Harish Rana Case

১৩ বছর শয্যাশায়ী, ছেলের মৃত্যুভিক্ষা চেয়ে আদালতে লড়ছেন বাবা-মা! কোয়াড্রিপ্লেজ়িয়ায় আক্রান্ত কে এই হরীশ?

কী ভাবে এই অবস্থা হল হরীশের? চনমনে যুবক ছিলেন দিল্লির মহাবীর এনক্লেভের বাসিন্দা হরীশ। মোহালির চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন তিনি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩২
Share:
০১ ২০

ধড় থেকে পা পর্যন্ত পক্ষপাতগ্রস্ত, অসাড়। গত ১৩ বছর ধরে নড়াচড়াও করতে পারেন না, নয়ডার ৩২ বছর বয়সি যুবক হরীশ রাণা। তিনি কোয়াড্রিপ্লেজ়িয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। এমনকি, বাইরের জগৎ বা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও তাঁর কোনও চেতনা নেই। কেবল আছে প্রাণটুকু।

০২ ২০

তাঁকে কি ‘পরোক্ষ মৃত্যু’ (প্যাসিভ ইউথেনসিয়া) দান করা যায়? এ নিয়ে মামলা চলছে শীর্ষ আদালতে। বৃহস্পতিবার সেই মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ৩২ বছর বয়সি হরীশের জীবনদায়ী চিকিৎসা স্থগিত করার কথা বিবেচনা করা হবে।

Advertisement
০৩ ২০

ডাক্তারি পদ্ধতিতে হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্যু চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁর বাবা-মা। সেই মামলার শুনানিই চলছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চে।

০৪ ২০

হরীশের ‘পরোক্ষ মৃত্যু’ নিয়ে বাবা-মায়ের দায়ের করা আবেদনের রায় আপাতত সংরক্ষণ করা হয়েছে। শুনানির আগে হরীশের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ বিষয়টিকে ‘সংবেদনশীল বিষয়’ বলে মন্তব্য করে।

০৫ ২০

সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, ‘‘এই বিষয়গুলি সংবেদনশীল। আমরা কেউ অমর নই। কে বাঁচবে বা মারা যাবে, তা নির্ধারণ করার আমরা কে? আমরা জীবনদায়ী চিকিৎসা স্থগিত করার কথা বিবেচনা করব।’’ হরীশের বাবা-মায়ের প্রতিনিধিত্বকারী অ্যামিকাস কিউরি এবং কেন্দ্রের পক্ষে উপস্থিত এএসজি ঐশ্বর্য ভাটির বিস্তারিত বক্তব্যের পর আদালতের এই পর্যবেক্ষণ।

০৬ ২০

কিন্তু কী ভাবে এই অবস্থা হল হরীশের? চনমনে যুবক ছিলেন দিল্লির মহাবীর এনক্লেভের বাসিন্দা হরীশ। মোহালির চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। আচমকা দুর্ঘটনা! ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট কলেজের চারতলা থেকে পড়ে যান তিনি।

০৭ ২০

প্রাণরক্ষা হলেও শরীরের প্রায় সমস্ত অঙ্গই অকেজো হয়ে যায় হরীশের। মাথার আঘাত ছিল অত্যন্ত গুরুতর। দুর্ঘটনা নিয়ে ‘রহস্য’ রয়েছে বলেই দাবি ছিল পরিবারের। থানায় সে সময় এফআইআরও করেন হরীশের বাবা রাণা।

০৮ ২০

এর পর শুরু হয় হরীশের মা-বাবার সংগ্রাম। ছেলেকে সুস্থ করে তোলার জন্য একের পর এক বড় হাসপাতাল ঘুরতে শুরু করেন তাঁরা। দীর্ঘ দিন চণ্ডীগড়ের পিজিআইতে হরীশের চিকিৎসা হয়েছে।

০৯ ২০

পরে এমস, রামমনোহর লোহিয়া, লোকনায়ক এবং দিল্লির ফর্টিস হাসপাতালেও দেখানো হয় তাঁকে। কিন্তু শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। দীর্ঘ দিন উদ্ভিজ্জ অবস্থায় (ভেজিটেটিভ স্টেট) রয়েছেন তিনি। শ্বাস-প্রশ্বাস এবং খাবারের জন্য টিউবের উপর নির্ভর করতে হয়।

১০ ২০

১৩ বছরের বেশি সময় বিছানা থেকে ওঠেননি হরীশ। প্রতি দিন ছেলেকে একটু একটু করে বিছানার সঙ্গে মিশে যেতে দেখে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন হরীশের বৃদ্ধ বাবা-মা। তাঁদের আবেদন ছিল, মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে ছেলেকে প্যাসিভ ইউথেনসিয়া (নিষ্কৃতিমৃত্যু) দেওয়া হোক।

১১ ২০

তাঁরা আদালতে জানিয়েছিলেন, ২০১৩ সাল থেকে তাঁদের সন্তান শয্যাশায়ী। তাঁর সেরে ওঠার আর কোনও সম্ভাবনা নেই। দিনের পর দিন অসুস্থতা আরও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ছেলের কষ্ট লাঘব করার জন্যই তাঁর মৃত্যু প্রয়োজন।

১২ ২০

তবে প্রত্যক্ষ নয়, হরীশের জন্য পরোক্ষ মৃত্যুদানের আবেদন জানিয়েছিলেন তাঁরা। প্রত্যক্ষ মৃত্যুদানের ক্ষেত্রে রোগীর কষ্ট লাঘবের জন্য চিকিৎসক ইচ্ছাকৃত ভাবে এমন কোনও ওষুধ দেন, যাতে দ্রুত মৃত্যু নেমে আসে। এ ক্ষেত্রে তা চাওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়ে, লাইফ সাপোর্ট তুলে নিয়ে মৃত্যুদানের কথা বলা হয়েছে। এর পর দিল্লি হাই কোর্ট থেকে সেই মামলা সুপ্রিম কোর্টে যায়।

১৩ ২০

গত বছর নভেম্বর মাসে অনুরূপ আর্জি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন হরীশের বাবা-মা। কিন্তু তখন আবেদন গ্রাহ্য হয়নি। বলা হয়েছিল, রোগীকে বাড়িতেই রাখা হবে এবং চিকিৎসকেরা নিয়মিত তাঁকে দেখতে যাবেন। উত্তরপ্রদেশ সরকারের সহযোগিতায় তাঁর চিকিৎসা চলবে।

১৪ ২০

কিন্তু সহযোগিতার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে এ বার রোগীর বাবা-মায়ের বক্তব্য, তাঁদের সন্তানের শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। তাঁকে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।

১৫ ২০

বৃহস্পতিবার শুনানির সময়, অ্যামিকাস কিউরি হরীশের জন্য নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টে। আদালতে হরীশের জন্য তৈরি দু’টি মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে আইনজীবী এ-ও জানান, যুবকের আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা নগণ্য। আইনজীবী আদালতে বলেন, ‘‘এই ধরনের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার লঙ্ঘন করে।’’

১৬ ২০

হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে অ্যামিকাস বলেন, হরীশকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে রাখা হবে। সেখানে তাঁর খাওয়ার টিউবগুলি সরিয়ে ফেলা হবে। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কোনও হস্তক্ষেপ করা হবে না। তাঁকে ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হবে যাতে তিনি কোনও ব্যথা অনুভব না করেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁকে আরামের মধ্যে রাখা হবে।

১৭ ২০

হরীশের মামলায় অ্যামিকাসের যুক্তির সঙ্গে একমত হয়ে হরীশের জন্য নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন করেন এএসজি ভাটিও। এএসজি জোর দিয়ে জানান যে, এই প্রথম বার নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে আদালত কর্তৃক নির্ধারিত নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করা হবে। আদালতে হরীশের বাবা-মায়ের কষ্ট এবং আইনি লড়াইয়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

১৮ ২০

যুক্তি শেষে আদালতে এএসজি ভাটি জানান, হরীশ গত ১৩ বছর ধরে একটি অপরিবর্তনীয় স্থায়ী উদ্ভিজ্জ অবস্থায় রয়েছেন। তাঁর শরীরে চামড়া আর হাড় ছাড়া কিছু নেই। সব পক্ষের কথা শুনে শীর্ষ আদালত আপাতত মামলার রায় সংরক্ষণ করেছে।

১৯ ২০

উল্লেখ্য, প্রত্যক্ষ মৃত্যুদান অবৈধ হলেও অরুণা শানবাগ মামলায় ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট পরোক্ষ মৃত্যুকে স্বীকৃতি দেয়। মুম্বইয়ের কেইএম হাসপাতালের নার্স অরুণা ১৯৭৩ সালে এক জন ওয়ার্ড বয়ের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি।

২০ ২০

আদালত তাঁর জন্য নিষ্কৃতিমৃত্যু অনুমোদন করলেও অরুণা ২০১৫ সালে নিউমোনিয়ায় মারা যান। ২০১৮ সালে পরোক্ষ মৃত্যুদানকে বৈধতা দেয় শীর্ষ আদালত। সে সংক্রান্ত নির্দেশিকাও তৈরি হয়।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement