পৃথিবীতে খুব কম মানুষই বেঁটে হতে চান। তবুও, সবাই উচ্চতার ‘আশীর্বাদ’ পান না। কিন্তু তুরস্কের বাসিন্দা সুলতান কোসেনের ক্ষেত্রে বিষয়টা তেমন না। তিনি বেঁটে হতে চান। কারণ, উচ্চতা তাঁর কাছে ‘অভিশাপ’।
সুলতান বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা জীবিত মানুষ। ২০০৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই তকমা তাঁর সঙ্গে জুড়েছে। তবে ব্যাপক উচ্চতা বিশ্বব্যাপী খ্যাতির পাশাপাশি বিড়ম্বনাও বয়ে এনেছে তাঁর জীবনে।
তুরস্কের ৪৩ বছর বয়সি কৃষক সুলতানের উচ্চতা ৮ ফুট ২ ইঞ্চি (২৪৩ সেমি)। ২০০৯ সাল থেকে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা জীবিত ব্যক্তি হিসাবে গিনেস বুকে জায়গা করে নিয়েছেন।
বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা হাত এবং পা থাকার নজিরও রয়েছে সুলতানের। তাঁর আগে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ব্যক্তি হওয়ার তকমা ছিল চিনের শি শুনের কাছে।
সুলতান এতটাই লম্বা যে সাধারণ উচ্চতার দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকতে পারেন না তিনি। গাড়িতে চড়ার আনন্দ উপভোগ করতে পারেন না। বিছানায় আরামে শুয়ে ঘুমোতেও পারেন না। আরামে ঘুমোনোর জন্য তিনটি বিছানা একসঙ্গে জোড়া লাগাতে হয় তাঁকে।
১৯৮২ সালে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের মার্দিন শহরে সুলতানের জন্ম। তাঁর হাত এবং পায়ের তালু এতটাই বড় যে অর্ডার দিয়ে বিশেষ জুতো বানাতে হয়। আঙুলে ধরার জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ কলমের। তাঁর জামার মধ্যে সাধারণ উচ্চতা এবং ওজনের দু’জন মানুষ ঢুকে পড়তে পারেন।
কিন্তু কী ভাবে এতটা লম্বা সুলতান? জন্মের সময় অন্য বাচ্চাদের মতোই ওজন এবং উচ্চতা ছিল তাঁর। কিন্তু ১০ বছর বয়স থেকে সুলতানের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ করতে শুরু করেন তাঁর বাবা-মা।
সুলতান তাঁর বন্ধুদের থেকে বা তাঁর বয়সি অন্য ছেলেদের থেকে একটু বেশি গতিতেই লম্বা হতে শুরু করেছিলেন। বিষয়টি ঘুম কেড়েছিল তাঁর পরিবারের।
সুলতানকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে তাঁর মা-বাবা জানতে পারেন, সুলতানের মাথায় একটি টিউমার রয়েছে। মাস্টার গ্ল্যান্ড পিটুইটারিতেই সেই টিউমার রয়েছে। দেহের সমস্ত হরমোন গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে পিটুইটারি। ফলে টিউমার হওয়ায় পিটুইটারি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার হেরফের হতে শুরু করে।
সুলতানের দেহে গ্রোথ হরমোনের পরিমাণ এতটাই বেড়ে যেতে শুরু করেছিল যে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে তাঁর উচ্চতাও।
প্রথম দিকে সুলতানকে দেখে হাসাহাসি করতেন তাঁর বন্ধুরা। কেউ কেউ তাঁকে দেখে ভয়ও পেতেন। কারও সঙ্গেই খোলা মনে মেলামেশা করতে পারতেন না সুলতান। স্কুলের সমস্ত বন্ধুও ধীরে ধীরে দূরে সরে যায় তাঁর কাছ থেকে।
এর পর একাকিত্ব গ্রাস করে সুলতানকে। ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারতেন না তিনি। হাতে লাঠি নিয়ে চলাফেরা করতে হত তাঁকে।
পড়াশোনা শেষ করলেও বিশাল উচ্চতার জন্য কোনও সংস্থাই সুলতানকে চাকরি দিতে চাইত না। পরিবারের সঙ্গে গাড়িতে চড়ে কোথাও যেতেও পারতেন না তিনি। ফলে পরিবারের সদস্যেরা ঘুরতে গেলেও তাঁকে বাড়িতেই রেখে দিয়ে যেতেন তাঁরা।
এক বার পা ভেঙে গিয়েছিল সুলতানের। কিন্তু উচ্চতার জন্য কোনও হাসপাতালই তাঁর চিকিৎসা করতে রাজি হচ্ছিল না। ১০ দিন বাড়িতেই পড়েছিলেন। শেষে তাঁকে বিমানে চাপিয়ে আমেরিকায় নিয়ে আসতে হয়।
অনেকের কাছে ভাল উচ্চতা আশীর্বাদ হলেও সুলতানের কাছে তা অভিশাপ। সুলতান স্বীকার করেছেন যে, উচ্চতার জন্য তিনি লজ্জিত বোধ করেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমি আমার শৈশব উপভোগ করিনি। কেউ কথা বলত না। আমাকে ‘দানব’ বলে রাগাত। খাটের তলায় লুকিয়ে থাকতাম আমি।’’
সুলতান আরও বলেন, ‘‘আমি যত লম্বা হতে থাকি, আমার জীবন আরও খারাপ হতে থাকে। সব কিছু অন্ধকার লাগতে শুরু করে। আমি সব সময় ভাবতাম আমার কী হবে, আমি কি বাঁচব না মারা যাব? আতঙ্কিত থাকতাম। ক্রমাগত ভয়ের মধ্যে বাস করতাম আমি।’’
এ ভাবেই জীবন কাটছিল সুলতানের। ২০১০ সালে ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল স্কুলে চিকিৎসা শুরু হয় তাঁর। টানা দু’বছর চিকিৎসার পর তাঁর গ্রোথ হরমোন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। কিন্তু তত দিনে তাঁর উচ্চতা হয়ে গিয়েছে ৮ ফুট ২ ইঞ্চি।
২০১৩ সালে সুলতান তাঁর থেকে ১০ বছরের ছোট মার্ভে দিবোকে বিয়ে করেন এবং এর এক বছর পর উচ্চতার জন্য গিনেস বুকে নাম তোলেন তিনি। বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি পান।
এর পর একটি সার্কাসে যোগ দেন সুলতান। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে প্রচুর শো করেন তিনি। সে সময় বিশ্বের সবচেয়ে ছোট উচ্চতার মানুষ চন্দ্র বাহাদুরের সঙ্গে বন্ধুত্বও হয় তাঁর।