China Australia Clash on Darwin Port

লিজ়ে নেওয়া বন্দর ফেরাতে বলায় দেখে নেওয়ার হুঙ্কার, ক্যাঙারুর দেশের বিরাট এলাকা ‘গিলতে’ বসেছে ড্রাগন!

৯৯ বছরের লিজ়ে ডারউইন বন্দর চিনা সংস্থার হাতে তুলে দেয় অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট বন্দরটি ফেরত পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ক্যানবেরা। অন্য দিকে পাকাপাকি ভাবে এলাকাটি গিলে ফেলতে পাল্টা হুঙ্কার ছেড়েছে ড্রাগন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫২
Share:
০১ ১৮

অরুণাচল প্রদেশ থেকে ভ্লাদিভস্তক। তাইওয়ান হোক বা জাপানি দ্বীপ। সুযোগ পেলেই প্রতিবেশীর বিশাল এলাকা কব্জা করতে কোমর বেঁধে লেগে পড়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না)। এ ব্যাপারে ‘দুরাত্মা’ বেজিঙের ছলের অভাব নেই। আর তাই কখনও স্থল, কখনও আবার নৌবহর পাঠিয়ে আশপাশের দেশগুলিকে চমকানোর ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে ড্রাগনের লালফৌজের বিরুদ্ধে। এ-হেন মান্দারিনভাষীদের ‘দৌরাত্ম্যের’ এ বার শিকার হল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ক্যানবেরা তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় জটিল হয়েছে পরিস্থিতি।

০২ ১৮

চিন-অস্ট্রেলিয়া সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বন্দর, নাম ডারউইন। একসময় তা লিজ়ে বেজিঙের সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ক্যানবেরা। বর্তমানে এর জন্য হাত কামড়াচ্ছেন ক্যাঙারু দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টোনিও অ্যালবানিজ়। কারণ, সংশ্লিষ্ট বন্দরটিকে আর হাতছাড়া করতে চাইছে না ড্রাগন। শুধু তা-ই নয়, অসি সরকার লিজ় চুক্তির শর্ত দেখিয়ে ডারউইনে পা রাখার চেষ্টা করলে ‘ফল ভাল হবে না’ বলে হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দিয়েছে মান্দারিনভাষীরা। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে চড়ছে পারদ।

Advertisement
০৩ ১৮

কেন হঠাৎ লিজ় নেওয়া ডারউইনকে কব্জা করতে চাইছে চিন? বিশ্লেষকেরা বন্দরটির কৌশলগত অবস্থানকেই এর জন্য প্রধানত দায়ী। অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটোরির অন্তর্ভুক্ত ডারউইনকে এক দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘প্রবেশদ্বার’ বলা যেতে পারে। সেখান থেকে ইন্দোনেশিয়া ও তিমোর-লেস্তের মতো দেশগুলিতে পণ্য আমদানি-রফতানি করার বেশ সুবিধা রয়েছে। তা ছাড়া ডারউইন হাতে থাকলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় প্রভাব বাড়িয়ে ড্রাগন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে, তা বলাই বাহুল্য।

০৪ ১৮

দ্বিতীয়ত, ডারউইন শুধুমাত্র একটি সমুদ্র-বন্দর নয়। একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আস্ত একটি শহর, যাকে নর্দার্ন টেরিটোরির রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়েছে অসি প্রশাসন। ফলে ডারউইন পাকাপাকি ভাবে চিনের দখলে গেলে ওই শহরের উপরেও যে ক্যানবেরার নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর তাই পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের জায়গা ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ক্যাঙারু প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজ়, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

০৫ ১৮

প্রায় এক দশক আগে ডারউইনের ব্যাপারে প্রথম বার ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নেয় অসি প্রশাসন। ওই সময় ৯৯ বছরের লিজ়ে সংশ্লিষ্ট বন্দরটিকে চিনা ধনকুবের ইয়ে চেঙের মালিকানাধীন সংস্থা ল্যান্ডব্রিজ় গ্রুপের হাতে তুলে দেয় ক্যানবেরা। লিজ় চুক্তির সালটি ছিল ২০১৫। এই সমঝোতা থেকে রোজগার বাড়াতে চেয়েছিল ক্যাঙারু দেশের সরকার। কারণ, ৯৯ বছরের লিজ়ের জন্য ৩৫ কোটি ডলার দিতে রাজি হয় ড্রাগনের শানডং প্রদেশের ল্যান্ডব্রিজ গ্রুপ।

০৬ ১৮

ডারউইনকে নিয়ে ক্যানবেরার তৎকালীন শাসকদের যুক্তি ছিল, লিজ়ের টাকায় দিব্যি চালানো যাবে বন্দর সম্প্রসারণের কাজ। বাকি অর্থ অস্ট্রেলিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজ় সেই রাস্তা থেকে পুরোপুরি সরে এসেছেন। আর তাই দেশীয় সংস্থার মাধ্যমে ডারউইন বন্দর পরিচালনা করতে চাইছেন তিনি। ফলে চিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ক্রমশ চও়ড়া হচ্ছে ফাটল।

০৭ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বছরের (২০২৫ সাল) মে মাসে জাতীয় নির্বাচনের সময় ডারউইনের প্রসঙ্গ তুলে প্রচারে ঝড় তোলেন অ্যালবানিজ়। ক্ষমতায় গেলে সংশ্লিষ্ট বন্দরটি থেকে চিনা সংস্থাকে তাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। ফলে তখন থেকেই লিজ় চুক্তি বাতিল করার হাওয়া ক্যাঙারু দেশে উঠতে শুরু করে। গোটা বিষয়টির উপর কড়া নজর রাখলেও ওই সময় এই নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি বেজিং।

০৮ ১৮

গত বছরের (২০২৫ সাল) জুলাইয়ে চিনসফরে যান অ্যালবানিজ়। তত দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে বেজিং। ফলে পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে অসিদের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়ার কোনও চেষ্টা করেনি মান্দারিনভাষীরা। উল্টে অ্যালবানিজ়ের সঙ্গে লম্বা সময় ধরে বৈঠক করেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জ়িনপিং। সেখানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যবৃদ্ধির ব্যাপারে দুই রাষ্ট্রনেতাকে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গিয়েছিল।

০৯ ১৮

বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই মনে করেন, অ্যালবানিজ় চিন সফর করলেও প্রেসিডেন্ট শি-কে তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলেন এমনটা নয়। ফলে ডারউইনের ব্যাপারে পুরনো অবস্থান থেকে সরে যাননি অসি প্রধানমন্ত্রী। আর তাই বেজিং থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পরই লিজ় প্রাপ্ত ড্রাগন সংস্থাটিকে ওই বন্দর থেকে তাড়াতে উঠেপড়ে লাগে ক্যাঙারু দেশের প্রশাসন, যাকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি মান্দারিনভাষী জিনপিঙের সরকার।

১০ ১৮

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়াকে ঘিরতে বেপরোয়া ভাবে চিনা নৌবহর ফিলিপিন্স সাগরের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বলে খবর প্রকাশ্যে চলে আসে। তা শোনামাত্রই ক্যাঙারুভূমিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় উপগ্রহভিত্তিক ছবি প্রকাশ্যে এনে বেজিঙের ব্যাপারে ক্যানবেরাকে সতর্ক করে ‘ভ্যান্টর’ নামের যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ফলে ড্রাগন যে ‘আস্তিনে লুকোনো সাপ’ তা বুঝতে অ্যালবানিজ়ের এতটুকু দেরি হয়নি।

১১ ১৮

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২ ডিসেম্বর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অস্ট্রেলিয়ার দিকে এগিয়েছিল ফিলিপিন্স সাগরে মোতায়েন চিনা নৌবহর। গুপ্তচর উপগ্রহ সেই ছবি পাঠাতেই নড়েচড়ে বসে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ‘ভ্যান্টর’। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দু’টি রণতরী এবং সামরিক হেলিকপ্টার বহনকারী যুদ্ধজাহাজ সহযোগে ‘শিকারি বেড়ালের’ মতো ধীরে পায়ে ক্যাঙারু রাষ্ট্রকে ঘেরার ছক কষেছিল বেজিঙের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ নৌবাহিনী। জ্বালানির প্রয়োজন মেটাতে একটি তেলবাহী জাহাজও সঙ্গে রেখেছিল তারা।

১২ ১৮

আমেরিকার থেকে চৈনিক আগ্রাসনের খবর পেয়ে সতর্ক হয় অস্ট্রেলিয়া। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন ক্যানবেরার প্রতিরক্ষা প্রধান অ্যাডমিরাল ডেভিড জনস্টন। পিএলএ-র ওই নৌবহরে চারটি রণতরী রয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি, যার মধ্যে ছিল একটি রেনহাই শ্রেণির ক্রুজ়ার। এ ছাড়া ছিল জিয়াংকাই শ্রেণির একটি ফ্রিগেটও। প্রথমটি প্রকৃতপক্ষে টাইপ ০৫৫ ডেস্ট্রয়ার এবং দ্বিতীয়টি একটি টাইপ ০৫৪এ ফ্রিগেট। এই দুই যুদ্ধজাহাজ গাইডেড-ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সক্ষম বলে জানা গিয়েছিল।

১৩ ১৮

অস্ট্রেলিয়ার জলসীমা সংলগ্ন এলাকায় চৈনিক রণতরীর উপস্থিতির খবর পেয়েই পি-৮ নজরদারি বিমান পাঠান অ্যাডমিরাল জনস্টন। পরে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘২ ডিসেম্বর প্রায় ৫০০ নটিক্যাল মাইল উত্তরে ফিলিপিন্স সাগরে পৌঁছে কয়েক ঘণ্টা চক্কর কেটেছিল আমাদের সামরিক উড়োজাহাজ। ফলে পিএলএ যুদ্ধজাহাজ কখন, কোন দিকে বাঁক নিচ্ছে, তা বুঝতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ওই এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে ড্রাগন, যা অবশ্যই উদ্বেগের।’’

১৪ ১৮

বেজিং অবশ্য অকারণে গোটা বিষয়টিকে নিয়ে জলঘোলা করা হচ্ছে বলে পাল্টা বিবৃতি দিয়েছিল। শি প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, আন্তর্জাতিক আইন মেনে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন রয়েছে পিএলএ নৌবাহিনী। কোনও দেশের উপর হামলার পরিকল্পনা নেই তাদের। এই আবহে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পীত সাগরের (ইয়েলো সি) দক্ষিণ অংশ, পূর্ব চিন সাগর, দক্ষিণ চিন সাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সব মিলিয়ে শতাধিক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল চিন।

১৫ ১৮

ডিসেম্বরের ঘটনার পর ডারউইন বন্দর ফেরত পেতে বেজিঙের সংস্থার উপর চাপ বাড়ায় অ্যালবানিজ় প্রশাসন। এর পরই বিষয়টি নিয়ে ক্যানবেরাকে হুঁশিয়ারি দেন সেখানকার চিনা রাষ্ট্রদূত জ়িয়াও কিয়ান। গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘‘আপনার টাকার দরকার ছিল। তাই বিদেশি সংস্থাকে বন্দর লিজ়ে দিয়ে মোটা অর্থ রোজগার করতে চেয়েছিলেন। শর্ত মেনে আমরা সেই টাকাও দিয়েছি। এখন আপনি হঠাৎ করে সেটা ফেরত চাইতে পারেন না।’’

১৬ ১৮

এই পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া যদি গায়ের জোরে ওই বন্দর ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করে তা হলে বেজিং যে চুপ করে বসে থাকবে না তা স্পষ্ট করেছেন চিনা রাষ্ট্রদূত। তাঁর কথায়, ‘‘দেশীয় সংস্থার স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। কোনও অবস্থাতেই আমরা ল্যান্ডব্রিজের লোকসান সহ্য করব না। এর জন্য প্রয়োজনে চরম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে আমাদের সরকার।’’

১৭ ১৮

ডারউইনের লিজ় চুক্তি ভেঙে গেলে চিন কি সরাসরি আক্রমণ করবে অস্ট্রেলিয়া? রাষ্ট্রদূত কিয়ান অবশ্য সেই প্রশ্নের জবাব দেননি। অন্য দিকে এই ইস্যুতে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজ়। তিনি বলেছেন, ‘‘জাতীয় স্বার্থে ওই বন্দর ফেরত পাওয়া খুবই প্রয়োজন।’’ বেজিঙের হুমকিকে অবশ্য সে ভাবে পাত্তা দেননি তিনি।

১৮ ১৮

চলতি বছরে জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে কব্জা করতে চাইছেন তিনি। আগামী এপ্রিলে চিন সফরে যাওয়ার কথা আছে তাঁর। এই পরিস্থিতিতে ডারউইন কাঁটা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে যে বেশ জটিল করল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement