একটি ‘লুকোনো’ দ্বীপ। তাতে প্রবেশের অধিকার নেই কোনও পুরুষের। কমিক্সের চরিত্র ওয়ান্ডার উওম্যানের গল্প ছড়িয়ে আছে সেই বিশেষ দ্বীপে। বিচ্ছিন্ন সেই গ্রিক দ্বীপের নাম থেমিসিরা। অ্যামাজ়ন গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের বাস সমুদ্রঘেরা কল্পকথার সেই ভূখণ্ডে। এই দ্বীপটির দণ্ডমুণ্ডের ‘কর্তা’ এক রানি। প্রত্যেক মহিলার মূল পরিচয় হল, তাঁরা অ্যামাজ়ন যোদ্ধা।
এমন পুরুষবিহীন ‘প্যারাডাইস আইল্যান্ড’ কি শুধুই কল্পনা? বাস্তবে কি সত্যিই কোনও অস্তিত্ব থাকতে পারে এমন দ্বীপের, যেখানে পুরুষের পা পড়া নিষিদ্ধ? হ্যাঁ, এই পৃথিবীর বুকেই রয়েছে বাস্তবের থেমিসিরা। সুদূরবিস্তৃত নীল জলরাশি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এক টুকরো দ্বীপ যেন স্বর্গের হাতছানি।
বাল্টিক সাগরের কোলে রয়েছে এই ‘স্বর্গদ্বীপ’। সেখানে ইচ্ছামতো ছুটি কাটানোর অধিকার শুধু মেয়েদেরই। সেখানে নেই কোনও পুরুষের বাঁকা মন্তব্য বা কটাক্ষ। নেই চোরাচাউনির অস্বস্তি। এই ব্যক্তিগত দ্বীপে পুরুষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। আক্ষরিক অর্থেই ‘নো ম্যান’স ল্যান্ড।
দ্বীপের নাম সুপারশি আইল্যান্ড। সাকিন বাল্টিক সাগরের নর্ডিক দেশ ফিনল্যান্ড। ‘সবচেয়ে সুখী দেশ বলে পরিচিত’ ফিনল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে, বাল্টিক সাগরের নীরবতা যেখানে চির বিরাজমান, সেখানেই যেন লুকিয়ে রয়েছে দ্বীপটি। এখানেই মেলে নারীদের নিশ্চিন্তে অবসরযাপনের সমস্ত বিলাসবহুল উপকরণ।
রাজধানী হেলসিঙ্কি থেকে খুব দূরে না হলেও শহুরে কোলাহল থেকে শত হস্ত দূরে। রাজধানী থেকে মাত্র ১০০ কিমি দূরে রাসেবোর্গ উপকূলের কাছে একটি ব্যক্তিগত দ্বীপই হল এই ‘নো ম্যান’স ল্যান্ড। ক্রিস্টিনা রথ নামে এক মহিলা এই দ্বীপের ‘ময়দানব’। শুধুমাত্র মহিলাদের ছুটি কাটানোর জন্যই তিনি এই দ্বীপটিকে সাজিয়ে তুলেছিলেন।
৮.৪ একরের এই দ্বীপে পৌঁছোলেই ভিন্ন জগতে পা রাখার মতো অনুভূতি জাগে। বিলাসবহুল ভিলায় থাকার বন্দোবস্ত তো রয়েইছে, সঙ্গে স্পা এবং যোগব্যায়ামের ব্যবস্থাও আছে। প্রযুক্তি পরামর্শদাতা সংস্থার সিইও ক্রিস্টিনার লক্ষ্য ছিল শুধু নারীদের জন্য একটি মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। এমন একটি জায়গা, যেখানে মহিলাদের জন্য কোনও বাধা থাকবে না। প্রকৃতির মাঝে কেউ চাইলে প্রকৃত অর্থেই নিজেকে নতুন করে খুঁজে নিতে পারেন।
দ্বীপের প্রশান্তি বজায় রাখার জন্য, সুপারশি-তে একসঙ্গে মাত্র আট জন মহিলার থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি ভিলাই কাঠের তৈরি। আরামদায়ক সেই কেবিনগুলি ঘন জঙ্গলে ঘেরা। পাইন গাছের ফিসফিসানি এবং সমুদ্রের মৃদু ঢেউয়ের গুঞ্জন এসে প্রতি দিনের উদ্বেগ ও ক্লান্তিকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যায়, এমনটাই জানিয়েছেন ভ্রমণার্থীরা।
প্রকৃতির মধ্যে মহিলাদের ছুটি কাটানোর সমস্ত আয়োজন মজুত করে তুলেছিলেন ক্রিস্টিনা। পাশাপাশি মহিলারা এখানে রান্নাও শিখে নিতে পারতেন। রয়েছে আরও অনেক কিছুর বন্দোবস্ত। যদিও সুপারশি দ্বীপে প্রচলিত অর্থে কোনও রিসর্ট তৈরি হয়নি। অতিথিরা নৌকায় আসতেন এবং শান্ত, নির্মল পরিবেশে বাস করে ফিরে যেতেন। সুপারশি দ্বীপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে ছিল এর কঠোর ‘নো ম্যান’ নীতি।
ফিনল্যান্ডের রুক্ষ সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছিলেন ক্রিস্টিনা। তাঁর কল্পনার মধ্যে স্থায়ী হয়ে রয়ে গিয়েছিল এমন এক পরিবেশ, যেখানে মহিলারা সমস্ত প্রত্যাশাকে দূরে সরিয়ে রেখে নিজেদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। দ্বীপটির নকশা ও পরিবেশ যেন সেই অনুভূতিকেই প্রতিফলিত করে। রয়েছে ব্যক্তিগত সুইমিং পুল, সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করার জন্য ক্রুজ়।
এই সীমিত সংখ্যক অতিথি রাখার বিষয়টি ইচ্ছাকৃত ভাবেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। কোনও বিলাসবহুল বিপণন কৌশল নয়, আসল উদ্দেশ্য ছিল অতিথিদের মধ্যে গোপনীয়তা বজায় রাখা, ব্যক্তিগত ভ্রমণ এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সংযোগের সুযোগ করে দেওয়া। একসময়ে এই দ্বীপে থাকার খরচ পড়ত ৫ থেকে ৬ হাজার ডলার। তবে এখন তা বেড়েছে।
খাবার তৈরি হত স্থানীয় মরসুমি ফল, সব্জি ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে। স্বাদের সঙ্গে কখনওই আপস করা হত না। তাজা সামুদ্রিক খাবার থেকে শুরু করে ভিগান খাবার এবং ভেষজ চা পর্যন্ত রয়েছে খাদ্যতালিকায়। খাবারের টেবিলে ধীর লয়ে চলত গল্প আর ভাগাভাগি করে সমস্ত খাবার খাওয়া। তাড়াহুড়োর কোনও স্থান নেই এই দ্বীপে।
সামগ্রিক জীবন এবং ব্যক্তিগত রূপান্তরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় অবকাশযাপন। অতিথিদের বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হত। সকালের যোগব্যায়াম এবং ধ্যান থেকে শুরু করে কায়াকে চড়ে ভ্রমণ। বনপথে হাঁটা বা ছোট্ট ট্রেকিংয়ের মতো অনুষ্ঠান। দ্বীপের কটেজ বা ভিলার নকশা এবং জীবনের দৈনন্দিন ছন্দ উভয়ের মধ্যেই নর্ডিক ঐতিহ্যের ছাপ সুস্পষ্ট ভাবে লক্ষ করা যায়।
ক্রিস্টিনার লক্ষ্য ছিল নারীদের জন্য নিজস্ব এক আস্তানা তৈরি করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, দ্রুত গতির এই পৃথিবীতে নারীরা প্রায়শই নিজেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ভুলে যাচ্ছেন। এই দ্বীপটি তাঁদের নিজেদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে।
চালু হওয়ার পর থেকে কয়েক হাজার মহিলার পা পড়েছে এই নির্জনভূমে। অপরিচিতেরা এসে নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতেন সতেজ ও পুনরুজ্জীবিত হওয়ার জন্য। বিশ্ব জুড়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করেছে এই দ্বীপ। প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, অভিনেত্রী, লেখক এবং শিক্ষাবিদেরা অখণ্ড অবসরযাপনের টানে ফিরে ফিরে আসতেন। দ্বীপে পা দিলেই পদবি এবং পেশার পরিচয় দ্রুত ম্লান হয়ে যায়।
২০২৩ সালে ১০ লক্ষ ইউরোরও বেশি দামে দ্বীপটির মালিকানাবদল হয়ে যায়। ‘নো ম্যান’স ল্যান্ডের মালিকানা বর্তমানে এক জন পুরুষের হাতেই রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। তিনি এই দ্বীপ নিয়ে ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেন সে সম্পর্কে বিশদ তথ্য জানা যায়নি।