মার্কিন মুদ্রা ডলারের গদি টলমল! আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আমেরিকার টাকার উপর আর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না বিশ্বের বহু রাষ্ট্র। আর তাই নিজস্ব মুদ্রায় আমদানি-রফতানি শুরু করেছে তারা। সেই তালিকায় আছে ভারতেরও নাম। ফলে দিন দিন দুর্বল হচ্ছে ডলার। এ-হেন পরিস্থিতিতে আফ্রিকার উলটপুরাণ। সেখান থেকে অক্সিজ়েন পেয়ে নতুন করে চাঙ্গা হচ্ছে ডলার। একে ‘ডলারাইজ়েশন ২.০’ আখ্যা দিচ্ছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
অর্থনীতির নিরিখে আফ্রিকার শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম হল নাইজেরিয়া ও রিপাবলিক অফ সাউথ আফ্রিকা। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে স্টেবলকয়েনের সবচেয়ে বড় গ্রাহক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে এই দুই রাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও ওই ডিজিটাল মুদ্রাটির ব্যাপক ব্যবহার চালাচ্ছে তারা। এই পরিস্থিতি যে মার্কিন মুদ্রাটির দর বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। এর জেরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ডলারের চাহিদা।
এখন প্রশ্ন হল, কী এই স্টেবলকয়েন? এটি প্রকৃতপক্ষে একধরনের ক্রিপ্টো মুদ্রা। কেউ কেউ অবশ্য স্টেবলকয়েনকে ডিজিটাল টোকেন বলে থাকেন। নির্দিষ্ট একটি মূল্য বজায় রেখে একে বাজারে আনা হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, স্টেবলকয়েনের মূল্য পুরোপুরি ভাবে ডলারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ লেনদেনের ক্ষেত্রে যত বেশি স্টেবলকয়েন ব্যবহার হবে, ততই আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী হয়ে উঠবে ডলার।
একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাজারে থাকা স্টেবলকয়েনের মূল্য ৩০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের কথায়, ক্রিপ্টো মুদ্রার মেরুদণ্ডে পরিণত হচ্ছে ওই ডিজিটাল টোকেন। আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য নাইজেরিয়া ও সাউথ আফ্রিকার সংশ্লিষ্ট মুদ্রাটি গ্রহণের নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। আফ্রিকার ওই দুই দেশের জন্য স্থানীয় টাকায় আমদানি ও রফতানি একেবারেই লাভজনক নয়।
বর্তমানে সাউথ আফ্রিকার ৮০ শতাংশ বাসিন্দার কাছে রয়েছে স্টেবলকয়েন। দেশটির তিন-চতুর্থাংশের বেশি আমজনতা ক্রিপ্টো মুদ্রার ভান্ডার বৃদ্ধির পক্ষপাতী। নাইজেরিয়ায় আবার ঘরোয়া বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার ক্ষেত্রেও সেখানকার বাসিন্দারা স্টেবলকয়েনের ব্যবহার শুরু করে দিয়েছেন। কারণ, দেশটির ৯৫ শতাংশ ব্যবসায়ী ক্রিপ্টো মুদ্রায় দাম নিতে বেশি পছন্দ করেন।
নাইজেরিয়ার স্থানীয় মুদ্রার নাম নাইরা। গত কয়েক বছর ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমেছে এর দর। বর্তমানে ডলারের নিরিখে মুদ্রাটির দাম ১,৩৪৩ নাইরায় ঘোরাফেরা করছে। আগামী দিনে এই সূচক আরও নিম্নমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণে স্টেবল মুদ্রাকেই বেশি ভরসা করা শুরু করেছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। ফলে পরোক্ষ ভাবে শক্তিশালী হচ্ছে আমেরিকার মুদ্রা।
পশ্চিম গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে স্টেবল মুদ্রায় বেতন দেওয়া শুরু করেছে নাইজেরিয়ার একাধিক বেসরকারি সংস্থা। চেষ্টা করেও বিষয়টিকে আটকাতে পারেনি আফ্রিকান রাষ্ট্রটির সরকার তথা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ক্রিপ্টো মুদ্রার লেনদেন হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ফুলেফেঁপে লাল হচ্ছে এক্সচেঞ্জ। এ ছাড়া পেমেন্ট ব্যাঙ্কের মুনাফাতেও রকেট গতিতে উত্থান দেখা গিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন সাউথ আফ্রিকান রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর লেসেতজ়া কাগানিয়াগো। তাঁর কথায়, ‘‘ডলারের নিরিখে স্থানীয় মুদ্রা শক্তিশালী না হলে এই সমস্যা থাকবেই। তা ছাড়া স্টেবল মুদ্রাকে আটকানোর কোনও রাস্তা নেই। তবে অর্থনীতি পুরোপুরি স্টেবল মুদ্রা নির্ভর হয়ে পড়া বিপজ্জনক।’’ তখন ঘরোয়া বিষয়কে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পেয়ে যাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
নাইজেরিয়া ও সাউথ আফ্রিকাকে বাদ দিলে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে বিশ্বের বেশ কয়েকটা দেশে স্টেবল মুদ্রার দাপাদাপি বেড়েছে। এর মধ্যে মোজ়াম্বিক, রোয়ান্ডা ও তানজ়ানিয়ার কথা বলা যেতে পারে। অন্য দিকে ক্রিপ্টো মুদ্রার ব্যবসা বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই দায়িত্ব ইসলামাবাদের সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে দিয়েছেন তিনি। ফলে আগামী দিনে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর স্টেবল মুদ্রার আওতায় যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-’৪৫) পর আন্তর্জাতিক বাজারে আধিপত্য তৈরি করে ডলার। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে মার্কিন মুদ্রাটিকে বিশ্ব বাণিজ্যের মাধ্যম হিসাবে মেনে নেয় পৃথিবীর সব দেশ। ওই সময় ডলারের দামকে সোনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে অবশ্য সেই ব্যবস্থার বদল আনে ওয়াশিংটন। অপরিশোধিত খনিজ তেলের দরের সঙ্গে একে সম্পৃক্ত করে আমেরিকা। ফলে পেট্রো-ডলার হিসাবে নতুন পরিচিতি পায় ওই মুদ্রা।
বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বের আর্থিক অবস্থা ঠিক রাখতে জন্ম হয় দু’টি প্রতিষ্ঠানের। সেগুলি হল আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার ও বিশ্ব ব্যাঙ্ক। এর মধ্যে প্রথম সংস্থাটি পরবর্তী দশকগুলিতে মোট পাঁচটি মুদ্রাকে বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বেছে নেয়। সেই তালিকায় ডলারের পাশাপাশি রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ইউরো, চিনের রেনমিনবি, জাপানি ইয়েন এবং ব্রিটেনের পাউন্ড-স্টার্লিং। কিন্তু তার পরেও আমেরিকার মুদ্রাটির চাহিদা একেবারেই কমেনি।
১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের পর প্রায় টানা ৮০ বছর বিশ্ব জুড়ে আধিপত্য বজায় রাখে ডলার। কিন্তু ২১ শতক আসতে আসতে ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হতে থাকে এর সূচক। ২০২৩ সালে দেউলিয়া হয়ে যায় আমেরিকার ষোড়শ বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিলিকন ভ্যালি ব্যাঙ্ক। তার পরই ডলারমুক্ত পৃথিবীর দিকে ঝুঁকতে শুরু করে বিশ্ব। তাতে হাওয়া দিতে দেরি করেনি রাশিয়া, চিন বা ইরানের মতো কট্টর যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী দেশগুলি।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলিতে ডলারের শেয়ার ছিল ৭১ শতাংশ। ২০২৩ সালে সেটা কমে ৫৯ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী দু’বছরে আরও কিছুটা কমেছে এর পরিমাণ। ডলারের আধিপত্যে চিড় ধরতেই সেই জায়গার দখল নিতে শুরু করে চিনা মুদ্রা ‘রেনমিনবি’, যার একককে গোটা দুনিয়া চেনে ইউয়ান নামে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের লেনদেনের একটা বড় অংশ দখল করেছে তারা।
২০২৪ সালে ডলারের বিকল্প হিসাবে ‘ব্রিকস’ মুদ্রা বাজারে আনার প্রস্তাব দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এটি প্রকৃতপক্ষে একটি ১০ দেশের সংগঠন, যাতে মস্কো ছাড়াও রয়েছে ব্রাজ়িল, ভারত, চিন ও সাউথ আফ্রিকা। আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির একটা বড় অংশ রয়েছে ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলির দখল। ফলে তারা একটি আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে বাজারে আনলে ওয়াশিংটনের যে ঘুম উড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
স্টেবল মুদ্রার হাত ধরে ডলারের শক্তিশালী হওয়ার ক্ষেত্রে আরও কয়েকটা বাধা রয়েছে। সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাকে একরকম দু’চক্ষে দেখতে পারেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রকাশ্যে তাঁকে ‘অপমান’ করতেও ছাড়েননি তিনি। এই পরিস্থিতিতে পাল্টা চাপ বাড়াতে চিনা ইউয়ানকে প্রোটিয়ারা আপন করে নিলে, ডলারের শক্তি যে হ্রাস হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গ্রাহক সংখ্যার নিরিখে ক্রিপ্টো মুদ্রা সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও এগিয়ে আছে ভারত। সূত্রের খবর, শুধুমাত্র বিটকয়েনে লগ্নি করেছেন এ দেশের প্রায় ৯.৩ কোটি বাসিন্দা। যদিও সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো মুদ্রাটির মূল্যের নিরিখে প্রথম স্থান রয়েছে আমেরিকারই দখলে। অর্থাৎ, বিটকয়েনে ৯.৩ কোটি ভারতীয়ের লগ্নির অঙ্ক যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার অর্ধেক গ্রাহকে বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ করে রেখেছে ওয়াশিংটন।
গত বছরের ডিসেম্বরে ডলারের নিরিখে ৯০-এর গণ্ডি পেরিয়ে যায় ভারতীয় টাকা। শেষ দু’মাসে সেখান থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি নয়াদিল্লির রুপি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৪.৩ শতাংশ। ফলে এশিয়ার ‘সর্বাধিক খারাপ পারফরম্যান্স’-এর তকমা জোটে কপালে। তার পরেও অবশ্য এ দেশের ঘরোয়া বাজারে স্টেবল মুদ্রায় লেনদেন শুরু হওয়ার আশঙ্কা নেই বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
আর্থিক শক্তির নিরিখে দুনিয়ায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত। খুব দ্রুত সেখান থেকে এর তৃতীয় স্থানে উঠে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এ দেশের রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের হাতে আছে শক্তিশালী একটি বিদেশি মুদ্রা ও সোনার ভান্ডার। এর জোরে আগামী দিনে আরও কিছু দেশের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনে জোর দিতে পারে নয়াদিল্লি।