Solar waste problem

শ্যাম রাখি না কুল! সৌরবিদ্যুতে ভর করে চিনকে টেক্কা দিতে গিয়ে পাঁচ বছরে ৬ লক্ষ টন ‘পরিবেশবান্ধব’ জঞ্জালে ভরবে দেশ?

সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুতের বিকল্প জ্বালানি তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ভারত।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:০৩
Share:
০১ ১৭

বিকল্প বিদ্যুৎ তৈরিতে ভারতকে অনেকটাই এগিয়ে দিতে পেরেছে সৌরবিদ্যুৎ। এক দশকের মধ্যেই ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সৌরশক্তি উৎপাদনকারী দেশের খেতাব অর্জন করতে পেরেছে। উষ্ণায়ন ও পরিবেশের উপরে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বহু দিন ধরেই বিশ্ব জুড়ে খোঁজ চলছে চিরাচরিত জ্বালানির বিকল্পের। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়।

০২ ১৭

জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প রূপে মানুষকে পরিস্রুত জ্বালানির উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছিল। সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুতের বিকল্প জ্বালানি তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছে ভারতও। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কেন্দ্র।

Advertisement
০৩ ১৭

সৌরশক্তি একসময় ব্যয়সাপেক্ষ হলেও গত কয়েক বছরে প্রযুক্তির উন্নতি এবং বিভিন্ন দেশে চাহিদার কারণে সোলার ফোটোভোল্টাইক সেলের দাম আশি থেকে নব্বই শতাংশ কমে যায়। এই মূল্যহ্রাসের পরে দেরিতে হলেও ভারত সৌরশক্তির বিপ্লবে যোগ দিয়েছিল।

০৪ ১৭

দূষণহীন বিদ্যুৎ উৎপাদনে কেন্দ্রীয় সরকারের তুরুপের তাস হয়ে উঠছে সৌরশক্তি। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উপাদানের প্রয়োজন হয় তার নাম সৌরপ্যানেল। প্রথম দিকে ভারতের সৌরপ্যানেল এবং সোলার সেলের বাজার দখল করে রেখেছিল চিন। সম্প্রতি ভারতের একটি চালে ভারতের বাজারে সৌরপ্যানেল বিক্রিতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে ড্রাগনভূমিকে।

০৫ ১৭

গত দু’-তিন বছর ধরে উৎপাদনভিত্তিক উৎসাহ ভাতা বা পিএলআই প্রকল্পকে সামনে রেখে দেশের মাটিতেই সৌরবিদ্যুতের প্রধান উপাদানগুলির উৎপাদন বাড়াতে শুরু করে নয়াদিল্লি। শুধু তা-ই নয়, সৌরপ্যানেল বা সোলার সেলের কাঁচামালও অভ্যন্তরীণ ভাবে তৈরির উপর জোর দিয়েছে নয়াদিল্লি।

০৬ ১৭

সৌরশক্তির ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দেশীয় শিল্প সংস্থাগুলিকে বিশেষ ভর্তুকি দিচ্ছে মোদী সরকার। মোদী সরকারের এই সাহায্য ঠিকমতো কাজ করলে এ ব্যাপারে আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে পারে দেশীয় সংস্থাগুলি। বিদেশি নির্ভরশীলতা না থাকায় দ্রুত গতিতে সৌরশক্তি উৎপাদন করতে পারবে ভারত। তাই এগুলি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত দেশীয় সংস্থাগুলিকে নানা ভাবে উৎসাহ ভাতা দিচ্ছে মোদী সরকার।

০৭ ১৭

দেশের বিভিন্ন শহরের সরকারি কার্যালয়, উদ্যান, এমনকি গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি সৌরপ্যানেল বসিয়ে অবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করার চেষ্টা করছে সরকার। সরকারি তথ্য অনুসারে, প্রায় ২৪ লক্ষ পরিবার ভর্তুকি প্রকল্পের আওতায় তাদের বাড়ি সৌরবিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করেছে। বর্তমানে ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ২০ শতাংশ অবদান রয়েছে এই অপ্রচলিত শক্তিটির।

০৮ ১৭

জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা দূর করলেও সৌর আলোর নীচেই অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করে দিয়েছে। অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে গিয়ে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশের বিপর্যয় আসতে পারে। সঠিক ভাবে পরিচালিত না হলে সৌরপ্যানেল পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এমন আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে ভারতে।

০৯ ১৭

কী বলছেন পরিবেশবিদেরা? অপ্রচলিত শক্তির বর্জ্য নিয়ে আশঙ্কার কথাই শুনিয়েছেন তাঁরা। আন্তর্জাতিক পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি সংস্থার তথ্য বলছে, ভারত বর্তমানে প্রায় ১,০০,০০০ টন সৌরবর্জ্য উৎপাদন করে। আগামী চার বছরের মধ্যে (২০৩০ সাল নাগাদ) এই সংখ্যা ৬,০০,০০০ টনে পৌঁছোতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য সৌরক্ষমতা যত প্রসারিত হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জও পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাবে।

১০ ১৭

একটি সাধারণ সৌরপ্যানেলের আয়ু ২৫ থেকে ৩০ বছর। এর পর এর কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। শেষে এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এবং বর্জ্য পদার্থে পরিণত হয়। পরিবেশবিজ্ঞানীদের সতর্কীকরণ, এটি সাধারণ কোনও বর্জ্য নয়। এর ব্যবস্থাপনা করা অন্যান্য বৈদ্যুতিন বর্জ্যের মতোই জটিল। যদিও ভারতের সৌরবর্জ্য নিয়ে কেন্দ্রের হাতে আপাতত কোনও তথ্য নেই।

১১ ১৭

সৌরপ্যানেলগুলির সৌরকোষের মূল উপাদান হল সিলিকন। এ ছাড়াও কাচ, পলিমার, অ্যালুমিনিয়ামের মতো ধাতু এবং কিছু ক্ষেত্রে সিসা বা ক্যাডমিয়ামের মতো বিপজ্জনক পদার্থের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি। অসাবধানতার সঙ্গে এগুলিকে নষ্ট করলে তা পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ হতে পারে। কারণ সৌরপ্যানেলকে পুনর্ব্যবহার করা সহজ নয়।

১২ ১৭

একটি নতুন গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে যে, ভারতে ২০৪৭ সালের মধ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ টনেরও বেশি সৌরবর্জ্য উৎপাদিত হতে পারে। সেই বর্জ্য পরিচালনার জন্য প্রায় ৩০০টি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটের প্রয়োজন পড়বে। সেগুলি শুধুমাত্র সৌরবর্জ্যই পরিচালনা করবে। আগামী দু’দশকে এই ধরনের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে গেলে ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে।

১৩ ১৭

সৌরপ্যানেলের পুনর্ব্যবহার নিয়ে সে ভাবে কোনও নিবিড় গবেষণা হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে সরকারও বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি সৌরপ্যানেল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিও পুনর্ব্যবহারের কোনও রাস্তা বার করতে পারেনি।

১৪ ১৭

পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উপর জোর দিতে গিয়ে নতুন বর্জ্য সঙ্কটের দিকে ঝুঁকছে ভারত। পরিবেশগত সেই ঝুঁকি আত্মনির্ভর ভারত হওয়ার লক্ষ্যগুলিকে দুর্বল করে দিতে পারে। এটি কোনও কাল্পনিক আশঙ্কা নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান ইতিমধ্যেই এই সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে। তারা কয়েক দশক আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। বর্জ্য যে তৈরি হয়, ভারত এখনও তা স্বীকার করারই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

১৫ ১৭

বিশ্বব্যাপী পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে। যদিও সেই রূপরেখা নিখুঁত নয়। অন্য দিকে সৌরপ্যানেলগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি করতে যথেষ্ট টেকসই ভাবে নকশা করা হয়েছে। ফলে দক্ষ ভাবে এগুলিকে নষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও একটি প্যানেলের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত উপকরণ পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের একাংশের। পরিকাঠামো তৈরির বিপুল খরচ এই ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি কার্যকর অর্থনৈতিক মডেল ছাড়া কোনও বিনিয়োগকারীই উৎসাহী হবেন না।

১৬ ১৭

বর্তমানে ভারতে সৌরপ্যানেল পুনর্ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই। ২০২২ সালে ভারত সৌরপ্যানেলগুলিকে ই-বর্জ্য নিয়মের আওতায় এনেছে, যাতে বলা হয়েছে সৌরপ্যানেলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ভেঙে ফেলা এবং পুনর্ব্যবহার করার সমস্ত দায়িত্বই পড়বে উৎপাদনকারী সংস্থার ঘাড়েই।

১৭ ১৭

ই-বর্জ্য আইন পরিবেশ রক্ষায় কিছুটা সুরক্ষাকবচ দিলেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে সৌরবর্জ্যের জন্য একটি পৃথক কাঠামো প্রয়োজন। এই পরিকাঠামো তৈরি করতে না পারলে আয়ু ফুরোনো প্যানেলগুলির জঞ্জালের স্তূপে ঠাঁই হতে পারে অথবা অনিয়ন্ত্রিত ভাবে স্ক্র্যাপ বাজারে বিক্রি হতে পারে। অদক্ষ হাতে প্যানেলগুলি ভাঙার পর তা থেকে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়বে সিলিকন বর্জ্য। আপাতদৃষ্টিতে সৌরশক্তিকে দূষণমুক্ত শক্তির উৎস হিসাবে ধরে নিলেও, তা পরোক্ষ ভাবে পরিবেশের জন্য চিন্তা বাড়িয়ে তুলবে বলে আশঙ্কা পরিবেশবিদদের।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement