বার বার গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি। সেই সঙ্গে যখন-তখন চড়া হারে শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া। সামরিক খাতে খরচ বাড়ানোর চাপ। মার্কিন প্রেসি়ডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পাগলামি’তে নাকের জলে চোখের জলে পশ্চিম ইউরোপ। এ-হেন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে চরম শিক্ষা দিতে ‘ডলার খুনের’ ছক কষছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ? ভারতের সঙ্গে মেগা বাণিজ্যচুক্তিতে ২৭ দেশের সংগঠনটি সই করতেই এই নিয়ে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা। সংশ্লিষ্ট সমঝোতাটিকে ইতিমধ্যেই ‘মাদার অফ অল ডিল্স’ বা সমস্ত চুক্তির জননী বলে উল্লেখ করেছে দু’পক্ষ।
বিশ্লেষকদের দাবি, ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকার শক্তি শুধুমাত্র সৈন্যক্ষমতায় লুকিয়ে আছে, এমনটা নয়। বরং এর মূল চাবিকাঠি হল ডলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে এই মার্কিন মুদ্রা। গোড়ার দিকে একে সোনার সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তির পর অপরিশোধিত খনিজ তেলের সঙ্গে ডলারকে জুড়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ফলে রাতারাতি ওয়াশিংটনের মুদ্রা হয়ে ওঠে পেট্রো-ডলার। বর্তমানে চালু থাকা সেই ব্যবস্থাই আমূল পাল্টে ফেলবে ইইউ? উঠছে প্রশ্ন।
গত ৭৬ বছরে আন্তর্জাতিক লেনদেনের পুরোটাই ডলারে হওয়ায় আমেরিকার উপর মারাত্মক ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে পশ্চিম ইউরোপ। কারণ, খনিজ তেল-সহ যাবতীয় বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বিদেশি মুদ্রাভান্ডারে বিপুল পরিমাণে মার্কিন মুদ্রা রাখতে হচ্ছে তাদের। এর জেরে জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চোখরাঙানি’ও সহ্য করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। পরিস্থিতি বদলাতে ১৯৯৯ সালে ইউরো নামের মুদ্রা বাজারে আনে ওই ২৭ দেশের সংগঠন। কিন্তু, তার পরেও হাওয়া ঘোরাতে ইইউ যে সফল হয়নি, তা বলাই বাহুল্য।
বর্তমানে সারা বিশ্বের বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের প্রায় ৬০ শতাংশের উপর রয়েছে ডলারের দখলদারি। সেখানে মাত্র ২০ শতাংশ জায়গা পেয়েছে ইউরো। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, ট্রাম্পের ‘দৌরাত্ম্য’ বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট মুদ্রাটিকে আরও শক্তিশালী করার রাস্তায় ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ফলে আগামী দিনে লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে পারে মার্কিন মুদ্রার বাজারদর, যা নিঃসন্দেহে ওয়াশিংটনের অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দেবে, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে ইউরোকে শক্তিশালী করার একাধিক তাস রয়েছে, যার শুরুটা ভারতের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তিকে সামনে রেখে করতে পারে তারা। সমঝোতা অনুযায়ী, নয়াদিল্লির থেকে বিপুল পরিমাণে পরিশোধিত পেট্রোপণ্য কিনবে আটলান্টিকের পারের ওই ২৭টি দেশ। স্থানীয় মুদ্রায় এর লেনদেন হলে পেট্রো-ডলারের বিকল্প হিসাবে ইউরো যে উঠে আসবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। দ্বিতীয়ত, ইইউয়ের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ করিডর (আইএমইইসি) প্রকল্প।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরোপ ও এশিয়ায় পণ্য লেনদেনের বিকল্প পথ হিসাবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির বাস্তবায়নে সম্মত হয় জি২০-ভুক্ত সমস্ত দেশ। এর মধ্যে ছিল ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইটালির মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় খেলোয়াড়েরা। আইএমইইসি-র বড় অংশই উপসাগরীয় আরব দেশগুলির উপর দিয়ে যাবে। ফলে এর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার সুযোগ পাচ্ছে ইইউ। একে কাজে লাগিয়ে সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে ইউরোয় তরল সোনা কেনার চুক্তি সারতে পারে তারা।
পশ্চিমি আর্থিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের মুদ্রায় অপরিশোধিত খনিজ তেল কেনার চুক্তি সারলে বিশ্ব জুড়ে গুরুত্ব হারাবে পেট্রো-ডলার। তখন অনেক দেশই বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারে মার্কিন অর্থ রাখার পরিমাণ কমাতে পারে। ইতিমধ্যেই তা শুরু হয়ে গিয়েছে বলা যেতে পারে। গত কয়েক বছরে ভারত-সহ ইউরোপীয় দেশগুলিকে সোনা কেনায় জোর দিতে দেখা গিয়েছে। ফলে বিশ্বমুদ্রার ফের হলুদ ধাতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্পষ্ট করেছেন তাঁরা।
তৃতীয়ত, মার্কিন ট্রেজ়ারি বন্ড বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারকে দুর্বল করতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। দীর্ঘ দিন ধরেই বিপুল ঘাটতিতে চলছে আমেরিকার অর্থনীতি। ফলে সরকার চালাতে ক্রমাগত অন্যান্য দেশের থেকে ধার নিতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। এত দিন আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড বিক্রি করে দিব্যি সেই অর্থ সংগ্রহ করে আসছিল সেখানকার ট্রেজ়ারি দফতর (ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রেজ়ারি)। এর ২৫ শতাংশের উপর রয়েছে পশ্চিম ইউরোপীয় ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির সরকারের দখলদারি।
গোদের উপর বিষফোড়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় বন্ডের হেজ় তহবিল, বিমা এবং পেনশনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে সর্বাধিক লগ্নি করেছে ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশ। কারণ, এত দিন ডলারে বিনিয়োগকে সবচেয়ে সুরক্ষিত বলে মনে করা হচ্ছিল। আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির কাছে ডলার ও বন্ড সমার্থক হওয়ায়, দ্বিতীয়টিতে দেদার লগ্নি করেছে তারা। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ঋণ পাওয়ার বিষয়টিকেও নিশ্চিত করতে পেরেছে আমেরিকার নেটো ‘বন্ধু’রা।
এ-হেন মার্কিন বন্ড পশ্চিম ইউরোপের কাছে ‘সুরক্ষিত স্বর্গ’ (সেফ হেভেন) হয়ে ওঠায় বিপদ বেড়েছে আমেরিকার। বিশেষজ্ঞদের কথায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে ট্রাম্প নাছোড়বান্দা অবস্থান নিলে, ওই সমস্ত বন্ড বিক্রি করে বাজার থেকে টাকা তোলা শুরু করতে পারে ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশ। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মাথায় বাজ পড়বে বললেও অত্যুক্তি হবে না। ট্রেজ়ারি বন্ডের থেকে পশ্চিম ইউরোপ পুরোপুরি মুখ ফেরালে দেউলিয়াও হতে পারে ওয়াশিংটন।
২০০৯ সালে ব্রাজ়িল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও সাউথ আফ্রিকা ব্রিকস নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলে। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০। দীর্ঘ দিন ধরেই সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর একটি একক মুদ্রা চালু করতে চাইছে মস্কো। যদিও নয়াদিল্লি-বেজিং সীমান্ত সংঘাত-সহ অন্যান্য সমস্যার জেরে তা এখনও বাস্তবের মুখ দেখেনি। তবে আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট মুদ্রাটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। একে মান্যতা দিতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাতে দুনিয়া জুড়ে ডলারের ‘দাদাগিরি’ যে অনেকটাই কমে যাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতসফরে আসবেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ। ব্রিকসকে নিয়ে ইতিমধ্যেই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘গত শতাব্দীর ঠান্ডা লড়াইয়ের (কোল্ড ওয়ার) মতো এখন আর শক্তির ভরকেন্দ্র দুই মেরুতে আটকে নেই। তাই আমাদের চিন বা ব্রিকসের মতো গোষ্ঠীর ব্যাপারে ছুতমার্গ রাখলে চলবে না। বরং তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যবৃদ্ধির ব্যাপারে নজর দেওয়াই হল বুদ্ধিমানের কাজ।’’
বিশ্বের সেরা সাতটি অর্থনীতির দেশকে নিয়ে গড়ে উঠেছে জি-৭ নামের গোষ্ঠী। ইইউ-এর অন্তর্ভুক্ত ফ্রান্সও এর অন্যতম সদস্য। এ-হেন জি-৭-এর সঙ্গে ব্রিকসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠুক, চাইছেন মাকরঁ। বহু বার এ কথা প্রকাশ্যেই বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। এ বছর নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের রাষ্ট্রনেতাদের বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। সেখানে যোগ দিতে ফের ভারতে আসতে পারেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সংশ্লিষ্ট সম্মেলনের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আগাম শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মাকরঁ।
চতুর্থত, অনেকেই মনে করেন ট্রাম্পের শুল্কনীতির জেরে আমেরিকার উপর বিশ্বাস হারিয়েছে তার ‘বন্ধু’রাও। ফলে ভারতের মতোই ইইউ-ভুক্ত দেশগুলি জোর দিয়েছে সোনা কেনায়। আগামী দিনে কোনও আন্তর্জাতিক মুদ্রা ফের হলুদ ধাতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে কপাল পুড়বে পেট্রো-ডলারের। কারণ মার্কিন মুদ্রার পক্ষে রাতারাতি অপরিশোধিত তেলের থেকে সরে এসে সোনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। ফলে এর দামের পতন ঠেকানো ওয়াশিংটনের পক্ষে মুশকিল হতে পারে।
তবে ট্রাম্পকে শিক্ষা দিতে ইইউ এই ধরনের পরিকল্পনা করলে, তা বাস্তবায়িত করা একেবারেই সহজ নয়। কারণ, খোলা বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজ়ারি বন্ড বিক্রি করলে ২৭ দেশের সংগঠনটির আর্থিক লোকসান হতে পারে। তা ছাড়া ইউরোকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেন, রাশিয়া, চিন বা ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলির প্রবল আপত্তি রয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার আরব দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শিকড় অত্যন্ত মজুবত। সৌদি আরব ও কাতার-সহ সেখানকার একাধিক দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির পক্ষে পেট্রো-ডলার ত্যাগের ঘোষণা করা একেবারেই সহজ নয়। আইএমইইসি প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হল ইজ়রায়েল। জন্মলগ্ন থেকে ইহুদিভূমিটির সঙ্গে আমেরিকার ‘লৌহ হৃদয়’ বন্ধুত্ব রয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
ব্রিকস মুদ্রা চালু হওয়ার বিষয়টিও যথেষ্ট অনিশ্চিত। এ ব্যাপারে আপত্তির কথা খোলাখুলি ভাবে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ফলে এখনই যে একক মুদ্রা চালু করা হচ্ছে না, তা স্পষ্ট করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। তবে স্থানীয় মুদ্রায় আমদানি-রফতানিতে জোর দিচ্ছেন তিনি। তবে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে এ ব্যাপারে মস্কো কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।
এই ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন মুদ্রাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অন্যতম সদস্য রাষ্ট্র জার্মানির কাছে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় স্বর্ণভান্ডার, যেটা প্রায় ৩,৩৫২ টন। ফলে হলুদ ধাতুর সঙ্গে সম্পৃত্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে আনার ব্যাপারে জোর দিতে পারে তারা। সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে মার্কিন নির্ভরশীলতা কাটানোর চেষ্টা করছে ইইউ। ভারতের সঙ্গে চুক্তিতে একাধিক প্রতিরক্ষা সমঝোতা করেছে তারা, খবর সূত্রের।