chegg collapse

লালবাতি জ্বলল দেড় হাজার কোটির সাম্রাজ্যে, বিখ্যাত শিক্ষা-প্রযুক্তি সংস্থাকে চার বছরে ‘খেয়ে ফেলল’ চ্যাটজিপিটি!

মার্কিন এডুটেক জায়ান্ট চেগ-এর মূল ব্যবসাই ছিল শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের সমাধান দেওয়া। অতিমারির সময় অনলাইন শিক্ষার সাম্রাজ্যের লাগাম ছিল এই সংস্থার হাতে। ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি আসার পর এই ছবিটা সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে শুরু করে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ১১:১৪
Share:
০১ ১৮

করোনা অতিমারির সময় ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছিল মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাটির। কোভিডের থাবায় দুনিয়া জুড়ে স্কুল-কলেজের দরজা বন্ধ। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনলাইন পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে ক্লাসরুমের বিকল্প হয়ে উঠেছিল বিখ্যাত এডুটেক জায়ান্ট চেগ। ২০২১ সালে সংস্থাটির বাজারমূল্য প্রায় ১৫০০ কোটি ডলার ছুঁয়েছিল। মাত্র চার বছরেই সেই সাম্রাজ্য কার্যত ধ্বংসের মুখে।

০২ ১৮

দূরশিক্ষার চাহিদার জোয়ারে ভেসে চেগের তখন সোনালি দিন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে সংস্থার শেয়ারের দর ছিল ১১৩.৫ ডলার। গত এপ্রিলে সেই শেয়ারের দর নেমে দাঁড়িয়েছে ০.৯৯ ডলারে। ৯৯ শতাংশ পতন দেখা দিয়েছে স্টকের দরে।

Advertisement
০৩ ১৮

২০২৫ সালে সংস্থার বাজারমূল্য এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৬০ লক্ষ ডলারে। ২০২৫ সালের চতুর্থ ত্রৈমাসিকের ফলাফল অনুযায়ী, সংস্থাটির আয় ৭ কোটি ২৭ লক্ষ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৪৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকের ফলপ্রকাশের তথ্য বলছে সংস্থাটির বর্তমান মূল্য ৯ কোটি ডলার।

০৪ ১৮

চেগের এই করুণ পরিণতির একমাত্র কারণ হল কৃত্রিম মেধার বাড়বাড়ন্ত। প্রযুক্তির দুনিয়ায় জেনারেটিভ এআই-এর কারণে ধ্বংস হওয়া প্রথম কোনও বড় সংস্থার উদাহরণ হল চেগ। চেগ-এর এই পতন কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম দ্রুত এবং করুণ একটি অধ্যায়।

০৫ ১৮

১৫০০ কোটি ডলারের একটি টেক জায়ান্ট কী ভাবে শেয়ারবাজারের সর্বনিম্ন সীমা বজায় রাখার জন্য লড়াই করছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী, কোনও সংস্থার শেয়ারের দাম যদি একটানা ৩০টি কাজের দিনে ১ ডলারের নীচে থাকে, তবে স্টকমার্কেট থেকে ‘ডি-লিস্টিং’ বা বহিষ্কারের নোটিস ধরানো হয়। চেগ দেউলিয়া হওয়ার ঠিক প্রান্তসীমায় পৌঁছে গিয়েছিল।

০৬ ১৮

আশার কথা, চলতি বছরের মে মাসে সংস্থাটির শেয়ারের দাম সাময়িক ভাবে ১ ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পেরেছে বলে খবর। গত বছরের তুলনায় সংস্থার রাজস্ব ঘাটতি সামান্য হলেও কমেছে। চ্যাটজিপিটি, ক্লডের তাৎক্ষণিক উত্তর এবং গুগ্‌লের এআই সারাংশের চাপে চেগের প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলটি প্রায় বিলুপ্তির পথে।

০৭ ১৮

চেগের মূল ব্যবসাই ছিল শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের সমাধান দেওয়া। তারা প্রতি মাসে ১৪.৯৫ থেকে ১৯.৯৫ ডলারের সাবস্ক্রিপশনের বিনিময়ে পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন জটিল প্রশ্নের ধাপে ধাপে সমাধান সরবরাহ করত। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নোত্তর এবং পাঠ্যবইয়ের সম্পূর্ণ সমাধান, এই সাবস্ক্রিপশন প্ল্যানের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হত। ছাত্রছাত্রীদের হাতে শুধু তথ্য সরবরাহ করেই বিপুল সম্পদ অর্জন করেছিল তারা।

০৮ ১৮

কিন্তু ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি আসার পর এই ছবিটা সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে শুরু করে। বিনামূল্যের এআই চ্যাটবটগুলির দিকে ঝুঁকতে শুরু করে শিক্ষার্থীরা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জটিল গণিতের সমস্যা সমাধান করতে বা অ্যাসাইনমেন্টের উত্তর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দিতে শুরু করে এআই জেনারেটিভ। ফলে টাকা দিয়ে চেগের সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসে।

০৯ ১৮

২০২৩ সালের মে মাসে চ্যাটজিপিটি চালু হওয়ার মাত্র পাঁচ মাস পর চেগের তৎকালীন সিইও ড্যান রোজনসওয়েগ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একটি বৈঠকে প্রথম বার এই সমস্যা নিয়ে মুখ খোলেন। তিনি জনসমক্ষে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে চ্যাটজিপিটির কারণে নতুন গ্রাহক বা সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে।

১০ ১৮

জেনারেটিভ এআই-এর কারণে কোনও সংস্থার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি। এই খবরের পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চেগের শেয়ারের দাম ৪৮ শতাংশ পড়ে যায় এবং ১০০ কোটি ডলারের বাজারমূল্য নিমেষে উধাও হয়ে যায়।

১১ ১৮

শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবট নয়, আক্রমণ আসতে থাকে সার্চ ইঞ্জিনের দিক থেকে। দ্বিমুখী লড়াইয়ে পাল্লা দিতে হয় চেগকে। আগে শিক্ষার্থীরা গুগ্‌লে কোনও বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন লিখে সার্চ করলে চেগের ওয়েবসাইটের লিঙ্ক আসত। সেখানে ক্লিক করে উত্তরের খোঁজে শিক্ষার্থীরা চেগে সাবস্ক্রিপশন নিত।

১২ ১৮

কিন্তু গুগ্‌ল তার সার্চ ইঞ্জিনে এআই-এর মাধ্যমে সরাসরি উত্তর দেখানো শুরু করার পর, শিক্ষার্থীদের আর অন্য কোনও ওয়েবসাইটে ক্লিক করে যাওয়ার প্রয়োজনই পড়ছে না। ফলে চেগের ওয়েবসাইটে আসার মূল রাস্তাই বন্ধ।

১৩ ১৮

সংস্থাটি সম্প্রতি গুগ্‌লের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এই যুক্তিতে যে সার্চ ফলাফলের শীর্ষে থাকা এআই-নির্মিত সারসংক্ষেপগুলি তাদের ট্র্যাফিক বা গ্রাহক চুরি করছে। সার্চ পেজেই শিক্ষার্থীদের সরাসরি উত্তর দেখিয়ে দেওয়ায় চেগের ওয়েবসাইটে কেউ ঢুকছেন না। ঘুরিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে গুগ্‌ল, এই অভিযোগ তুলে আইনি পথে হেঁটেছে চেগ।

১৪ ১৮

পরিস্থিতি সামাল দিতে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘চেগমেট’ নামে নিজস্ব একটি এআই চ্যাটবট তৈরি করার চেষ্টা করেছিল চেগ। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো বিনামূল্যের এআই সহায়তা পেতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে ছাত্রছাত্রীরা।

১৫ ১৮

একটি ‘হোমওয়ার্ক হেল্প’ সাইট থেকে রূপান্তর করে সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর একটি লার্নিং প্ল্যাটফর্ম হিসাবে পুনর্গঠন করার শেষ চেষ্টা শুরু করে চেগ। কিন্তু তাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি এডুটেক জায়ান্টটি। শিক্ষার্থীরা চেগ-এ টাকা দিয়ে এআই সহায়তা পরিষেবা ব্যবহার করার কোনও যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি।

১৬ ১৮

ব্যবসায় টিকতে না পেরে গত কয়েক বছরে চেগকে একের পর এক বড় ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। কোম্পানিটি তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ৪৫ থেকে ৬৭ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক অফিসগুলি বন্ধ করে দেয়। কর্মীসংখ্যা প্রায় ৪ ভাগের ১ ভাগে নামিয়ে এনে খরচ নাটকীয় ভাবে কমিয়ে ফেলে। এই পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের মনে সাময়িক কিছুটা স্বস্তি দেয়।

১৭ ১৮

২০২১ সালের শুরুতে, ডিজিটাল ক্লাসরুমের জগতে চেগের ছিল একচ্ছত্র রাজত্ব। কয়েক বছর ধরে চেগ লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর প্রশ্নের সমাধান তৈরি করতে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, এই বিশাল এবং নিখুঁত ডেটাবেসটিই ব্যবসার মূল রক্ষাকবচ, যা অন্য কোনও প্রতিযোগী সহজে নকল করতে পারবে না।

১৮ ১৮

কিন্তু লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এসে প্রমাণ করে দিল যে, এআই-এর যুক্তি তৈরি করার এবং তাৎক্ষণিক ভাবে সমাধান দেওয়ার ক্ষমতা মানুষের তৈরি যে কোনও তথ্যভান্ডারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সাশ্রয়ী।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement