সম্প্রতি ‘দর্পণী’ শিক্ষায়তনের সৃজনোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জ্ঞান মঞ্চে। প্রথমে গুণিজন সংবর্ধনা। তার পর গুরুপ্রণাম। ভরতনাট্যম আঙ্গিকে গুরুবন্দনা নিবেদন করলেন বন্দনা আলাসে হাজরা। বন্দনা মুম্বইয়ের নালন্দা নৃত্যকলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর লাভ করে ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে, ‘ভরতনাট্যম আঙ্গিকে রবীন্দ্রনৃত্য নির্মাণ’ বিষয়ে গবেষণা করেন। জন্মসূত্রে মরাঠি হলেও কলকাতায় বেড়ে ওঠা এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করার জন্য মরাঠি ও বাংলা এই দুই ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ। দু’টি ভাষাতেই অনুবাদক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত। ভরতনাট্যম আঙ্গিকে তাঁর গুরুবন্দনা সুন্দর।
তার পর ওড়িশি নৃত্যের আঙ্গিকে ‘দর্পণী’র শিল্পীরা অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নিবেদন করেন মঙ্গলাচরণ (বিষ্ণুবন্দনা রাগ গুর্জরি টোড়ি, তাল ত্রিপাদ ও একতালি) জয়দেব রচিত অষ্টপদী (রাগ বিভাস, তাল আদি), পল্লবী (রাগ শিবরঞ্জনী: তাল একতালি ও যতি), দশাবতার (রাগ মোহনা, তাল ঝম্পা)। ‘দর্পণী’র পরিচালক অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক নৃত্য ও সমবেত নৃত্য পরিচালনার মান উল্লেখযোগ্য। তাঁর উপস্থাপনা যাঁরা ইতিপূর্বে দেখেছেন, তাঁরা স্বীকার করবেন, অর্ণবের দক্ষতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জয়দেবের অষ্টপদী ‘কিশলয় শয়ন’ সঙ্গীত (হিমাংশুশেখর সোয়াইন) ও তালবাদ্যের (সৌমরঞ্জন নায়েক) সঙ্গে অর্ণবের নৃত্য পরিবেশনা ভাল। মঙ্গলাচরণের নৃত্য নির্মাণ করেন রতিকান্ত মহাপাত্র (সঙ্গীত বিজয়কুমার জেনা)। দশাবতারের সঙ্গীত উপস্থাপনা করেন ভুবনেশ্বর মিশ্র। নৃত্য পরিচালনা অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের। দর্পণীর শিল্পীদের নৃত্যেও গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের ঘরানার প্রকাশ ঘটেছে। এই ঘরানার আর এক উত্তরসূরি রাজশ্রী প্রহরাজের নৃত্যেও ফিরে আসে কেলুচরণের নৃত্য পরিকল্পনা। কেলুচরণের পুত্র রতিকান্ত মহাপাত্রের কাছেও তিনি তালিম নেন। এ ভাবেই গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বেঁচে থাকে ভারতের ধ্রুপদী নৃত্য।
অনুষ্ঠান
- যাত্রাপথ কালচারাল সোসাইটির উদ্যোগে ও বিশিষ্ট সেতারবাদক অভিরূপ ঘোষের তত্ত্বাবধানে বালিগঞ্জের অলকা জালান ফাউন্ডেশন, দাগা নিকুঞ্জে অনুষ্ঠিত হল দু’দিনব্যাপী শাস্ত্রীয় সেতার সম্মেলন ‘দ্য ক্যালকাটা সেতার কনসার্ট ২০২৫’। সহযোগিতায় ছিল ভারতীয় বিদ্যা ভবন ও মিনিস্ট্রি অফ কালচার (ভারত সরকার)। দু’দিনের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করলেন বহু বিশিষ্ট সেতারবাদক ও তবলাবাদক। প্রথম দিন অনুষ্ঠানের শুরুতেই সৃজন চট্টোপাধ্যায়ের গান এবং অজয় ভট্টাচার্যের স্তোত্রপাঠ হয়। প্রবীণ সেতারবাদক পণ্ডিত নীলাদ্রি সেন রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী বাজিয়ে শোনান। তবলায় পণ্ডিত সমর সাহা। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে শোনা যায় যাত্রাপথের ছাত্রছাত্রীদের সমবেত সেতারবাদন। এর পর সেতারে রাগ ইমন কল্যাণে ধ্রুপদ অঙ্গে আলাপ, জোড় পরিবেশন করেন সংস্থার কর্ণধার সেতারবাদক অভিরূপ ঘোষ। গমক ও ছন্দের কারুকার্য এবং ধামার তালের প্রয়োগ মুগ্ধ করে। তবলায় সঙ্গত করেন রোহন বসু। অপ্রচলিত রাগ নাগেশ্বরীতে আলাপ ও বাগেশ্রী আড়াচৌতালে বন্দিশ বাজান অভিষেক মল্লিক, তবলায় সঙ্গতে ছিলেন বিক্রম ঘোষ। আসর শেষ হয় বিষ্ণুপুর ঘরানার সেতারশিল্পী মিতা নাগের রাগ মারোয়ার মধ্য দিয়ে। দু’দিনের এই সম্মেলনে জীবনকৃতি সম্মান প্রদান করা হয় পণ্ডিত কুমার বসু ও পণ্ডিত তরুণ ভট্টাচার্যকে। সঞ্চালনায় ছিলেন সৌম্যাদিত্য মুখোপাধ্যায় ও শুভ জোয়ারদার।
- সম্প্রতি সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে হয়ে গেল উদয়ন কলা কেন্দ্রের বার্ষিক অনুষ্ঠান ‘প্রয়াস ২০২৫’। এই দিন নাচের বিভিন্ন বর্ষের কৃতীদের পুরস্কৃত করা হয়। পুরস্কার তুলে দেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার। নৃত্য পরিবেশন করে সংস্থার ছাত্রছাত্রীরা। রবিশঙ্কর থেকে সলিল চৌধুরীর কম্পোজ়িশন, নানা গানের সুরে নৃত্য পরিবেশন করে কয়েকশো ছাত্রছাত্রী। পরে পরিবেশিত হয় ‘আজকের একলব্য’ প্রয়োজনাটি। উপস্থিত ছিলেন চন্দ্রোদয় ঘোষ, মমতাশঙ্কর। আলোকসম্পাতে ছিলেন রাতুলশঙ্কর।
- রিদম পার্ক অ্যাকাডেমির উদ্যোগে সোদপুর পানশিলা জাগরণী ক্লাবে অনুষ্ঠিত হল কিডস ড্রাম ফেস্টিভ্যাল। তৃতীয় বর্ষে পা দিল এই উৎসব। এ বছরের আয়োজন ছিল বিশেষ। সুরের ছন্দে বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী প্রয়াত জ়ুবিন গর্গের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করল খুদে শিল্পীরা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুদে শিল্পীরা অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল আয়ুষ দাস, চন্দ্রাক্ষী সরকার, শ্রেয়ান ঘোষ, প্রহেলিকা ঘোষ, সাত্ত্বিক মাজি, আশনা সেনগুপ্ত-সহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ধ্রুব ঘটক ও মৃণ্ময় ঘোষ। রক ব্যান্ড লক্ষ্মীছাড়ার সদস্য গৌরব (গাবু) চট্টোপাধ্যায় অনুষ্ঠানের সূচনায় অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠান শেষ হয় দলবদ্ধ পরিবেশনা দিয়ে, যেখানে অংশ নেন সেতারশিল্পী সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।
- সম্প্রতি বি ডি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হল তাল বেতাল-এর বার্ষিক অনুষ্ঠান। ছোটদের নিবেদনে ছিল সমবেত নৃত্য ও গল্পে ‘ছড়ায় সুকুমার রায়’ এই দু’টি অনুষ্ঠান। ছোটরা পরিবেশন করে সুকুমার রায়ের গল্প এবং কবিতা। এর পর বড়দের একক আবৃত্তি, সলিল চৌধুরীর কবিতা ও গান নিয়ে একটি কোলাজ ‘জীবনের হই মুখোমুখি’, মনোজ মিত্র রচিত ‘কাকচরিত্র’ নাটকের মঞ্চায়ন এবং শঙ্খ ঘোষ রচিত ‘সুপুরিবনের সারি’। গান-পাঠে, শ্রুতি অভিনয়ে ‘সুপুরিবনের সারি’ উপস্থাপিত করা হয়৷ সমগ্র অনুষ্ঠানের ভাবনা ও বিন্যাসে ছিলেন দিতিপ্রিয়া সরকার।
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)