুনি দেওয়ার জন্য। যাতে ঝকঝকে রঙিন মায়াবী চশমা চোখ থেকে খসে পড়ে। হোঁচট খেয়ে মাটির গন্ধ শুঁকে মানুষ বাস্তবে ফেরে। বুঝতে পারে, হাতের কাছে সব পেয়ে যাওয়াও এক সময় চূড়ান্ত ক্লান্তিকর বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যখন সেটা হবে, তখন হয়তো আর ফেরার পথটি থাকবে না।