ভাবুন একটি ফোন নম্বর এবং একটি সাধারণ ওয়েবসাইট দিয়ে ঘরে বসে যে কাউকে ট্র্যাক করে ফেলছেন আপনি। যেমনটা সাইবার বিশেষজ্ঞেরা সিরিজ় বা সিনেমায় করে থাকেন। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বাস্তবে তেমনটাই করছে একটি ওয়েবসাইট।
‘প্রক্সিআর্থ’ নামে ওই ওয়েবসাইটটি তৈরি হয়েছে ভারতে। তৈরি করেছেন ভারতীয় নামাধিকারী এক ব্যক্তি। এ ক্ষেত্রে অবশ্য সৃষ্টির থেকেও বেশি রহস্যময় ‘স্রষ্টা’। কারণ, যিনি এই ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন, তাঁর একটি নাম প্রকাশ্যে এলেও তিনি কেমন দেখতে তা কেউ জানে না।
তবে স্রষ্টার আগে একনজরে দেখে নেওয়া যাক সৃষ্টি সম্পর্কে। ভারতীয় মোবাইল ব্যবহারকারীদের সম্ভাব্য অবস্থান, এমনকি ‘লাইভ লোকেশন’ ফাঁস করতে সক্ষম ‘প্রক্সিআর্থ’ নামের ওই ওয়েবসাইটটি।
ওয়েবসাইটটিতে গিয়ে ফোন নম্বর দিলেই ব্যস, ওই নম্বরের মালিকের নাম, ধাম, বাবার নাম, ব্যবহারকারীর ঠিকানা, বিকল্প নম্বর, ইমেল আইডি এবং অন্যান্য বিবরণ বিশদে প্রকাশ করতে সক্ষম ‘প্রক্সিআর্থ’।
কখনও কখনও টেলিকম টাওয়ার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, এক জন ব্যবহারকারীর ‘লাইভ লোকেশন’ও জানিয়ে দিচ্ছে ওয়েবসাইটটি। সেই ‘লোকেশন’ অদ্ভুত ভাবে সঠিকও হচ্ছে।
এই তথ্যগুলো টেলিকম রেকর্ড থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে যা আমরা সকলেই সিম কার্ড কেনার সময় এয়ারটেল, জিয়ো, ভি এবং অন্যদের সরবরাহ করি। কিছু ক্ষেত্রে এই তথ্যগুলো পুরনো। কিন্তু বেশির ভাগ জনের ক্ষেত্রেই তথ্যগুলি নির্ভুল।
এ এক দিকে যেমন চমকপ্রদ, তেমনই ভীতিকর এবং উদ্বেগের। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহকের গোপনীয়তার সুরক্ষা লঙ্ঘিত হবে এবং যে কারও হাতে পৌঁছে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। আর্থিক কেলেঙ্কারিরও কারণ হতে পারে ওয়েবসাইটটি।
এ বার আসা যাক ওয়েবসাইটের স্রষ্টার কথায়। ওয়েবসাইট নিয়ে তদন্ত করার পর সংবাদমাধ্যম ‘আজ তক’-এর ফ্যাক্ট চেক টিম বিভিন্ন সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে রাকেশ নামে এক ব্যক্তিকে খুঁজে পেয়েছে। তিনি সম্ভবত এক জন প্রোগ্রামার এবং ভিডিয়ো এডিটর।
‘প্রক্সিআর্থ’ ওয়েবসাইটের কোড থেকে রাকেশের টেলিগ্রাম চ্যানেলের লিঙ্ক পাওয়া যায়। সেই চ্যানেলটির সঙ্গে আবার লিঙ্ক রয়েছে আর একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলের। এর পর ডিপি দেখে ধীরে ধীরে এক্স, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউব চ্যানেলেরও হদিস পাওয়া যায়।
তবে রাকেশই তাঁর আসল নাম কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি। এ-ও লক্ষ করা গিয়েছে, রাকেশের সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টে কোনও প্রকৃত মানুষের ছবি নেই। পরিবর্তে রয়েছে একটি ‘অ্যানিমে (কার্টুনসদৃশ)’ ছবি, যা কৃত্রিম মেধা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে মনে করা হচ্ছে।
রাকেশের ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, এক্স এবং ইউটিউব অ্যাকাউন্টগুলিতে কন্টেন্টের ধরনও এক। ভিডিয়ো সম্পাদনার অ্যাপ ব্যবহার করার কৌশল, একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিকে মেসেজ পাঠানোর উপায়, ওটিপি পাঠানোর জন্য অস্থায়ী নম্বর সরবরাহকারী ওয়েবসাইট— মূলত এ সব নিয়েই কন্টেন্ট আপলোড করা হয় ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে।
ওই ব্যক্তি ‘প্রক্সিআর্থ’ ওয়েবসাইটটি পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে এক জন বলে জানাচ্ছে সংবাদমাধ্যম। রাকেশের বিভিন্ন সমাজমাধ্যম ঘাঁটার সময় একটি ফোন নম্বর উঠে আসে।
সেই নম্বরে ফোন করে রাকেশের সাক্ষাৎকারও নিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। সাক্ষাৎকারে রাকেশ দাবি করেছেন, তাঁরা গ্রাহকদের তথ্য কিনে ওই ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন এবং সেই কাজ করে তাঁরা কোনও ভুল করেননি।
রাকেশের কাছে ইচ্ছা করে গ্রাহকদের ফাঁস হওয়া তথ্য কেনার জন্য আগ্রহ দেখালে, তিনি সে সব তথ্য বিক্রি করতে রাজি হয়ে যান। তিনি জানান, তাঁর দলে ১০-১২ জন রয়েছেন, যাঁরা ‘প্রক্সিআর্থ’ এবং অন্যান্য ওয়েবসাইট পরিচালনা করেন। তিনি বিহারের বাসিন্দা বলেও রাকেশ জানিয়েছেন।
রাকেশ নামের ওই ব্যক্তি এ-ও জানিয়েছেন, তিনি কোনও তথ্য ফাঁস করেননি এখনও। তাই কোনও ভুল করেননি। তিনি কেবল বিভিন্ন সময়ে ফাঁস হওয়া তথ্য সংগ্রহ করে ওয়েবসাইটে কাজে লাগিয়েছেন।
রাকেশের দাবি, ‘প্রক্সিআর্থ’ ওয়েবসাইটটি কেবল মনোযোগ আকর্ষণ করার একটি মাধ্যম। এর সাহায্যে তিনি তাঁর অন্যান্য ওয়েবসাইটের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে চান বলেও জানিয়েছেন।
সরকার তাঁর ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলে কী করবেন? উত্তরে সংবাদমাধ্যমকে রাকেশ জানিয়েছেন, ভারত তাঁর ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলে তিনি একই ধরনের আরও একটি ওয়েবসাইট তৈরি করবেন।