(বাঁ দিকে) সেতারে পার্থ বসু , তবলায় সাবির খান (ডান দিকে)।
সম্প্রতি কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটির অ্যাম্ফিথিয়েটারে আয়োজিত হয়েছিল ‘আমি আর্টস ফেস্টিভ্যাল’-এর অন্তর্ভুক্ত ‘উত্তর-দক্ষিণ’ শীর্ষক এক অভিনব সঙ্গীতসন্ধ্যা। উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গসঙ্গীত এবং কর্নাটকী উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের সমমেলের প্রয়াসে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেতার শিল্পী পণ্ডিত পার্থ বসু, বেহালাবাদক ড. মাইসোর মঞ্জুনাথ, তবলায় উস্তাদ সাবির খান এবং মৃদঙ্গমে বিদ্বান এস শেখর।
উত্তর ও দক্ষিণের সাঙ্গীতিক মেলবন্ধন, দু’টি ধারার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, তাদের পার্থক্য ও সামঞ্জস্য এক সূত্রে গাঁথার প্রচেষ্টায় শিল্পীরা অনুষ্ঠান শুরু করলেন রাগ বেহাগ দিয়ে। উত্তর ভারতীয় রীতিতে বিলাবল বা মতান্তরে কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত বিশুদ্ধ এবং জনপ্রিয় এই রাগের দক্ষিণী রূপ শঙ্করভরণম মেলকর্তা রাগ থেকে জাত এক ‘জন্য রাগ’— নাম অবশ্য একই, বেহাগ। দুই শিল্পী নিজ নিজ ধারায় আলাপ দিয়ে শুরু করেন। আলাপের মধ্যে পারস্পরিক প্রভাবের কারণে দুই শিল্পীই প্রচলিত পথ থেকে মাঝে মধ্যে সরে গিয়ে কিছু নতুন স্বরসমষ্টির মাধ্যমে ভিন্ন রাস্তার খোঁজার চেষ্টা করেন। তীব্র মধ্যমের ব্যবহার স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি করার ফলে রাগরূপে একটা ভিন্ন স্বাদ এসেছিল। এর পর উত্তর ভারতীয় ধারায় জোড় এবং ঝালা বাজান পার্থ বসু এবং মঞ্জুনাথ তাকে অনুসরণ করেন। ধীর লয়ে জোড় শুরু হলেও মঞ্জুনাথ শুরু থেকে দ্বিগুণ লয়ে চলে যান বলে জোড় থেকে ঝালায় শিল্পীরা নিমেষের মধ্যেই পৌছে যান। এই পর্বের পরে পার্থ মধ্যলয়ে ‘লট উলঝি সুলঝা যা রে বালমা’-র সুরে একটি গৎ শুরু করেন এবং মঞ্জুনাথ গতের মুখটি ধরে রেখে তান বিস্তার করেন। উত্তর ভারতীয় তালের ধারায় উস্তাদ সাবির খানের তবলায় মধ্যলয় তিনতাল বাজলেও বিদ্বান এস শেখর মৃদঙ্গমে দ্বিগুণ লয়ে অনুরূপ আদিতাল ধরেন, ফলে কিছু ক্ষেত্রে মাত্রার মাপ মেলাতে মৃদঙ্গমে বিশেষ বেগ পেতে হচ্ছিল। তদুপরি উত্তর ভারতীয় রজাখানী গতের মাত্রার হিসেব কর্নাটকী পল্লবীর হিসেবের থেকে অনেকটাই আলাদা হওয়ার কারণে এস শেখরকে নানা সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সঙ্গত করতে হয়। এই বর্ষীয়ান শিল্পী তাঁর অভিজ্ঞতা এবং কল্পনাশক্তিকে সহায় করে এই অসাধ্য সাধন করে দেখালেন। শিল্পীরা এর পরে দ্রুত মধ্যলয় এবং দ্রুত তিনতালে আর দু’টি গৎ বাজিয়ে ও অন্তিমে ঝালা বাজিয়ে প্রথম পরিবেশনা শেষ করেন।
শিল্পীরা দ্বিতীয় রাগ হিসেবে চয়ন করেন রাগ চারুকেশী। এটি একটি বিশুদ্ধ কর্নাটকী মেলকর্তা রাগ যা পরবর্তীতে উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীতে নিজের স্থান করে নেয়। শিল্পীরা অবশ্য রাগদারীতে দুই ধারার বৈসাদৃশ্যগুলির কথা মাথায় রেখে প্রথমেই বলে দেন যে, তাঁরা কিঞ্চিৎ মুক্ত মনে বাজাবেন। যার ফলে রাগটিকে মিশ্র চারুকেশী বলে চিহ্নিত করাই সমীচীন হবে। সামান্য আওচারের পর দাদরা তালে আবদ্ধ একটি ধুন দিয়ে শুরু করেন পার্থ বসু এবং মঞ্জুনাথের ভায়োলিনে সেই ধুনেরই অনুরণন হতে থাকে। এর পর মধ্যলয় তিনতালে একটি গৎ বাজান শিল্পীরা। লয় খানিকটা বাড়িয়ে নিয়ে উভয় শিল্পী তালযন্ত্রীদের একক সওয়াল-জবাবের সুযোগ করে দেন। তবে উত্তর এবং কর্নাটকী তাল-লয়ের ব্যাকরণ একেবারেই আলাদা হওয়ায় সাবির খান এবং এস শেখর সেই এক সমস্যার সম্মুখীন হন। মাত্রার হিসেবে প্রতি মুহূর্তে কমবেশি হতেই থাকে। সেতার এবং ভায়োলিনে নগমা রাখা শুরু হলেও সেটি মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে তালযন্ত্রীদের একটু স্বাধীন ভাবে বাজানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়। এর পরে দ্রুতলয়ে একটি গৎ ধরে পার্থ বসু এবং মাইসোর মঞ্জুনাথ ঝালা বাজিয়ে কর্নাটকী রীতিতে একটি স্রোতবাহ জাতির চক্রদার বাজিয়ে শেষ করেন। যদি মাইসোর মঞ্জুনাথ মসিতখানী এবং রজাখানী গতের বাগানে সামান্য ‘রাগম-তানম-পল্লবী’-র সুবাস ছড়িয়ে দিতেন, হয়তো তাহলে খাঁটি অর্থে সমন্বয় বলা যেত। তবে নতুন সুরের খোঁজেই সঙ্গীতের মূল আনন্দ, শিল্পীরা সে আনন্দ শ্রোতাদের দিতে পেরেছেন।
অনুষ্ঠান
অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে