গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনার পারদ আপাতত স্তিমিত হলেও জট কাটেনি এর মালিকানা নিয়ে। গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের দাবি থেকে সরেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপের প্রশাসকেরা অবশ্য খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছেন তাঁরা ডেনমার্কের সঙ্গেই থাকতে চান। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডরিক নেলসন জানিয়েছেন আমেরিকা নয়, কোপেনহেগেনের অভিভাবকত্বকেই মেনে নিয়ে স্বায়ত্তশাসন চালাতে চায় দ্বীপরাষ্ট্রটি।
মাত্র ৫৫ হাজার অধিবাসী নিয়ে গঠিত এ-হেন ক্ষুদ্র দ্বীপের ‘ঔদ্ধত্যে’ হাড়ে হাড়ে চটেছেন ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্তের জেরে যে ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়তে হতে পারে, গ্রিনল্যান্ডকে তা-ও পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মেরু অঞ্চলের সুরক্ষার জিগির তুলে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বার বার শোনা গিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে।
সবুজ দ্বীপের মালিকানা নিয়ে ডেনমার্ক ও আমেরিকার দড়ি টানাটানির খেলায় কাঁটা হয়ে রয়েছে আরও একটি ডেনিশ ভূখণ্ড। সেটি গ্রিনল্যান্ডের মতোই কোপেনহেগেনের মালিকানায় থাকা ক্ষুদ্র দ্বীপ ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ। মেরু অঞ্চলের দ্বারপ্রান্তে থাকা আইসল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথের মাঝখানে অবস্থিত এই ছোট্ট দ্বীপটি।
ডেনমার্কের অংশ হলেও ফ্যারো স্বশাসিত। ১৮টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ফ্যারো দুর্গম অথচ সুন্দর। উত্তর মেরু থেকে আসা কনকনে ঠান্ডা ঝোড়ো বাতাস ১২ মাসই বয়ে যায় এই দ্বীপপুঞ্জের উপর দিয়ে। মেরেকেটে ৫৫ হাজার লোকের বাস এই দ্বীপে। কিন্তু দ্বীপটির জটিল অবস্থানই তাঁদের শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমেরিকার আগ্রাসনের আবহে ডেনমার্কের মালিকানাধীন এই দ্বীপটির অধিবাসীরা উদ্বেগে ভুগছেন।
আইসল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথের মাঝখানে অবস্থিত দ্বীপটি। এর পূর্ব প্রান্তে রয়েছে নরওয়ে ও সুইডেন। দক্ষিণে ব্রিটেন। উত্তরে আইসল্যান্ড। এই অঞ্চল জুড়ে পরাশক্তিগুলি আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। এই জলসীমায় ইউরোপীয় মাছধরা ট্রলার থেকে শুরু করে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং রুশ ডুবোজাহাজের আনাগোনা লেগেই থাকে।
ফ্যারো দ্বীপবাসীরাই দ্বীপের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে সামরিক, প্রতিরক্ষা, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, মুদ্রা এবং বৈদেশিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলি ডেনমার্কের দায়িত্ব। ফ্যারোর এলাকাগুলি ডেনমার্কের শুল্ক এলাকার মধ্যে পড়ে না। দ্বীপে প্রশাসনের নিজস্ব বাণিজ্যনীতি রয়েছে। অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাধীন ভাবে বাণিজ্যিক চুক্তিস্থাপন করতে পারে দ্বীপটি। নর্ডিক কাউন্সিলে ডেনিশ প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের প্রতিনিধিত্ব স্বীকার করা হয়।
গ্রিনল্যান্ডের মতো এই দ্বীপের বাসিন্দারা অর্থনৈতিক ভাবে ডেনমার্কের ভর্তুকির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেননি কোনও দিন। ডেনমার্ক থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে তুলেছেন ফ্যারোর অধিবাসীরা। মৎস্যশিল্প তাঁদের আয়ের মূল উৎস। ৯০ শতাংশই রফতানি করেন তাঁরা। তাঁদের নিজস্ব মুদ্রাও চালু আছে যা ডেনিশ মুদ্রার সঙ্গে সংযুক্ত।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চোক পয়েন্টগুলির মধ্যে একটির মাঝখানে অবস্থিত এই ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ। আর্কটিক এবং আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে চলাচলকারী রুশ জাহাজগুলির প্রধান পথগুলির মধ্যে একটি। ‘চোক পয়েন্ট’ হল সমুদ্রের মধ্যে জাহাজ চলাচলের প্রাকৃতিক বা মানুষের তৈরি সরু রাস্তা। উদাহরণ হিসাবে মলাক্কা প্রণালী বা হরমুজ় প্রণালীর কথা বলা যেতে পারে। আবার সুয়েজ় বা পানামা খালকেও বিশ্লেষকেরা ‘চোক পয়েন্ট’ বলেন। দুই সমুদ্রকে যুক্ত করার কাজ করে থাকে এই খাল বা ‘চোক পয়েন্ট’।
এই জলপথটিকে জিআইইউকে গ্যাপ (তিনটি স্থলভাগের মধ্যে দু’টি উন্মুক্ত সমুদ্র) বলা হয়। এর নামকরণ করা হয়েছে এর আশপাশের ভূখণ্ড থেকে। সেগুলি হল গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং ইউনাইটেড কিংডম বা ইউকে। এর সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ স্থানটি ৩২১ কিমি প্রশস্ত। এই চোক পয়েন্টটিকে টহলদারির কাজে ব্যবহার করে ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা’ বা নেটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন)।
ইউরোপীয় দেশগুলিতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গত বছর সেখানে জলপথে পাহারা জোরদার করেছে নেটো। ফলে ঘন ঘন নেটোর টহলদার নৌযানগুলি ঘোরাফেরা করছে ফ্যারো নিকটবর্তী সমুদ্রপথে। এ ছাড়াও ক্রেমলিন এবং তাদের পারমাণবিক ডুবোজাহাজগুলিও চলাচলের রাস্তা হিসাবে ব্যবহার করে জিআইইউকে গ্যাপকে। সেই সাবমেরিনগুলি সাধারণত উত্তর মেরুতে রাশিয়ার প্রধান ডুবোজাহাজ ঘাঁটি মুরমানস্ক থেকে আসে।
২০১৯ সালে চিন তার অন্যতম বৃহৎ টেলিকম সংস্থার জন্য একটি বিশেষ চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী পারস্পরিক বাণিজ্যবৃদ্ধির বিনিময়ে ফ্যারোর নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণের দায়িত্ব নেয় বেজিং। আমেরিকার সরকার চিনের এই সংস্থাটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে চিহ্নিত করেছে। তার পর থেকেই ফ্যারোর রাজনীতিবিদদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে ওয়াশিংটন। সংস্থাটিকে ফ্যারোয় পা রাখতে না দেওয়ার জন্য হুমকির মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত অন্য একটি ইউরোপীয় সংস্থাকে বরাত হস্তান্তর করে ফ্যারো স্বায়ত্তশাসকেরা।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পর বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশ রুশ জাহাজ এড়িয়ে চলেছিল। এর ব্যতিক্রম ছিল ফ্যারোর দ্বীপগুলি। রাশিয়ার মাছধরা ট্রলারগুলি বছরের পর বছর ধরে এখানে নোঙর করে আসছে। সেই ধারা এখনও বজায় রেখেছে তারা। ফ্যারোর বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুসারে, গত কয়েক বছরে অন্যান্য নেটো-ভুক্ত দেশগুলির ডুবোজাহাজ এবং জাহাজ ফ্যারোর বন্দরে আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দ্বীপের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের আশঙ্কা, রাশিয়া নজরদারি চালানোর জন্য, এমনকি নাশকতার পরিকল্পনা করার জন্যও ট্রলারগুলি ব্যবহার করছে।
ডেনমার্কের পার্লামেন্টে ফ্যারোর প্রতিনিধি সজুরদুর স্কালে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, রুশ জাহাজগুলি ঠিক কী উদ্দেশ্যে ঘোরাফেরা করছে সে নিয়ে সম্যক ধারণা নেই তাঁদের। এমনকি তাঁরা জানেনও না এই জাহাজে কী রয়েছে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের কয়েক মাস পর মস্কো ঘোষণা করে যে, প্রয়োজনে তারা অসামরিক জাহাজগুলিকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে।
বর্তমানে ফ্যারোর নিরাপত্তার ভার ন্যস্ত রয়েছে নেটোর কাঁধেই। ডেনমার্ক এই জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। স্কায়েল জানিয়েছেন, নেটোর ছাতার নীচে না থাকলে কবেই রুশ সেনা দখল করে নিত ফ্যারোকে বলে মনে করছেন সে দেশের অনেক বাসিন্দাই।
নাগরিকত্ব ডেনমার্কের হলেও নিজেদের ফ্যারোইজ় বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন ফ্যারোর বাসিন্দারা। ২০০০ সালে ফ্যারোর নাগরিকেরা পূর্ণ সার্বভৌমত্বের জন্য আলোচনা করে ডেনিশ প্রশাসনের কাছে। সেই প্রস্তাবে কোপেনহেগেন ভর্তুকি প্রত্যাহারের হুমকি দেয়। সেই সময় দ্বীপপুঞ্জের অর্থনীতি ততটা শক্তিশালী ছিল না। ফলে স্বাধীনতার দাবি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হন ফ্যারোর অধিবাসীরা।
বছরের শুরুতে পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরু করার এবং স্বায়ত্তশাসনের বেশ কিছু অধিকার বৃদ্ধির জন্য চাপ দেওয়ার কথা ছিল ফ্যারোর। সেই আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে জটিলতা শুরু হওয়ায় এই প্রসঙ্গ ধামাচাপা পড়ে যায়। ট্রাম্পের হুমকি নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয় নেটোর অন্দরেই।
এই অবস্থায় ফ্যারোর প্রশাসকদের সিদ্ধান্ত ছিল ৬০০ বছরের পুরনো ‘অভিভাবক’ ডেনমার্কের সঙ্গে দরাদরি করার উপযুক্ত সময় এখন নয়। তবে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর শঙ্কিত ফ্যারোর রাজনৈতিক নেতারাও। পার্লামেন্টের ডেনমার্কপন্থী দলের সদস্য আইডিস হার্টম্যান নিক্লসেনের মতে অবস্থানগত কারণের জন্য ফ্যারোর আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। উত্তর আটলান্টিকের বুকে এক অপ্রত্যাশিত অবস্থানে থাকার কারণে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে।