Mojtaba Hosseini Khamenei

বিদেশে বিলাসবহুল হোটেল, ভিলা! ১৮-তে পা দিয়েই ইরাক যুদ্ধে ঝাঁপ দেন ইরানের নতুন নেতা খামেনেই-পুত্র মোজতবা

শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই তাঁর দ্বিতীয় সন্তান মোজতবা হুসেইনিকে সেই কুর্সিতে বসাল ইরান। পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও সেনা কমান্ডারদের চাপেই কি এই সিদ্ধান্ত? তুঙ্গে জল্পনা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ মার্চ ২০২৬ ১৩:৫০
Share:
০১ ১৮

আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর পাঁচ দিন পার। তার মধ্যেই নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে (সুপ্রিম লিডার) বেছে নিল যুদ্ধরত তেহরান। স্থানীয় গণমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের দাবি, ওই কুর্সিতে বসতে চলেছেন খামেনেই-পুত্র মোজতবা হুসেইনি। বিদেশে তাঁর কোটি কোটি টাকার বিলাসবহুল সম্পত্তি রয়েছে বলে কানাঘুষো শুনতে পাওয়া যায়। তাই সাবেক পারস্যে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসা এই শিয়া ধর্মগুরুকে নিয়ে চলছে আলোচনা।

০২ ১৮

আলি খামেনেইয়ের দ্বিতীয় পুত্র বছর ৫৬-র মোজতবার জন্ম ইরানের মাশহাদ শহরে। সালটা ছিল ১৯৬৯। শৈশবের সাত বছর সাবেক পারস্যের উত্তর-পশ্চিমের সারদাশত এবং মাহাবাদ শহরে কাটে তাঁর। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ নেন মোজতবা। ছোটবেলায় বাবা আলি খামেনেই ছিলেন তাঁর শিক্ষক। এ ছাড়াও আয়াতোল্লাহ মাহমুদ হাশেমি শাহরুদি নামের এক ধর্মগুরুর কাছেও মোজতবাকে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী জীবনে স্নাতক স্তরের পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মতত্ত্ব নিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।

Advertisement
০৩ ১৮

মোজতবার জন্মের সময় ইরানে ছিল পুরোদস্তুর রাজশাহি। তেহরানের কুর্সিতে তখন মহম্মদ রেজ়া শাহ পহেলভি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁর। শুধু তা-ই নয়, দেশকে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে সাবেক পারস্যে পশ্চিমি সংস্কৃতি আমদানি করেন তিনি। এর প্রতিবাদে একসময় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে আমজনতা। ফলস্বরূপ, ১৯৭৯ সালে উপসাগরীয় দেশটিতে ঘটে যায় ‘ইসলামীয় বিপ্লব’, যা সেখানকার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

০৪ ১৮

ইরানি বিপ্লবের অন্যতম কারিগর ছিলেন আলি খামেনেই। তাঁদের আন্দোলনেই পতন ঘটে রাজতন্ত্রের। সেই জায়গায় ‘ইসলামীয় প্রজাতন্ত্র’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে তেহরান। রাতারাতি এর ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে চলে যান আলি খামেনেই। দ্বিতীয় পুত্র মোজতবার বয়স তখন মাত্র ১০। বাবার আদর্শ তাঁর শিশু মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ফলে পশ্চিমি সংস্কৃতিকে পুরোপুরি মন থেকে মুছে ফেলে শিয়া কট্টরপন্থাকে আঁকড় ধরতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি।

০৫ ১৮

ওই বিপ্লবের মাত্র এক বছরের মাথায় (পড়ুন ১৯৮০ সাল) আচমকাই ইরান আক্রমণ করে বসেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। ফলে জন্মলগ্নেই যুদ্ধের মুখে পড়ে তেহরানের ‘ইসলামীয় প্রজাতন্ত্র’। আট বছর ধরে চলা ওই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে আমজনতার চোখে নায়কের আসনে উঠে আসেন আলি খামেনেই। বাবার সঙ্গে রণাঙ্গনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন মোজতবাও। এতে তুঙ্গে ওঠে বাহিনীর মনোবল।

০৬ ১৮

স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ এক বছর, অর্থাৎ ১৯৮৭-’৮৮ সালে লড়াইয়ের ময়দানে ছিলেন মোজতবা। তখন সদ্য ১৮ বছরে পা দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, ওই সময় জোরকদমে ধর্মীয় উচ্চশিক্ষার পাঠ নেওয়া শুরু হয়নি তাঁর। তবে রণাঙ্গনে যাওয়ার সুবাদে সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণাধীন তেহরানের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির কমান্ডারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে মোজতবার।

০৭ ১৮

যুদ্ধ শেষের এক বছরের মাথায় মারা যান ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমিনি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আলি খামেনেই। এই সময় উচ্চশিক্ষার জন্যই কিছুটা আড়ালে চলে যান মোজতবা। ১৯৯৯ সালে ধর্মীয় উচ্চশিক্ষার পাঠ নিতে ভর্তি হন ইরানের মোজতাবা কোম সেমিনারিতে। আইআরজিসির কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ অবশ্য তাঁর থেকে গিয়েছিল। ২০০৪ সালে জাহরা হাদ্দাদ-আদেলকে বিয়ে করেন খামেনেই পুত্র।

০৮ ১৮

২০০৯ সালে তেহরানের ঘরোয়া রাজনীতিতে ‘মেগা এন্ট্রি’ নেন মোজতবা। ওই সময় জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে ওঠে ইরান। জনরোষ থামানোর দায়িত্ব দ্বিতীয় পুত্রের কাঁধেই তুলে দেন তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই। সঙ্গে সঙ্গেই বিক্ষোভ থামাতে আইআরজিসির অন্তর্গত ‘সাজমান-এ বাসিজ-এ মোস্তাজাফিন’ নামের ভাড়াটে বাহিনীকে রাস্তায় নামান মোজতবা। আন্দোলন স্তব্ধ করার নামে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠে নির্বিচারে গুলি চালানোর অভিযোগ।

০৯ ১৮

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিদেশে থাকা মোজতবার বিপুল সম্পত্তির কথা উল্লেখ করে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে মার্কিন গণমাধ্যম ‘ব্লুমবার্গ’। সেখানে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী লন্ডনে বিত্তশালীদের এলাকা হিসাবে পরিচিত বিখ্যাত ‘বিলিয়নেয়ার্স রো’-তে খামেনেই-পুত্রের একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি আছে। অধিকাংশই অবশ্য বেনামে কিনে রেখেছেন তিনি। কেবলমাত্র একটি বাড়িই নাকি আছে তাঁর নিজের নামে।

১০ ১৮

ব্লুমবার্গের ওই রিপোর্টের পর দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় হইচই। কয়েক দিনের মাথায় একই রকমের তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং ফরাসি সংবাদসংস্থা ‘লিবারেশন’। তাদের দাবি, উত্তর লন্ডনের ‘দ্য বিশপ্‌স অ্যাভিনিউ’ নামে একটি রাস্তা রয়েছে, যার চারপাশে চোখ রাখলে নজরে পড়বে একাধিক প্রাসাদোপম বাড়ি। সেগুলির অধিকাংশই খালি। রাস্তাটিতে প্রতিনিয়ত টহল দেয় সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীরা। মোজতবার সম্পত্তির বীজ নাকি ওই এলাকাতেই পোঁতা রয়েছে।

১১ ১৮

ব্লুমবার্গ আবার দাবি করেছে, ‘দ্য বিশপ্‌স অ্যাভিনিউ’তে বেশ কিছু ভুয়ো সংস্থা খুলে রেখেছেন খামেনেই-পুত্র। এর আড়ালে তেহরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাই হয়ে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট পর্যন্ত চলছে অর্থ পাচার। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সেই লেনদেনে নাকি সরাসরি জড়িত আছেন মোজতবা। পাশাপাশি, ইউরোপে বিলাসবহুল হোটেল এবং পশ্চিম এশিয়ায় একাধিক সম্পত্তির সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত বলে খবর।

১২ ১৮

২০১৯ সালে মোজতবার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে ১০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি মূল্যের ব্রিটিশ সম্পত্তি, দুবাইয়ের একটি ভিলা এবং ইউরোপ জুড়ে একাধিক বিলাসবহুল হোটেল। সম্পত্তিগুলি কেনার জন্য অর্থ নাকি পাঠানো হয়েছিল ব্রিটেন, সুইৎজ়ারল্যান্ড, লিখটেনস্টাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে। সে অর্থ মূলত ইরানি তেল বিক্রি করে পেয়েছেন তিনি।

১৩ ১৮

ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ২০১৪ সাল লন্ডনের একটি সম্পত্তি ৩ কোটি ৩৭ লক্ষ ইউরোয় কেনেন মোজতবা। ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডের মাঝে আইরিশ সাগরে অবস্থিত স্বশাসিত ব্রিটিশ নগরী ‘আইল অফ ম্যান’ এবং ক্যারিবিয়ানে নিবন্ধিত সংস্থাগুলি তাঁর হয়ে বিদেশে অর্থপাচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পরে সেই টাকা দিয়েই ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং মায়োরকার হোটেল-সহ ইউরোপ জুড়ে একাধিক সম্পত্তি ক্রয় করেন তিনি।

১৪ ১৮

গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ৫৭ বছর বয়সি ধনকুবের ইরানি ব্যাঙ্কার এবং ব্যবসায়ী আলি আনসারিকে নিষিদ্ধ করে ব্রিটিশ সরকার। তাঁর বিরুদ্ধে আইআরজিসিকে গোপনে আর্থিক মদত দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ইংরেজ গোয়েন্দাদের অনুমান, আনসারির নাম সামনে রেখে বিদেশে একাধিক সম্পত্তি কিনেছেন মোজতবা। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বা আমেরিকার কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।

১৫ ১৮

ওই ঘটনার পর আনসারির হয়ে বিবৃতি দেন তাঁর আইনজীবী। মোজতবার সঙ্গে তাঁর মক্কেলের কোনও সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন তিনি। যদিও তা মানতে নারাজ ইংরেজ তদন্তকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাঁদেরই এক জন ব্লুমবার্গকে বলেছেন, জার্মানি ও স্পেনের হোটেল বাদ দিলে লন্ডনে এক ডজনের বেশি সম্পত্তি রয়েছে খামেনেই-পুত্রের। এর অধিকাংশই আনসারি বা তাঁর ফার্মের নামে কেনা হয়েছে।

১৬ ১৮

মোজতবার বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছে ইরান। তবে তাঁকে খামেনেইয়ের উত্তরসূরি তথা সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে বেছে নেওয়া নিয়ে তেহরানের অন্দরে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। কারণ গোড়া থেকেই পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা করে এসেছে ইসলামীয় প্রজাতন্ত্র। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তার উল্টো সিদ্ধান্ত নিলে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার তীব্র আশঙ্কা যে থাকছে, তা বলাই বাহুল্য।

১৭ ১৮

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইহুদি বাহিনীর যৌথ অভিযানে তেহরানে প্রাণ হারান ৮৬ বছরের আলি খামেনেই। তার পর থেকেই ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, তা নিয়ে জল্পনা চলছিল। উঠে আসে বেশ কয়েকটি নাম। প্রাথমিক ভাবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি কাউন্সিল বা পরিষদ গঠন করা হয়। অন্তর্বর্তী সর্বোচ্চ নেতা হন আলিরেজ়া আরাফি। এ বার খামেনেই পুত্রকেই তাঁর উত্তরসূরি করল ওই উপসাগরীয় শিয়া মুলুক।

১৮ ১৮

ঘনিষ্ঠ সূত্র উল্লেখ করে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তিন সদস্যের কাউন্সিল ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ মোজতবাকে ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে বেছে নিয়েছে। ৫৬ বছরের মোজতবার হাতেই অঘোষিত ভাবে রয়েছে আইআরজিসির দায়িত্ব। তাদের চাপেই কি শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন তেহরানের শিয়া ধর্মগুরুরা? না কি যুদ্ধের মধ্যে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতেই তাঁকে দেওয়া হচ্ছে দায়িত্ব? উঠছে সেই প্রশ্নও।

সব ছবি: রয়টার্স, পিটিআই এবং সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement