Aircraft Carrier Abraham Lincoln

ওজন ১ লক্ষ টন, ঘিরে থাকে ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’! ইরানের পক্ষে আমেরিকার ‘ভাসমান দুর্গ’কে ডুবিয়ে দেওয়া কি আদৌ সম্ভব?

ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন একটি নিমিৎজ় শ্রেণির বিমানবাহী রণতরী। ওজন ১০০০০০ টন। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ রণতরীটিকে সত্যিই ঘায়েল করার ক্ষমতা রয়েছে ইরানের? মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে কি ডুবিয়ে দিতে পারে তেহরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ মার্চ ২০২৬ ১১:২৭
Share:
০১ ১৯

পরমাণুশক্তি চালিত বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজে পাল্টা আঘাত। আমেরিকার সুপারক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজে ৪টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হেনেছে ইরান। ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ অভিযান ‘অপারেশন লায়ন্স রোর’ (সিংহের গর্জন) ও ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (মহাকাব্যিক ক্রোধ)-এ জ্বলছে সাবেক পারস্যভূমি। অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ তাঁর পরিবারের সদস্যেরা।

০২ ১৯

সেই হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে লেগেছে ইরান। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে ‘নরকের দ্বারে’ পৌঁছে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের রেভেলিউশনারি গার্ড (আইআরজিসি)। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তেহরান জানিয়েছিল স্থল ও সমুদ্র ক্রমশ আক্রমণকারীদের কবরস্থানে পরিণত হবে।

Advertisement
০৩ ১৯

তার পরই তেহরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থার প্রতিবেদনে আইআরজিসির এক বিবৃতিকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়, রবিবার (১ মার্চ, ২০২৬) মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।

০৪ ১৯

ইরানের এই দাবি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পেন্টাগনের কেন্দ্রীয় কমান্ড দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লিঙ্কনকে আঘাত করার ইরানের এই দাবিকে সর্বৈব মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন মার্কিন সামরিক কর্তারা। তাঁরা জোর দিয়ে জানিয়েছেন যে তেহরানের ছোড়া অস্ত্রগুলি পারমাণবিক শক্তিচালিত সুপারক্যারিয়ারটির ধারেকাছেও এসে পৌঁছোয়নি। গায়ে আঁচড় পর্যন্ত কাটতে পারেনি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।

০৫ ১৯

বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ হিসাবে পরিচিত মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। এক লক্ষ টন ওজনের ইস্পাতদুর্গটি গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে হরমুজ় প্রণালীর কাছে মোতায়েন করা রয়েছে বলে খবর। পরমাণু শক্তিচালিত এই জাহাজটি দীর্ঘ দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

০৬ ১৯

ইরানে গণবিক্ষোভের আশঙ্কা ছড়াতেই ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ চিন সাগর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। নিমিৎজ় শ্রেণির এই রণতরীর সঙ্গী তিনটি আর্লে বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারও পশ্চিম এশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। দিন কয়েক আগে তারা ইরান উপকূলের অদূরে ঘাঁটি গেড়েছিল।

০৭ ১৯

প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও বিমানকর্মী নিয়ে পরিচালিত এই জাহাজকে প্রায়ই ‘ভাসমান দুর্গ’ বলা হয়। হাসপাতাল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, খাদ্য সরবরাহ— সব মিলিয়ে এটি সমুদ্রে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের উপযোগী পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি।

০৮ ১৯

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভে ইরানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, ১৫ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে খুন করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনেইয়ের বাহিনী। ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অস্থিরতা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এই রণতরীটি উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল।

০৯ ১৯

ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন একটি নিমিৎজ় শ্রেণির বিমানবাহী রণতরী। ১,০০০ ফুটেরও বেশি দৈর্ঘ্যের এই বিশাল জাহাজটি যুদ্ধের সময় ভাসমান শহর হিসাবে কাজ করে। সাড়ে পাঁচ হাজার জনেরও বেশি কর্মী বহন করতে সক্ষম রণতরীটি। এই জাহাজটি ১৯৮৯ সালে মার্কিন নৌবাহিনীতে আনুষ্ঠানিক ভাবে জায়গা পায়। যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহম লিঙ্কনের নামে নামকরণ করা এই রণতরীটি মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তির অন্যতম প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়।

১০ ১৯

লিঙ্কন আদতে একটি ভাসমান বিমানঘাঁটির প্রতিরূপ। প্রায় ১,০৯২ ফুট দীর্ঘ এই জাহাজটিতে একসঙ্গে ৭০ থেকে ৯০টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার বহন করা সম্ভব। উড়ানের ডেকে স্টিম ক্যাটাপোল্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত গতিতে বিমান উৎক্ষেপণ করা যায়। বিমান অবতরণ করার জন্য বিশেষ একটি প্রযুক্তি অ্যারেস্টিং গিয়ার ব্যবহার করা হয়। সাধারণত এফএ ১৮ সুপার হর্নেট, এফ ৩৫সি লাইটনিং, নজরদারি বিমান ও এমএইচ সিহক হেলিকপ্টার এতে মোতায়েন থাকে।

১১ ১৯

আমেরিকান সুপারক্যারিয়ারেরা কখনও একাকী ভ্রমণ করে না। একটি শক্তিশালী ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’ দিয়ে সর্বদা সুরক্ষিত থাকে তারা। লিঙ্কন বর্তমানে তিনটি গাইডেড-ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ দিয়ে পরিবেষ্টিত। এতে উন্নত রাডার সিস্টেম এবং ৯০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ধারণ ক্ষমতা আছে। জলপথে ধেয়ে আসা শত্রুপক্ষের আক্রমণকে প্রাথমিক ভাবে শনাক্ত এবং নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি প্রতিরক্ষামূলক বলয় তৈরি করে।

১২ ১৯

দু’টি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে চালিত হওয়ায় জাহাজটিতে দীর্ঘ সময় জ্বালানি ভরার প্রয়োজন পড়ে না। সমুদ্রে টহল দিতে পারে দিনের পর দিন। সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। সামরিক প্রয়োজনে দ্রুত এর উপস্থিতি মার্কিন নৌবাহিনীকে জলপথের রণকৌশলে অনেকটাই এগিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়াও এটি নিজের অবস্থানের পূর্বাভাসের নকশা এড়াতে ঘন ঘন দিক পরিবর্তন করে।

১৩ ১৯

‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’-এর যুদ্ধজাহাজগুলিও অত্যন্ত উন্নত, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং বহুমুখী নেভাল কমব্যাট সিস্টেম এজিস দিয়ে সজ্জিত। ক্রুজ়ার এবং ডেস্ট্রয়ারের সমন্বয়ে গঠিত ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে শত শত ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এসএম ৬ ক্ষেপণাস্ত্র, যা বিশেষ ভাবে শত্রু বিমান, ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক অস্ত্র ধ্বংস করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

১৪ ১৯

আব্রাহাম লিঙ্কন একটি অত্যাধুনিক বহু-স্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে। বাইরের স্তরে রয়েছে ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, যা আগত ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে আটকাতে বা বিভ্রান্ত করার জন্য নকশা করা হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল পরিবারের মতো দূরপাল্লার ইন্টারসেপ্টর।

১৫ ১৯

প্রতিটি এজিস-সজ্জিত ডেস্ট্রয়ার প্রায় ৯০টি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বহন করে। তার মধ্যে রয়েছে কিছু দূরপাল্লার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা ৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি। সুপারক্যারিয়ার বা বিমানবাহী রণতরীটির মূল আক্রমণ ক্ষমতা আসে এর বহন করা যুদ্ধবিমান থেকে। তবুও আত্মরক্ষার জন্য এতে রয়েছে সি স্প্যারো ক্ষেপণাস্ত্র, রোলিং এয়ারফ্রেম মিসাইল এবং ফ্যালানক্স ক্লোজ়-ইন ওয়েপন সিস্টেম।

১৬ ১৯

পশ্চিম এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে এই রণতরী। ইরাক ও আফগানিস্তান সংক্রান্ত অভিযানের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা সূত্রের দাবি। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ রণতরীটিকে সত্যিই ঘায়েল করার ক্ষমতা রয়েছে ইরানের? মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে কি ডুবিয়ে দিতে পারে তেহরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা?

১৭ ১৯

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানের হাতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্রপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার। তার মধ্যে রয়েছে স্বল্প, মাঝারি এবং মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র, সশস্ত্র ড্রোন এবং হাইপারসনিক অস্ত্র। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ম্যাক ৫-এর বেশি গতিতে ছুটতে পারে। ইরান দাবি করে যে ফতেহ-২-এর মতো হাইপারসনিক সিস্টেম চালু করেছে তারা। এর জন্য তারা হাইপারসনিক বুস্ট-গ্লাইড যান ব্যবহার করেছে। ইরানের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র জাহাজ-বিধ্বংসী ভূমিকার জন্য পরিচিত লাভ করেছে।

১৮ ১৯

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুতগামী নৌবহর ও যুদ্ধজাহাজ পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তাদের আছে। অতীতে আঞ্চলিক সংঘাতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার নজির রয়েছে।

১৯ ১৯

লিঙ্কন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের অংশ হওয়ায় এটি একা ঘোরাফেরা করে না। এর চারপাশে থাকা গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজ়ার ও সাবমেরিন— সমন্বিত প্রতিরক্ষা বলয় অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা, আগাম সতর্কীকরণ বিমান ও উপগ্রহের নজরদারির ফলে বহুমাত্রিক সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে এজিস ব্যবস্থা, কাছাকাছি হুমকির ক্ষেত্রে ক্লোজ়-ইন ওয়েপন সিস্টেম ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষা সক্রিয় থাকে। ফলে সরাসরি আঘাত হানতে হলে ইরানের অত্যন্ত সমন্বিত ও ব্যাপক হামলা প্রয়োজন বলে মত প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের।।

ছবি: সংগৃহীত, এআই সহায়তায় প্রণীত ও ফেসবুক থেকে নেওয়া।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement