ইন্দিরা মাতৃসদন।
খাঁ খাঁ করছে গোটা চত্বর। কেউ কোথাও নেই। পর পর খালি চেয়ার। ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে কয়েকটা খালি বাক্স। হাতে গোনা কয়েক জন কর্মী সকালে আসেন। দিনভর কার্যত মাছি তাড়িয়ে দুপুরে বিদায় নেন তাঁরা। এটাই মেয়ো হাসপাতাল। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের বর্ধিত ইউনিট হিসেবে মাস কয়েক আগে ঘটা করে যার উদ্বোধন করেছিল স্বাস্থ্য দফতর।
নির্মীয়মাণ বাড়ি। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কবে কাজ শেষ হবে, কারও জানা নেই। ভবানীপুরে এটাই রামরিক হাসপাতাল। পিপিপি মডেলে পূর্ণাঙ্গ অর্থোপেডিক হাসপাতাল হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বাস্থ্যকর্তারা জানাচ্ছেন, আপাতত সেই পরিকল্পনা শিকেয়।
দেখলে মনে হবে যেন ভূতের বাড়ি। ধুলো পড়েছে চারপাশে। সার সার লোহার খাট। বিছানা গোটানো রয়েছে। এ দিক ও দিক মেলা রয়েছে ছেঁড়া গামছা অথবা পুরনো কাপড়ের অংশ। এটা ইন্দিরা মাতৃসদন। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ‘স্যাটেলাইট ইউনিট’। রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্তারাই মেনে নিচ্ছেন, ইন্দিরার হাল আক্ষরিক অর্থেই বেহাল।
প্রতিশ্রুতি ও পরিণতি
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলির উপরে চাপ কমাতে অন্য হাসপাতালগুলিকে ঢেলে সাজার ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানিয়েছিলেন, এতে পরিষেবার বিকেন্দ্রীকরণ হবে। ভোগান্তি কমবে মানুষের। তাঁর সরকারের পাঁচ বছর পূরণ হতে চলল, খাস কলকাতাতেই তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। কিছুটা হাল ফিরেছে চতুর্থ প্রকল্প অবিনাশ দত্ত মেটারনিটি হোমের। কিন্তু সেখানকার কর্তৃপক্ষেরও আশঙ্কা, সরকারি নজরদারির অভাবে সেখানেও না গয়ংগচ্ছ মনোভাব দেখা দেয়।
‘ঢেলে সাজা’র নমুনা
বহু বছর বন্ধ থাকার পরে ঘটা করে মাস কয়েক আগে ফের উদ্বোধন হয় মেয়ো হাসপাতালের। উদ্দেশ্য, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চাপ কমানো। কিন্তু উদ্বোধনই সার। ডাক্তার নেই, নার্স নেই, চতুর্থ শ্রেণির কর্মী নেই। স্বাস্থ্যকর্তারা মানছেন, তাড়াহুড়ো করে উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। মেডিক্যাল কলেজের এক সিনিয়র ডাক্তার বলেন, ‘‘আমরা মেয়ো-তে কাউকে রেফার করব কী ভাবে? একে তো এখান থেকে ওখানে পাঠানোর জন্য অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা নেই। তার উপরে আমাদেরও তো বিবেক বলে কিছু রয়েছে। ওখানে গেলে রোগীর ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা যাবে না। স্রেফ গুনতিতে বাড়ানোর জন্য হাসপাতালটা চালু হল।’’ স্বাস্থ্যকর্তাদের যুক্তি, আগের সরকারের আমলে এই হাসপাতাল দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। বর্তমান সরকার একে ফের চালু করার চেষ্টা করছে। কিছুটা সময় লাগছে। কিন্তু সেটা কত দিন? তার কোনও জবাব পাওয়া যায়নি।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাজ্যের মধ্যে সব চেয়ে বেশি প্রসব হয়। ওই হাসপাতালের চাপ কমাতে কয়েক বছর আগে অবিনাশ দত্ত মেটারনিটি এবং ইন্দিরা মাতৃসদনকে আর জি করের ‘স্যাটেলাইট ইউনিট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। পরিকাঠামোর উন্নতি ঘটিয়ে আর জি করে জায়গা না-পাওয়া রোগীদের ওই হাসপাতালে রেফার করা হবে বলে জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যকর্তারা। অবিনাশ দত্ত মেটারনিটি সেই দায়িত্ব উতরে দিলেও ব্যর্থ ইন্দিরা মাতৃসদন। রোগী ভর্তিই বন্ধ সেখানে। হয় না স্বাভাবিক প্রসবটুকুও। তিন-চার জন নার্স আর জনা কয়েক চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ছাড়া আর কেউ নেই সেখানে। সবেধন নীলমণি এক জন ডাক্তার কয়েক ঘন্টা আউটডোরে থাকেন। ব্যস, ওই পর্যন্তই। সরকারি নিয়ম থাকা সত্ত্বেও নিখরচার ওষুধ পান না প্রসূতিরা। ১০০ শয্যার এই হাসপাতাল কেন এ ভাবে অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে? সিজার তো দূরের কথা, এখানে সাধারণ প্রসবটুকুও হয় না কেন? স্বাস্থ্যকর্তাদের কাছে এর কোনও জবাব নেই। ইন্দিরা মাতৃসদনকে কার্যত ভুলেই থাকতে চান তাঁরা। যখন জেলায় জেলায় সিজারিয়ান-এর ইউনিট খোলার জন্য উদ্যোগী হওয়ার কথা ঘোষণা করছে সরকার, তখন খাস কলকাতার এমন একটি কেন্দ্র কেন ব্রাত্য, তার কোনও ব্যাখ্যাই নেই কারও কাছে।
অবিনাশ দত্ত মেটারনিটিতে ইমার্জেন্সি, সিজার এবং সিক নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট চালু হয়ে গিয়েছে। এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এখানকার পরিষেবার মান যথেষ্ট ভাল। অন্য দিকে, ইন্দিরা মাতৃসদনে ইন্ডোর যতটুকু খোলা ছিল, সেটাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কার্যত এখন সেটা পরিত্যক্ত বাড়ির চেহারা নিয়েছে। চার দিক সুনসান, ধুলো জমা লোহার খাট। এ দিক ও দিকে কুকুর-বেড়ালের আনাগোনা। যে ক’জন কর্মী ছিলেন, তাঁরা জানালেন, স্রেফ বসে বসেই তাঁদের দিন কাটে। আউটডোরে বসেও মাছি তাড়ানো ছাড়া কাজ নেই। মাঝেমধ্যে শিশুদের রুটিন টিকাকরণের জন্য আসেন কিছু মা। সন্ধ্যা নামার পরে নেশার আসর বসে চত্বরে। হাসপাতালের অবশিষ্ট কর্মীরা চান, হয় তাঁদের জন্য কাজের ব্যবস্থা হোক, নচেৎ এই যন্ত্রণা থেকে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হোক।
ভবানীপুরের রামরিক হাসপাতালকে পিপিপি মডেলের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে গ়ড়ে তোলার ঘোষণা করেছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। জানিয়েছিলেন, স্নায়ু চিকিৎসায় বাঙুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজির মতো একই ছাতার তলায় সমস্ত ধরনের অর্থোপেডিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে এখানে। সেই ঘোষণার পরে দু’বছর কেটে গিয়েছে। পুরনো রামরিক ভেঙে নতুন ভবন গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এখন সেখানে কী হবে, তা জানাতে পারেননি খোদ স্বাস্থ্যকর্তারাও।
এর পরে কী
খোদ স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় স্বীকার করে নিয়েছেন, অবিনাশ দত্ত মেটারনিটি বাদ দিয়ে এ শহরে অন্য প্রকল্পগুলি সফল হয়নি। তিনি স্পষ্ট জানান, এই মুহূর্তে রামরিক নিয়ে কোনও পরিকল্পনা নেই। তাঁর কথায়, ‘‘অর্থোপেডিক হাসপাতালের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তার পরে বিষয়টা আর এগোয়নি।’’
সুশান্তবাবু বলেন, ‘‘ইন্দিরা মাতৃসদন এবং মেয়ো হাসপাতালের বেহাল অবস্থার কথাও জানি। কিন্তু কী করব? এক সঙ্গে এত প্রকল্প, অথচ লোকবল কম। এত ডাক্তার-নার্স-চতুর্থ শ্রেণির কর্মী কোথা থেকে পাব? সব স্তরের কর্মীরই তো আকাল। এত বছর নিয়োগ হয়নি। তার ভোগান্তি তো কখনও না কখনও পোহাতেই হবে।’’
কিন্তু সে সব না ভেবে কেন তড়িঘড়ি এত ঘোষণা করা হল? রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তার কাছে এর কোনও জবাব মেলেনি।
— নিজস্ব চিত্র