হাসপাতাল এখনও সেই ‘নেই’-রাজ্যই

মোটরবাইক থেকে পড়ে গুরুতর চোট পেয়েছিলেন সোনারপুরের দীপক সরকার। ব্যান্ডেজ করে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা দীপকবাবুর পরিজনকে কর্তব্যরত ডাক্তার জানান, ব্যথা কমানোর ওষুধ ফুরিয়েছে। বাইরে থেকে কিনতে হবে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ঘটনা।

Advertisement

সৌভিক চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০১:৩১
Share:

মোটরবাইক থেকে পড়ে গুরুতর চোট পেয়েছিলেন সোনারপুরের দীপক সরকার। ব্যান্ডেজ করে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা দীপকবাবুর পরিজনকে কর্তব্যরত ডাক্তার জানান, ব্যথা কমানোর ওষুধ ফুরিয়েছে। বাইরে থেকে কিনতে হবে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ঘটনা।

Advertisement

কীটনাশক খেয়েছিলেন পাতিপুকুরের এক মহিলা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে জরুরি বিভাগে আনা হলে তাঁরও আপৎকালীন চিকিৎসা জোটেনি। পরিজনদের জানানো হয়, ওষুধপত্র, অক্সিজেন বাইরে থেকে কিনতে হবে। কারণ ওই মুহূর্তে ওয়ার্ডে অক্সিজেনও ‘বাড়ন্ত’। ঘটনাস্থল আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ।

এমনই হাল খাস কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলির। জীবনদায়ী ওষুধ-ইঞ্জেকশন থেকে শুরু করে অক্সিজেন, স্যালাইন, প্লাস্টার বা সেলাইয়ের সরঞ্জামও মেলে না বেশির ভাগ সময়ে। আর রোগীর পরিজনেরা এই অব্যবস্থার দায় চাপান মূলত জরুরি বিভাগে কর্মরত জুনিয়র ডাক্তারদের উপরে। কখনও কখনও গালিগালাজ-হাতাহাতি হয়। তার জেরে কর্মবিরতি পথেও যান জুনিয়র ডাক্তারেরা। তাঁদের অভিযোগ, এই ধরনের ঘটনায় কর্তৃপক্ষ পুলিশি প্রহরা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও পরিকাঠামো বাড়ানোর বিষয়টি উপেক্ষিতই থাকে।

Advertisement

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এক জুনিয়র ডাক্তার বলেন, ‘‘ঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে পারি না। রোগীরা ভাবেন, আমরা বুঝি চিকিৎসা জানি না। তাঁদের বাড়ির লোকেরাও খেপে ওঠেন। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। কী করব? দুঃস্থদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে পাঠাতে হয়, ভীষণ হতাশ লাগে।’’

আর জি করের এক জুনিয়র ডাক্তারের কথায়, ‘‘আমাদের মুখ খোলা বারণ। তবু বলছি, জরুরি বিভাগে যে পরিমাণ পরিষেবা লাগে তার পাঁচ শতাংশও দিতে পারি না। প্রতিদিনের ভিড় সামাল দেওয়ার মতো পরিকাঠামো নেই, হয়তো ইচ্ছাও নেই।’’ তিনি জানান, বেশির ভাগ সময়েই জীবনদায়ী ওষুধ থাকে না। বেশ কিছু ট্রলি ভাঙা। ট্রলি জুটলেও ঠেলার লোক নেই।

আর জি কর কর্তৃপক্ষ অবশ্য অভিযোগ মানতে নারাজ। সুপার প্রবীর মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বাজে কথা। ওষুধ নেই, অথচ সুপার জানেন না? হতে পারে? আমাদের এখানে সব রকমের পরিকাঠামোই পর্যাপ্ত রয়েছে। কারা এ সব বলেছে নাম বলুন।’’

একই সুর কলকাতা মেডিক্যালের সুপার শিখা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়। উল্টে তাঁর অভিযোগের তির জুনিয়র ডাক্তারদের দিকেই। তিনি বলেন, ‘‘ওরা কিছু জানে না। ওদের তো মাঝে মাঝে ডিউটি, তাই কোন ওষুধ কোথায় আছে সব ওদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আগে কখনও কখনও ওষুধ আসতে দেরি হত, কিন্তু ইদানীং সেই সমস্যা নেই।’’ যদিও সুপারের এই কথা শোনার পরে মেডিক্যালেরই এক জুনিয়র ডাক্তার বলেন, ‘‘দায় এড়াতে চাইলে কিছু বলার নেই। জরুরি বিভাগের সামগ্রিক পরিষেবা যে কত খারাপ, তা হাসপাতালের সকলেই জানেন। আর জানেন রোগীরা।’’

একই পরিস্থিতি নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ, ন্যাশনাল মেডিক্যাল, সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল এসএসকেএমেও। এনআরএসের জুনিয়র ডাক্তারেরা এক বাক্যে মানছেন, তাঁরা নিধিরাম সর্দার। সুপার আলি আমাম অবশ্য বলেন, ‘‘আমার কাছে এমন কোনও অভিযোগ আসেনি। আমাদের জরুরি বিভাগে সব আছে।’’ এসএসকেএম কর্তৃপক্ষও দাবি করেছেন, মাঝখানে মাস কয়েক কিছু সমস্যা চলছিল। এখন সব ঠিকঠাক। যদিও মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গিয়েও দেখা গিয়েছে, এক হৃদ্‌রোগীকে ইমার্জেন্সি থেকে কার্ডিওলজি বিভাগে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়ির লোক।

দফতরের এক কর্তার কথায়, ‘‘এখন টাকার অভাব নেই। তাই পরিকাঠামোর অভাব হওয়ার প্রশ্নই নেই। কোথাও হয়ে থাকলে স্থানীয় স্তরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিতে নজর দিচ্ছেন না। নয়তো জুনিয়রেরা এ সব অজুহাতে দায় এড়াচ্ছেন।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement