Saudi Conspiracy in Iran Strike

ইরানে হামলার উস্কানি দিতে ট্রাম্পকে ঘন ঘন ফোন! খামেনেই হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত রিয়াধের রাজপুত্র?

ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর সৌদি আরবের যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমনকে নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করেছে মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে উস্কানি দেন রিয়াধের রাজপুত্র।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৬ ১৪:২৯
Share:
০১ ১৮

৮৬ বছরের আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের হত্যাকাণ্ডের জেরে বদলার আগুনে পুড়ছে ইরান। শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতার (সুপ্রিম লিডার) খুনের প্রতিশোধ নিতে খেপে উঠেছে তেহরান। শুধু তা-ই নয়, পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশে ইতিমধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে সাবেক পারস্যের আধা সেনা আইআরজিসি (ইসলামিক রেভেলিউশনারি গার্ড কোর)। এই আবহে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন। খামেনেইয়ের গোপন আস্তানার হদিস কী ভাবে পেল ইজ়রায়েল ও আমেরিকা?

০২ ১৮

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর এই ইস্যুতে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওয়াশিংটন পোস্ট। মার্কিন গণমাধ্যমটির দাবি, আলি খামেনেইকে খুন করতে বার বার আমেরিকাকে চাপ দিচ্ছিলেন সৌদি আরবের যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন (এমবিএস)। এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিক বার ফোনে কথাও বলেন তিনি। যদিও প্রকাশ্যে কূটনৈতিক পথে তেহরান সমস্যার সমাধান চেয়ে বহু বার বিবৃতি দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।

Advertisement
০৩ ১৮

গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান এমবিএস। রাজধানী ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যবাহী শ্বেতপ্রাসাদে (পড়ুন হোয়াইট হাউস) তাঁকে সাদরে আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প। ওই সময় সৌদি যুবরাজের সঙ্গে একান্তে বৈঠক করতে দেখা গিয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। সেখানেই নাকি ওঠে আলি খামেনেইয়ের প্রসঙ্গ। গোপনে ইরানি সর্বোচ্চ নেতা পরমাণু হাতিয়ার তৈরির মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে সন্দেহ ছিল রিয়াধের রাজপুত্রের। সে কথা ট্রাম্পের কানে তুলতে দেরি করেননি সলমন।

০৪ ১৮

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত ফোনালাপ বাড়িয়ে দেন এমবিএস। তত দিনে অবশ্য চক্রব্যূহে ইরানকে ঘিরতে শুরু করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। অন্য দিকে তেহরানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সুইৎজ়ারল্যান্ডর জেনেভায় চলছিল আলোচনা। তাতে সমাধানসূত্র বেরিয়ে এলে যে আমেরিকার সৈন্য যুদ্ধ না লড়েই দেশে ফিরবে, তা আঁচ করতে সৌদি যুবরাজের বেশি সময় লাগেনি। ফলে সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি তিনি।

০৫ ১৮

কিন্তু, কেন আলি খামেনেইকে হত্যার জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছিলেন যুবরাজ সলমন? প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্বে থাকা ইরানি ফৌজ পরমাণু শক্তি হাতে পাক, তা কখনওই চাননি সুন্নি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী এমবিএস। দ্বিতীয়ত, পর্দার আড়ালে থেকে ইয়েমেনের প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের ক্রমাগত মদত দিচ্ছিলেন খামেনেই। ফলে লোহিত সাগর এবং সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে তাণ্ডব চালাতে শুরু করে তারা।

০৬ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, হুথিদের বাড়বাড়ন্তে পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় দেশগুলির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যথেষ্ট প্রভাবিত হচ্ছিল। এতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল রিয়াধ। সৌদির বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ জুড়ে আছে খনিজ তেল। কিন্তু হুথি হামলার আশঙ্কা থাকায় লোহিত সাগর বা উপসাগরীয় এলাকায় তরল সোনার পরিবহণ যুবরাজ সলমনের কাছে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। আলি খামেনেই সরলে সেই ছবি অনেকটাই বদলাবে বলে মনে করেছেন তিনি।

০৭ ১৮

এ বছরের জানুয়ারিতে অবশ্য ইরান নিয়ে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন রিয়াধের রাজপুত্র। এমবিএসের কথায়, ‘‘তেহরান আক্রমণের জন্য কখনওই সৌদির আকাশপথ ব্যবহার করতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র।’’ তখনও সাবেক পারস্যের কূটনীতিকদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনা চলছিল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, তখন থেকেই কি শিয়া মুলুকটিতে যৌথ হামলার ব্যাপারে একরকম নিশ্চিত ছিলেন যুবরাজ সলমন? নইলে আগ বাড়িয়ে কেন সামরিক অভিযানের কথা বলতে গেলেন তিনি?

০৮ ১৮

খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ইজ়রায়েলকে নিশানা করে আইআরজিসি। এর তীব্র নিন্দা করে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে রিয়াধের বিদেশ মন্ত্রক। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে ‘নির্লজ্জ’ এবং ‘কাপুরুষোচিত’ বলে উল্লেখ করেছে তারা। একটি বিবৃতিতে সৌদি প্রশাসন বলেছে, ‘‘এই আক্রমণের জন্য কোনও অজুহাতই যথেষ্ট নয়। কারণ, তেহরানের সার্বভৌমত্বকে আমরা সব সময় সম্মান করেছি। আমাদের আকাশসীমা ব্যবহার করে কোনও হামলা হয়নি জানা সত্ত্বেও এটা করেছে তারা।’’

০৯ ১৮

অন্য দিকে আরব নিউজ় জানিয়েছে, ইরানি আক্রমণের পর আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জ়ায়েদ আল-নাহিয়ান, বাহরাইনের রাজা হামাদ বিন ইশা আল-খলিফা, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি, কুয়েতের আমির শেখ মিশাল আল-আহমেদ আল-জাবের আল-সাবাহ এবং জর্ডনের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লার সঙ্গে কথা বলেন যুবরাজ সলমন। তবে তেহরানের বিরুদ্ধে রিয়াধ কোনও যৌথ হামলার পরিকল্পনা করছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

১০ ১৮

সৌদির বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, বর্তমানের সঙ্কট পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলিকে সুসংহত রাখতে ওই সমস্ত রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে কথা বলেন যুবরাজ সলমন। তবে ইরান নৃশংস হামলা চালিয়ে গেলে রিয়াধ সমস্ত শক্তি কাজে লাগিয়ে তার জবাব দেবে। সেটা যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, সেই হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে ওই আরব রাষ্ট্র।

১১ ১৮

যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলি খামেনেইয়ের ঠিকানা লক্ষ্য করে ৩০টি বোমা ফেলে ইজ়রায়েলি লড়াকু জেট। হামলার সময় রাজধানী তেহরানেই ছিলেন তিনি। তাঁর গুপ্ত ঘাঁটি চিহ্নিত হওয়ার পর যুদ্ধবিমান নিয়ে সে দিকে উড়ে যান ইহুদি যোদ্ধা পাইলটেরা। খামেনেইয়ের গোপন আস্তানার সঠিক অবস্থান খুঁজে পেতে তেল আভিভ এবং ওয়াশিংটনের গোয়েন্দারা একসঙ্গে কাজ করেছেন বলে জানা গিয়েছে। পরে সেইমতো ঠিক হয় আক্রমণের নীলনকশা।

১২ ১৮

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনটি ঠিকানায় যে সেনাকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে খামেনেই বৈঠক করবেন, সেই খবর আগেই পেয়েছিল ইজ়রায়েল। আর তাই হামলার আগে ওই জায়গাগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তার মধ্যে কোনটিতে খামেনেই রয়েছেন, সেটাও খুব নিখুঁত ভাবে চিহ্নিত করা হয়। তার পরই সেখানে বোমাবর্ষণ শুরু করে তেল আভিভের বিমানবাহিনী। ফলে বাঁচার কোনও সুযোগই পাননি শিয়া ধর্মগুরু তথা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।

১৩ ১৮

মার্কিন প্রশাসনের এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি জায়গায় আক্রমণের ছক কষছিল তেহরান। গোয়েন্দাসূত্রে সেই খবর আগেই পেয়ে যায় ওয়াশিংটন। ফলে ইরান হামলার নির্দেশ দিতে দেরি করেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে চালানো সেই অভিযানে খামেনেই প্রশাসনের বেশ কয়েকটি দফতর গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমেরিকা। ধ্বংস হয়েছে শিয়া ফৌজের একাধিক সেনাঘাঁটিও। খামেনেই ছাড়াও নিহতের তালিকায় নাম আছে তাঁর মেয়ে ও নাতনি, ইরানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসেরজাদা এবং কমান্ডার ইন চিফ মহম্মদ পাকপোরের।

১৪ ১৮

সর্বোচ্চ নেতার (সুপ্রিম লিডার) মৃত্যুর পর দেশের সংবিধান মেনে তিন সদস্যের একটি কাউন্সিল তৈরি করেছে তেহরান। অস্থায়ী ভাবে এই কমিটিই দেশ চালাবে বলে জানা গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলে রয়েছে খামেনেই-ঘনিষ্ঠ বছর ৬৭-র আলিরেজা আরাফি। বাকি দুই সদস্য হলেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান এবং প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেন মোহসেনি।

১৫ ১৮

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর রাজশাহির অবসান ঘটে ইরানে। সেই জায়গায় ‘ইসলামীয় প্রজতন্ত্র’ গ্রহণ করে তেহরান। এর মাথায় থাকবেন একজন শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা। খামেনেই বা তাঁর পূর্বসূরি রুহুল্লাহ খোমেইনি ছিলেন সেই পদে। নবগঠিত কাউন্সিলে একমাত্র ধর্মীয় নেতা হলেন আরাফি। ফলে আগামী দিনে তাঁর খামেনেইয়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

১৬ ১৮

বর্তমানে ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’-এর ডেপুটি চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন আলিরেজা আরাফি। বস্তুত এই কমিটিই সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়োগ করে থাকে। অতীতে সাবেক পারস্য দেশের প্রভাবশালী ‘গার্ডিয়ান কমিটি’রও সদস্য ছিলেন আরাফি। তেহরানের নির্বাচনে প্রার্থীদের বাছাই প্রক্রিয়া এবং সে দেশের পার্লামেন্টে পাশ হওয়া কোনও আইন পর্যালোচনার দায়িত্ব রয়েছে ওই কমিটির উপর।

১৭ ১৮

ইরানের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রধানের দায়িত্বও পালন করেছেন আরাফি। তবে সাবেক পারস্যের ঘরোয়া রাজনীতিতে তাঁকে নিয়ে যে খুব বেশি আলোচনা হয়েছে এমনটা নয়। শিয়া ফৌজ বা আইআরজিসির কমান্ডারদের সঙ্গেও তাঁর তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই। সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে এগুলি তাঁর জন্য বাধা হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।

১৮ ১৮

আরাফি সর্বোচ্চ নেতা হোন বা না হোন, খামেনেই হত্যার প্রতিশোধ যে ইরান নিতে চায় তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিশ্লেষকদের দাবি, গোটা ঘটনার নেপথ্যে সৌদির ষড়যন্ত্রের হাত থাকলে রিয়াধকে সহজে ছেড়ে দেবে না তেহরান। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে ইজ়রায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সামলে তাদের পক্ষে আরব রাষ্ট্রটিকে মুহুর্মুহু নিশানা করা বেশ কঠিন।

সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement