গত এক বছরে দেশের অভ্যন্তরে একের পর এক জঙ্গিহামলা। তিন দিন আগে সেনাচৌকিতে আত্মঘাতী হামলায় ১৫ পাক সেনার মৃত্যু। নেপথ্যে হাত খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি)। আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী ও বন্দুকধারীরা প্রায় বিনা বাধায় সেনা চৌকি, পুলিশ কনভয়, এমনকি সামরিক প্রশিক্ষণ কলেজগুলিতেও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
যখন সৌদি আরবকে ‘রক্ষা’ করার জন্য পাকিস্তানি সৈন্যদের আকাশপথে সৌদি আরবে পাঠানো হচ্ছিল, ঠিক তখনই টিটিপি জঙ্গিরা পাকিস্তানি সামরিক চৌকিগুলি দখল করে সৈন্যদের নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল। আচমকা হামলা হওয়ায় জঙ্গিদের পাল্টা জবাব দেওয়ার সুযোগ পায়নি সেনা।
পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সীমান্তে দীর্ঘ দিন ধরেই সংঘর্ষ চলছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ সশস্ত্র সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। তার পর থেকে সীমান্তে অশান্তি লেগেই আছে। ঘরের দিকে নজর না দিয়ে পাকিস্তানের ইরান-আমেরিকার যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখে অবাক হয়েছিল ভারতীয় কূটনৈতিক মহল। ‘সিঁদুরে’ মার খেয়ে বিশ্বমহলে হালে পানি পাওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান, এমনটাই মনে করছে নয়াদিল্লি।
নিজের ঘর সামলাতে না পারলেও আন্তর্জাতিক আসরে নিজেদের শক্তিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে জাহির করার চেষ্টার ত্রুটি রাখছেন না পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ, পাক সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরেরা। পাকিস্তানের কথাতেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দরাজ ‘সার্টিফিকেটের’ পর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে ইসলামাবাদ, এমনটাই মত কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। আর সেটাই অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে নয়াদিল্লির।
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধে হঠাৎ করেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ইসলামাবাদ গত কয়েক মাসে নিজেদের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে পাক সেনাপ্রধান (এখন সর্বাধিনায়ক) আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে ডেকে মধ্যাহ্নভোজ খাইয়েছেন ট্রাম্প! জানিয়েছেন, শাহবাজ় এবং মুনিরের সঙ্গে কৌশলগত কথাবার্তা হয়েছে তাঁর। আবার সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব পাকিস্তানকেই দিয়েছে ইরান।
এক বছরে পাক প্রশাসন নিজেদের দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চাপে থাকলেও দেশের বাইরে এমন ‘সুসময়’ তাদের আর আসেনি, এমনটাই মনে করছে কূটনৈতিক শিবির। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরও ইসলামাবাদ সফল ভাবে আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্বাস করাতে পেরেছে যে ভারতকে সমুচিত জবাব দিয়েছে পাক ফৌজ। সেই ভাষ্যে কিছুটা হলেও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশ। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে তোষামোদ করার জন্য তাঁর ভারত-পাক মধ্যস্থতার দাবিকে নিজের পক্ষে কাজে লাগিয়েছে ইসলামাবাদ।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সৃষ্ট উত্তেজনার পর পাকিস্তান যে ভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন আদায় করতে পেরেছে, তা তাদের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। ট্রাম্প প্রশাসনের লেনদেন ভিত্তিক বিদেশনীতির সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান নিজেকে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসাবে প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা করে চলেছে। পাকিস্তানের বিদেশনীতি ক্রমাগত প্রমাণ করার চেষ্টা করছে, শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক সঙ্কট নিরসনেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে দেউলিয়া হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়ানো দেশ।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর শুধু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নয়, ট্রাম্পের পিঠ চাপড়ানি পেয়ে পাকিস্তানও সুপরিকল্পিত ভাবে তাদের সেনার ‘বিজয়’ প্রচার থেকে শুরু করে। ইজ়রায়েলের বিরোধিতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিতে তাদের অপ্রত্যাশিত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় সন্তুষ্ট আমেরিকা। সবশেষে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি। এ পর্যন্ত সব কিছুই পাকিস্তানের অনুকূলে ঘটছে।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে কূটনৈতিক দিকে ভারতকে ব্যাকফুটে ফেলে পাকিস্তান পশ্চিম এশিয়ার মাটিতে গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলছে। তাদের বিজয়ের প্রচার পুরোপুরি সফল। তবে এই আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সফলতার উল্টো পিঠে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়ে গিয়েছে। ঘরের মাঠে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ছে পাক প্রতিরক্ষা। আন্তর্জাতিক স্তরে পাকিস্তান যতই প্রশংসিত হোক না কেন, দেশের ভেতরে টিটিপি বা বালোচ বিদ্রোহীদের হামলা এবং চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট আরও ঘনীভূত হচ্ছে পাকভূমে।
দ্য ইউরেশিয়ান টাইম্সের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল টেররিজ়ম ইনডেক্স অনুযায়ী, পাকিস্তান প্রথম বারের মতো সন্ত্রাসবাদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এ বছর সন্ত্রাসবাদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ পাকিস্তান। সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত দেশগুলির তালিকার সূচকে এক নম্বরে স্থান পেয়েছে। সূচকটি চালু হওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই এটি সন্ত্রাসবাদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে স্থান পেয়ে আসছে।”
এই হামলাগুলির মধ্যে ৭৪ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ৬৭ শতাংশই ঘটেছে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বালোচিস্তানে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। বিদেশের মাটিতে ফাঁকা বুলি আওড়ালেও দেশের মাটিতে থাকা সন্ত্রাসবাদের বীজ উপড়ে ফেলতে ডাহা ফেল করেছে আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন পাক সেনাবাহিনী। ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করে আরও দুঃসাহসী, পরিশীলিত ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে টিটিপি ও বিএলএ-এর মতো সংগঠনগুলি, দাবি করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একাংশ।
চলতি বছরের শুরুতে বালোচিস্তানের রাজধানী কোয়টা ও বন্দর নগরী গোয়াদর-সহ অন্তত ন’টি জেলা জুড়ে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে পাক প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ। এই হামলায় থানা, ব্যাঙ্ক, বাজার এবং নিরাপত্তা চৌকিগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করে সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহী সংগঠনটি। ফল কয়েক ডজন অসামরিক নাগরিক ও সেনার মৃত্যু। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদে একটি শিয়া মসজিদে এক ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন-ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা শুধু অব্যাহতই থাকেনি। উল্টে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে, বিশেষ করে আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে, তা আরও তীব্র হয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি বাজাউর জেলায় জঙ্গিহামলা হয়। বাজাউর জেলারই একটি কলেজে কিছু দিন আগে আত্মঘাতী হামলা হয়েছিল। ঠিক একই কায়দায় পুলিশ চৌকিতে হামলা হয়। মারা যায় এক শিশু-সহ সাধারণ নাগরিক ও পুলিশকর্মী।
বালোচ বিদ্রোহীরা গোয়াদরের কাছে একটি কোস্ট গার্ড টহল দলের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তিন জন কর্মকর্তাকে হত্যা করে। কোনও পাকিস্তানি সামুদ্রিক জাহাজে বিএলএ-র হামলার এটিই ছিল প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা। দমনপীড়ন চালিয়েও বালোচ বিদ্রোহীদের এখনও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি ইসলামাবাদ। এই পরিস্থিতিতে পাক সেনাবাহিনীর ‘প্রতিবন্ধকতা’র কথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন সে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ।
একের পর এক জঙ্গিহামলার পর নাগরিকদের কাছে মুখ পুড়েছিল পাক সেনার। সেই ঘটনার পর পাক আইনসভার নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে আসিফ বলেন, “ভৌগোলিক ভাবে বালোচিস্তান পাকিস্তানের ৪০ শতাংশ স্থান জুড়ে রয়েছে। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা একটা জনবহুল শহরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত। আমাদের সেনারা সেখানে রয়েছে এবং তারা তাদের (সন্ত্রাসবাদী) বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করছে। কিন্তু তারা এত বড় একটা এলাকা পাহারা দেওয়ার ক্ষেত্রে শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী।’’
চলতি মাসে একের পর এক জঙ্গিহামলার খবর প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির গ্যাসবেলুনে ছিদ্র হতে শুরু করেছে পাকিস্তানের। ৭ মে, উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের একটি বাজারে মর্টারের গোলা আঘাত হানলে দুই শিশু-সহ ছ’জন নিহত আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের হাঙ্গু জেলার থাল এলাকায় ঘটেছে। ১০ মে, জঙ্গিরা খাইবার পাখতুনখাওয়ার একটি চেকপয়েন্টে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এবং পুলিশের ওপর গুলি চালায়, এতে অন্তত ১৫ জন নিহত এবং তিন জন আহত হন।
ঠিক তার দু’দিনের মধ্যেই ১২ তারিখ আবার কামড় বসায় জঙ্গিরা। বিস্ফোরকবোঝাই একটি তিন চাকার গাড়িতে থাকা এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হন ৩৪ জন। ঠিক তার দু’দিন পর বালোচিস্তানে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচ জন সেনা ও সাত জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। পাক সেনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল আধাসামরিক ফ্রন্টিয়ার কোরের সৈন্যদের গাড়ির উপর বিস্ফোরকের সাহায্যে হামলা শুরু করে জঙ্গিরা। এই হামলার জবাব দেয় সেনারা। এতে জঙ্গিদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। হামলায় দু’পক্ষেরই সদস্যের মৃত্যু হয়।
শেষ হামলার খবর পাওয়া গিয়েছে ১৫ মে। উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ট্রাক ঢুকিয়ে হামলা ও তার পর গুলিবর্ষণ করে জঙ্গিরা। নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালিয়ে অন্তত ন’জন আধাসামরিক সেনাকে খতম করে তারা। পেশোয়ারের এক ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা আধিকারিক সূত্রে খবর, হামলাকারীরা বিস্ফোরকবোঝাই গাড়িটি চৌকির দরজা দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞমহলের ধারণা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে তুলে ধরতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে পাকিস্তান। ঠিক তখনই দেশের ভেতরের উগ্রপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি এই কৌশলগত শূন্যতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে মাথাচা়ড়া দিয়ে উঠছে। ফলে সামনে থেকে লড়াই করা সেনাদল ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার হার নাটকীয় ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান সীমান্তের কাছাকাছি নিরাপত্তা জোরদার করতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে অতিরিক্ত চাপ নিতে হচ্ছে। অন্য দিকে আঞ্চলিক এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের ‘নেটওয়ার্ক’ পুনর্গঠন করার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।