২০২২ সালে হৃষীকেশের কাছে একটি হোটেলের কর্মী, ১৯ বছর বয়সি অঙ্কিতা ভান্ডারীকে হত্যা করা হয়। আসামিরা এখন জেলে। কিন্তু সেই ঘটনার তিন বছর পর এবং অভিযুক্তেরা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সাত মাস পর আবার নতুন করে সেই ঘটনা নিয়ে উত্তাল উত্তরাখণ্ড। ইতিমধ্যেই অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডে সিবিআই তদন্তের অনুরোধে অনুমোদন দিয়েছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামী।
কিন্তু কেন অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডের তিন বছর পর এবং দোষীরা শাস্তি পাওয়ার পরেও আবার বিষয়টি নিয়ে আলোড়ন পড়ল ‘দেবভূমি’তে? নেপথ্যে কী কারণ?
২০২২ সালে হৃষীকেশের কাছে একটি রিসর্টে রিসেপশনিস্টের চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন অঙ্কিতা। রিসর্টটি ছিল হরিদ্বারের প্রাক্তন বিজেপি নেতা বিনোদ আর্যের পুত্র পুলকিতের। কাজে যোগ দেওয়ার ২২ দিনের মাথায় ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩টের পর থেকে নিখোঁজ হন অঙ্কিতা।
নিখোঁজ হওয়ার ছ’দিন পর কাছের চিলা খাল থেকে অঙ্কিতার দেহ উদ্ধার করা হয়। হৃষীকেশ এমসে ময়নাতদন্ত করা হয় দেহের। অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পায় পুলিশ। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ওই রিসর্টে অতিথিদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে অঙ্কিতাকে জোর করা হত। তাতে রাজি না হওয়াতেই তাঁকে খুন করা হয়।
হোয়াট্সঅ্যাপে কাছের এক বন্ধুকে ওই রিসর্টের কুকর্মের কথাও জানিয়েছিলেন অঙ্কিতা। বন্ধুকে অঙ্কিতা লিখেছিলেন, ‘‘গরিব হতে পারি। কিন্তু ১০ হাজার টাকার জন্য নিজেকে বিক্রি করতে পারব না।’’ সেই তথ্যও হাতে পায় পুলিশ।
অঙ্কিতার এক ফেসবুক বন্ধু দাবি করেছেন, রিসর্টে অতিথিদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে জোর করা হত অঙ্কিতাকে। কিন্তু তাতে রাজি না হওয়াতেই তাঁকে খুন করা হয়। ডিজিপিও একই দাবি করেছিলেন। তিনিও জানিয়েছিলেন, অতিথিদের ‘খুশি করতে’ অঙ্কিতাকে ‘চাপ দিতেন’ রিসর্ট মালিক।
২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অঙ্কিতার নিখোঁজ ডায়েরি করা হয় থানায়। দায়ের করা হয় এফআইআর। এর পরই পুলকিত এবং তাঁর বন্ধু সৌরভ ও অঙ্কিতকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ সূত্রে দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা নাগাদ পুলকিত, সৌরভ ও অঙ্কিতের সঙ্গে বচসা বেধেছিল অঙ্কিতার। ওই রিসর্টে কুকর্মের কথা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন অঙ্কিতা। তার পরই তাঁকে খুন করে চিলা খালে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। জেরায় ধৃতেরা খুনের কথা স্বীকার করেন।
অঙ্কিতাকে খুনের অভিযোগে উত্তাল হয় উত্তরাখণ্ড। বিক্ষোভের আঁচে ফুঁসতে থাকে এলাকা। প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে অন্য রাজ্যেও। বেআইনি ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে পুলকিতের রিসর্টটি বুলডোজ়ার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। যদিও তদন্তের মধ্যেই কেন রিসর্টটি ভেঙে ফেলা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হন অঙ্কিতার পরিবারের সদস্যেরা। তাঁদের দাবি, প্রমাণ লোপাট করতেই ওই রিসর্টটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।
অঙ্কিতাকে খুনের ঘটনায় দোষীদের কাউকে রেয়াত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী ধামী। বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠনেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে চাপের মুখে পড়ে বিজেপি বহিষ্কার করে পুলকিতের বাবা বিনোদ এবং দাদা অঙ্কিতকে।
এর পর দীর্ঘ দিন চলতে থাকে অঙ্কিতা খুনের মামলা। অবশেষে ২০২৫ সালের মে মাসে দোষীদের যাবজ্জীবনের সাজা শোনায় আদালত।
অঙ্কিতার হত্যার দিন ওই রিসর্টে এক জন ‘ভিআইপি’ উপস্থিত ছিলেন বলে প্রথম থেকেই দাবি উঠেছিল। যদিও সিট জানিয়েছিল, প্রভাবশালী নেতা বা ‘ভিআইপি’ জড়িত থাকার বিষয়ে তদন্তে কিছু উঠে আসেনি। এর পর ধীরে ধীরে প্রশমিত হয় অঙ্কিতা খুনের পর তৈরি হওয়া প্রতিবাদের আগুন।
তবে দোষীরা সাজা পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আবার বিতর্কের সূত্রপাত হয় তরুণী রিসেপশনিস্ট খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডে নাম জুড়ে যায় বিজেপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক দুষ্মন্ত গৌতমের। অভিযোগ, ওই রিসর্টেই দুষ্মন্তকে ‘একস্ট্রা সার্ভিস’ না দেওয়ার ‘অপরাধে’ অঙ্কিতাকে খুন করেন পুলকিত। ফের সামনে আসে সেই ‘ভিআইপি-তত্ত্ব’।
নিজেকে হরিদ্বারের জ্বালাপুরের প্রাক্তন বিধায়ক সুরেশ রাঠৌরের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ঊর্মিলা সানওয়ার নামে এক মহিলা সমাজমাধ্যমে দাবি করেন, অঙ্কিতার কাছ থেকে ‘বাড়তি কিছু পরিষেবা’ চেয়েছিলেন গাট্টু নামের এক ব্যক্তি। ঊর্মিলার দাবি, গাট্টুই হলেন কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতা দুষ্মন্ত গৌতম। কিন্তু অঙ্কিতা রাজি না হওয়ায়, উপরন্তু সমস্ত কুকীর্তি ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখালে তাঁকে হত্যা করে স্থানীয় চিলা খালে ফেলে দেন রিসর্টের মালিক পুলকিত।
উত্তরাখণ্ডের স্বরাষ্ট্রসচিবকে চিঠি লিখে ওই ভিডিয়ো সমাজমাধ্যম থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান দুষ্মন্ত। প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে বিজেপি নেতৃত্ব এ নিয়ে মুখে কুলুপ আঁটেন। যদিও ঊর্মিলার ওই ভিডিয়ো নকল বলে দাবি করেন প্রাক্তন বিধায়ক সুরেশ। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে দুষ্মন্তের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় এখন বিজেপি তাঁকে বাঁচাতে চেষ্টা করছে বলে সরব হয়েছে কংগ্রেস। বিজেপির সাধারণ সম্পাদককে গ্রেফতার করার দাবিতে রাজ্য জুড়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বিরোধীরা।
কংগ্রেসের দাবি, সিটের তদন্তে একাধিক ‘ফাঁকফোকর’ রয়েছে। তদন্তের আসল সত্য ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার চেষ্টা করেছে বিজেপি। অঙ্কিতার মৃতদেহ উদ্ধারের পর প্রমাণ ‘লোপাট’ করার জন্যই স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রেণু বিস্তের নির্দেশে রিসর্ট ভেঙে ফেলা হয় বলেও দাবি তুলেছেন উত্তরাখণ্ডের কংগ্রেস নেতারা।
সম্প্রতি কংগ্রেসের এক্স হ্যান্ডলে বলা হয়, ‘‘এখন স্পষ্ট যে অঙ্কিতার উপরে যে ভিআইপিকে সার্ভিস দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল তিনি আর কেউ নন, নরেন্দ্র মোদীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ নেতা দুষ্মন্ত গৌতম। এর পরে কি নরেন্দ্র মোদী কাছের ওই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন? না কি পাপ লুকিয়ে ফেলতে সাহায্য করবেন?’’ এ বিষয়ে অবিলম্বে কোনও কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির তত্ত্বাবধানে সিবিআইকে দিয়ে তদন্তেরও দাবি জানিয়েছিল কংগ্রেস।
অঙ্কিতার মা-ও তদন্তের স্বার্থে ঊর্মিলার কাছে থাকা যাবতীয় তথ্য আদালতের কাছে জমা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন, যাতে বিজেপির ওই নেতার ভূমিকা খতিয়ে দেখা সম্ভব হয়। এ দিকে, তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে বলে সরব দুষ্মন্ত।
একটি বিবৃতিতে দুষ্মন্ত বলেন, ‘‘সম্প্রতি কিছু অপরাধী চক্রান্ত করে একটি ভুয়ো অডিয়ো বানিয়ে তা মিডিয়া ও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে।’’ অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছেড়ে দেবেন বলেও দাবি করেছেন দুষ্মন্ত।
বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হতে ফের উত্তাল হয় উত্তরাখণ্ড। অঙ্কিতার বিচারের দাবিতে নতুন করে রাস্তায় নামে জনগণ। জায়গায় জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়েছে। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অঙ্কিতা খুনের ঘটনা নিয়ে ‘দেবভূমি’তে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়ানোর পর মুখ্যমন্ত্রী ধামীর সঙ্গে দেখা করেন মৃতার বাবা-মা। মেয়ের খুনে সিবিআই তদন্তের আর্জি জানান তাঁরা। জানা গিয়েছে, সেই অনুরোধ অনুমোদন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
পুরো বিষয়টি নিয়ে বিজেপির অন্দরেও দ্বিমত তৈরি হয়েছে। দলের অনেক নেতা বিষয়টি নিয়ে মুখ না খুললেও উত্তরাখণ্ডে ক্ষমতাসীন বিজেপির কয়েক জন বর্ষীয়ান নেতা সিবিআই তদন্তের দাবিকে সমর্থন করেছেন।
প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিজেপি নেত্রী বিজয়া বার্থওয়াল সম্প্রতি মামলায় নতুন করে তদন্ত শুরু করার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘‘এটা লজ্জাজনক যে উত্তরাখণ্ডে এই ঘটনা ঘটেছে। যদি আমাদের মেয়েদের প্রতি অবিচার চলতে থাকে, তা হলে আমরা নিজেদের দেবভূমির বাসিন্দা বলতে পারি না।’’