ইউরোপ জুড়ে ভূ-রাজনৈতিক কোন্দল বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ডের দিকে হাত বাড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আগামী দিনে রাশিয়ার সঙ্গে সম্মুখসমর অনিবার্য, সেই আশঙ্কা দৃঢ় হয়ে উঠছে ব্রিটিশ ফৌজের মধ্যে। অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধ শুরু হলে পূর্ণাঙ্গ লড়াইয়ের জন্য তৈরি হচ্ছে ব্রিটেনের সামরিক বাহিনী। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আঁটোসাঁটো করতে কোমর বেঁধে লেগেছে পরমাণু শক্তিধর দেশটি।
জাতীয় বিপদ, যে কোনও জরুরি অবস্থা বা শত্রু দেশের হামলা হলে সর্বাত্মক যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত উন্নতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন প্রতিরক্ষা দফতরের মাথারা। রুশ আক্রমণ ঠেকানোর জন্য ঢেলে সাজছে ইংরেজদের সামরিক ব্যবস্থা। যুদ্ধের জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ করছে তারা। ব্রিটিশ সেনার হাত শক্ত করতে নতুন একটি বিল পাশ করেছে কিয়ের স্টার্মার প্রশাসন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে খোলাখুলি কিভকে সমর্থন করতে শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভাবে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীকে সাহায্য করছে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী। রুশ অধিকৃত ক্রাইমিয়া উপদ্বীপের সঙ্গে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ রক্ষাকারী কার্চ সেতুকে যখন ইউক্রেনীয় বাহিনী নিশানা করেছিল, তখন ইউক্রেনকে ‘স্টর্ম শ্যাডো’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে সাহায্য করেছিলেন ব্রিটিশ সেনারা।
পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে, তাতে মস্কো-কিভ সংঘাতকে কেন্দ্র করে তীব্র হচ্ছে মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা। এই পরিস্থিতি খুব শীঘ্রই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। সাবেক ব্রিটিশ সেনাপ্রধান জেনারেল প্যাট্রিক স্যান্ডার্সের দাবি, ২০৩০ সাল নাগাদ মস্কোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াবে আটলান্টিকের দ্বীপরাষ্ট্র।
সাম্প্রতিক সময়ে ইংরেজ সরকারের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রধানেরা বার বার বড় আকারের যুদ্ধের আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সশস্ত্র বাহিনীর মন্ত্রী আল কার্নস গত বছরের ডিসেম্বরের ঠিক আগে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইতিমধ্যেই ইউরোপের দরজায় কড়া নাড়ছে যুদ্ধ। সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে ব্রিটেনকে এমন একটি সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে যা ইরাক ও আফগানিস্তানের মাটিতে সংঘটিত সংঘর্ষের চেয়ে কয়েক গুণ গুরুতর।
যুদ্ধে সাজো সাজো রব উঠলেও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্দর যে ধীরে ধীরে ফোঁপরা হয়ে উঠেছে সেই খবর হাটের মাঝে এনে ফেলেছিলেন ব্রিটেনের ‘চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ’ (সিডিএস) এয়ার চিফ মার্শাল রিচার্ড জন নাইটন। ফৌজিশক্তি নিয়ে সতর্কবার্তা দিতে গিয়ে সিডিএস নাইটন জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দুর্বলতার মূল কারণ হল সৈন্যঘাটতি। দিন দিন ফৌজে সৈনিকের সংখ্যা কমতির দিকে।
এখানেই শেষ নয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল হাউস অফ কমন্সের প্রতিরক্ষা কমিটির একটি প্রতিবেদনে। যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি সামরিক অভিযানের জন্য পরিকল্পনার প্রথম ধাপের কথা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। সেনাবাহিনীর রিজ়ার্ভে থাকা সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা নতুন বিলের প্রধান একটি অংশ বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলি।
যুদ্ধের জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত রাখতে সেনাবাহিনীর রিজ়ার্ভের কাঠামোকে শক্তিশালী করে তুলতে ‘বুড়ো ঘোড়া’দের ফিরিয়ে আনতে চায় ব্রিটিশ সরকার। দেশের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের বয়স ৫৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করতে চলেছে কিয়ের স্টার্মারের দেশ। প্রস্তাবিত নতুন বিলটি সংসদে পাশ হলে ৬৫ বছর বয়সি প্রবীণ সৈনিকদের যুদ্ধে পাঠানো হতে পারে।
সরকারের অনুমান, কৌশলগত রিজ়ার্ভের মধ্যে প্রায় ৯৫ হাজার সেনা রয়েছেন। এর মধ্যে রয়্যাল নেভি, সেনাবাহিনী এবং রয়্যাল এয়ার ফোর্সের প্রবীণ সৈনিকেরাও রয়েছেন। এই পরিবর্তনের ফলে ১০,০০০-এর বেশি প্রাক্তন সৈন্যকে জরুরি অবস্থায় যুদ্ধের জন্য ডাকা হতে পারে।
স্টার্মারের সরকারের এক জন মন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন এই সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে। তিনি সংবাদমাধ্যমে দাবি করেছেন যে ৫৫ হাজার প্রাক্তন সেনাকে জরুরি অবস্থার সময় দায়িত্ব পালনের জন্য ডাকা হতে পারে। সে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, সংসদে উপস্থাপিত সশস্ত্র বাহিনীর বিলের পরিবর্তনগুলি ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর করা হবে।
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্সে অষ্টম স্থানে নেমে গিয়েছে দু’টি বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী হওয়া ইংরেজ ফৌজ। গত দু’বছর ধরে ষষ্ঠ স্থান ধরে রেখেছিল তারা। গত ২০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম বার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সৈন্যবল তলানিতে ঠেকেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ব্রিটেনের সেনাবাহিনীকে কর্মীনিয়োগ এবং তাঁদের ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে।
সেনাবাহিনী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০১০ সালে। মাত্র ৭০ হাজার সৈন্য সামনের সারিতে পুরোদস্তুর যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশির ভাগ সামরিক শাখায় ৪১ বা ৪২ বছর বয়সের পরে সেনাবাহিনীতে যোগদানের অনুমতি নেই। সেনাবাহিনীতে বয়সসীমা ৩৫, নৌসেনায় ২৮ বছর। তবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নতুন সৈন্যদের প্রয়োজনের কারণে সেই নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল।
খুব বিরল ক্ষেত্রে, যেমন জাতীয় জরুরি অবস্থা হলে প্রাক্তন সৈন্যদের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনীতে। বেশির ভাগ শাখায় যখন এক জন আধিকারিক ৬০ বা ৬২ বছর বয়সে পৌঁছোন, তখন তাঁদের বাধ্যতামূলক অবসর বেছে নিতে হয়। অন্য দিকে কানাডার নাগরিকেরা ৫২ বছর বয়স পর্যন্ত রিজ়ার্ভে যোগদান করতে পারেন।
গত মাসে (জানুয়ারি) ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করেছে যে, মস্কো এবং কিভের মধ্যে ভবিষ্যতে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউক্রেনে সেনা মোতায়েন করবে ব্রিটেন। যদিও ঠিক কত জন ইংরেজ সেনাকে কিভের সুরক্ষা দিতে পাঠানো হতে পারে তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ৭,৫০০ জন পর্যন্ত ব্রিটিশ সেনাকর্মী মোতায়েন করা হতে পারে ইউক্রেনের মাটিতে।
ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুসারে ইংরেজ সেনাবাহিনীর বেহাল দশার জন্য মূলত দায়ী প্রতিরক্ষার বরাদ্দে ঘাটতি। সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে আগামী চার বছরে সামরিক খাতে অতিরিক্ত ২,৮০০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ প্রয়োজন বলে মনে করছেন এয়ার চিফ মার্শাল নাইটন। গত বছর (২০২৫ সালের শেষের দিকে) বাজেট ঘাটতির কথা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি, সেনাবাহিনীকে মজবুত করতে কী কী পদক্ষেপের প্রয়োজন, তা নিয়েও আলোচনা হয় দু’জনের।
বাহিনীকে শক্তিশালী করতে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। তাঁর কথায়, ‘‘জিডিপির ২.৩-২.৫ শতাংশ সামরিক খাতে বরাদ্দ হলে বছরে অতিরিক্ত ৬০০ কোটি পাউন্ড খরচ করতে হবে সরকারকে।’’ ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৩.৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে আটলান্টিকের এই দ্বীপরাষ্ট্র। ২০২৭ সালের মধ্যে সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয় জাতীয় আয়ের ২.৩% থেকে ২.৫% বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে লেবার পার্টির সরকার।
প্রতিরক্ষায় বরাদ্দের ভিত্তিতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বে পঞ্চম স্থানে ছিল ব্রিটেন। সেই সময়ে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৫,২৫০ কোটি ডলার। কিন্তু ২০১৭ সালে সেটা কমে দাঁড়ায় ৫,০৭০ কোটি ডলারে। ২০১৭ সালের পর ব্রিটেনের সামরিক খাতে অর্থবরাদ্দের ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তন আসে। এই বছরই প্রতিরক্ষাখাতে বরাদ্দের নিরিখে সাবেক শাসকদের ছাপিয়ে যায় ভারত।
২০২৩ সালে অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ২৩১৪ কোটি ডলার খরচ করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি সামরিক অভিযানের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে অর্থসাহায্য করতে হবে, নজর দিতে হবে বাহিনীর বাজে খরচ কমানোর দিকে। পাশাপাশি, হাতিয়ারের গবেষণা ও উন্নয়ন (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) খুবই জরুরি বলে মনে করছেন সমর বিশেষজ্ঞেরা।