শুধুমাত্র সামরিক ঘাঁটি ও খনিজ তেলের শোধনাগার নয়। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে এ বার ইরানের নিশানায় গুগ্ল বা অ্যামাজ়নের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক টেক জায়ান্ট। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইতিমধ্যেই তাদের কৃত্রিম মেধার (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) তথ্যভান্ডার বা ডেটা সেন্টারগুলিকে ওড়ানোর চেষ্টা করেছে তেহরান। লড়াইয়ের মধ্যে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ লক্ষ্যবস্তু বদলে ফেলায় প্রমাদ গুনছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক জায়ান্ট অ্যামাজ়ন জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে অন্তত দু’বার সংযুক্ত আরব আমিরশাহির রাজধানী আবু ধাবির এআই ডেটা সেন্টারে আছড়ে পড়ে ইরানি ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) শাহিদ ড্রোন। এর জেরে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তথ্যভান্ডারটির কার্যালয়ের একাংশ। হামলার সময় সেখানে আগুন ধরে যায়। ফলে দীর্ঘ সময় পরিষেবা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় তারা। একই ছবি দেখা গিয়েছে অন্যান্য আরব রাষ্ট্রেও।
কাতারের গণমাধ্যম আল জ়াজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাহারিন এবং আমিরশাহি মিলিয়ে অ্যামাজ়নের মোট ছ’টি এআই ডেটা সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে তিনটিকে ধ্বংস করার মরিয়া চেষ্টা চালায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেইয়ের নেতৃত্বাধীন ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। যদিও তাতে পুরোপুরি সাফল্য পায়নি তাঁরা। পরিষেবা ব্যাহত হলেও এখনও কর্মক্ষম রয়েছে কৃত্রিম মেধার ওই সমস্ত তথ্যভান্ডার।
অ্যামাজ়ন ছাড়াও পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলিতে গুগ্ল ও মাইক্রোসফ্টের মতো মার্কিন টেক জায়ান্টগুলির একাধিক এআই ডেটা সেন্টার রয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের কথায়, আইআরজিসির কমান্ডারদের পক্ষে সেগুলিকে নিশানা করা খুবই সহজ। কারণ, বিরাট এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠেছে ওই সমস্ত তথ্যভান্ডার। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনও ভাবেই সেগুলিকে আড়াল করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া, কৃত্রিম উপগ্রহের পাঠানো ছবিতেও দিব্যি ধরা পড়ে এআই ডেটা সেন্টার।
তৃতীয়ত, কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডার থেকে সব সময় তাপ নির্গত হতে থাকে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এর জেরে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে নিয়ে আক্রমণ শানাতে পারছেন আইআরজিসির কমান্ডারেরা। আল জ়াজিরার দাবি, ইরানি হামলায় আমিরশাহির দু’টি এআই ডেটা সেন্টারের পরিকাঠামো একরকম ভেঙে পড়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে দুবাই ও আবু ধাবির ব্যাঙ্কিং, ট্যাক্সি ও অনলাইন ফুড ডেলিভারির মতো মোবাইল ফোনের অ্যাপভিত্তিক যাবতীয় পরিষেবা।
এই ইস্যুতে অবশ্য যাবতীয় প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছেন মার্কিন যুদ্ধসচিব (ওয়ার সেক্রেটারি) পিট হেগসেথ। একটি বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘‘কৃত্রিম মেধার দুনিয়ায় আমরা প্রথম স্থান পেতে চাই। এই প্রযুক্তি বহুল পরিমাণে ব্যবহার করছে আমেরিকার ফৌজ। তবে বিষয়টা এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গায় রয়েছে। এখানে আরও উন্নতির সুযোগ থাকায় আমরা সে দিকে নজর দিচ্ছি।’’
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, আরব দুনিয়ার এআই ডেটা সেন্টারগুলিকে নিশানা করার নেপথ্যে ইরানি আইআরজিসির একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, যুদ্ধের গোড়ার দিকে তেহরানের ব্যাঙ্কিং পরিকাঠামোকে নিশানা করে মার্কিন ও ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনী। তাদের যৌথ সামরিক অভিযানে সেই পরিষেবার কিয়দংশ নষ্ট গিয়েছে। এর প্রতিশোধ নিতে পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডারগুলি ওড়ানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।
দ্বিতীয়ত, গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন সেনাকে কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে অ্যামাজ়ন-সহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক নামী-দামি টেক জায়ান্ট। ইরান যুদ্ধেও তার অন্যথা হয়নি। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি একযোগে তেহরানে হামলা চালায় আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। সেই আক্রমণে প্রাণ হারান ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। ওই দিন নিশানা নির্বাচনে সাহায্য করেছিল এআই।
২৮ তারিখ আলি খামেনেইয়ের পাশাপাশি আইআরজিসির একগুচ্ছ শীর্ষ অফিসারকে উড়িয়ে দেয় ইহুদি ও মার্কিন সেনা। লড়াইয়ের গোড়ায় এ-হেন সাফল্যে যথেষ্ট উচ্ছ্বসিত ছিল ওয়াশিংটন। যদিও যুদ্ধের ময়দানে এআইয়ের ব্যবহার কিছুটা ‘বুমেরাং’ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। কৃত্রিম মেধার নিশানা নির্বাচনের ‘ভুলে’ মেয়েদের একটি স্কুলে হামলা চালিয়েছে আমেরিকার ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র। ফলে ৭-১২ বছর বয়সি ১৫০ পড়ুয়ার মৃত্যু হয় সেখানে।
এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী’ চেহারাকে আন্তর্জাতিক ম়ঞ্চে তুলে ধরতে নিহত স্কুলছাত্রীদের কফিনের ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় ইরান। ফলে বিশ্ব জুড়ে ওঠে নিন্দার ঝড়। এতে কিছুটা চাপে পড়ে ঢোঁক গিলতে বাধ্য হয় মার্কিন সরকার। সেই ফাঁকে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে প্রত্যাঘাতে নেমেছে তেহরান। নিহত আলি খামেনেইয়ের দ্বিতীয় পুত্র মোজতবাকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেছে তারা। পাশাপাশি, নতুন সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্বে বিপুল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুদ্ধে।
আরব দুনিয়ার এআই ডেটা সেন্টারগুলিকে নিশানা করার কারণ ইতিমধ্যেই ব্যাখ্যা করেছে আইআরজিসি। মোজতবার নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের দাবি, স্কুলে হামলার প্রতিশোধ নিতেই ওই কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডারগুলিকে নিশানা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো পশ্চিম এশিয়ায় অক্ষত থাকবে না বলে স্পষ্ট করেছেন তাঁরা। ফলে অ্যামাজ়ন ও গুগ্লের সম্পত্তি রক্ষা করা যে বর্তমানে আমেরিকার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলাই বাহুল্য।
এআই ডেটা সেন্টার পরিচালনা করা বেশ ব্যয়বহুল। প্রতিনিয়ত এতে প্রচুর জল ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ২৪ ঘণ্টা সেখানে মোতায়েন থাকেন উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা। তা ছাড়া শত্রুর সাইবার আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডারে থাকে বিশেষ সুরক্ষাকবচ। বিশেষজ্ঞেরা অবশ্য মনে করেন, খনিজ তেলের জ্বালানি সুরক্ষার জেরে পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলিকে এআই ডেটা সেন্টারের জন্য বেছে নিয়েছিল আমেরিকা।
সৌদি আরব, আমিরশাহি বা বাহরিনে মেলে প্রচুর পরিমাণে তরল সোনা। ফলে সেখানে বিদ্যুতের কোনও অভাব নেই। এর জেরে গুগ্ল, মাইক্রোসফ্ট বা অ্যামাজ়নের মতো টেক জায়ান্টগুলি সেখানে একের পর এক ডেটা সেন্টার গড়ে তুলছিল। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) মে মাসে পশ্চিম এশিয়া সফরে গিয়ে রিয়াধ, আবু ধাবি এবং দোহার রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে দেখা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ নিশ্চিত করেন তিনি।
ওয়াশিংটনের দাবি, ট্রাম্পের সফরকালে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকল্পে ২.৮ লক্ষ কোটি ডলার লগ্নির প্রতিশ্রুতি দেয় সৌদি আরব, আমিরশাহি এবং কাতারের রাষ্ট্রপ্রধান। সেই বিনিয়োগের একটা বড় অংশই এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী সংস্থাগুলির কাছে যাওয়ার কথা ছিল। ইরানি আইআরজিসি যার মূলে আঘাত করেছে। আর্থিক দিক থেকে ওয়াশিংটনকে ক্ষতবিক্ষত করার রণকৌশল নিয়েছে তেহরান।
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ট্রাম্পের সফরের পর কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডার নিয়ে বড় ঘোষণা করে আমিরশাহির সরকার। তারা জানায়, ৭০ হাজার কোটি ডলার খরচ করে ওপেনএআই, এনভিডিয়া, ওরাকল এবং সিসকোর মার্কিন টেক জায়ান্টগুলির অংশীদারি নিয়ে আবু ধাবিতে গড়ে তোলা হবে একটি সুবিশাল এআই ডেটা সেন্টার। তা বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে পরিষেবা দিতে পারবে। ইরান যুদ্ধ যে সেই পরিকল্পনায় জল ঢেলেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
অন্য দিকে, এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে গত বছর (২০২৫ সালে) অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করে সৌদি প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয়বরাদ্দ ৪২০ কোটি ডলার বলে জানায় রিয়াধ। আরব দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডারে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এ ব্যাপারে ক্যানবেরা এগিয়ে আসবে কি না, তা বলা শক্ত। এক কথায় যুদ্ধের প্রভাবে আমেরিকার টেক জায়ান্ট সংস্থাগুলির রাতের ঘুম উড়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
আর তাই এই ইস্যুতে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন আমেরিকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা এএনইউ-এর (আমেরিকান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি) রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সিনিয়র লেকচারার জেসি মরিটজ়। তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিম এশিয়া এখন আর এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য একেবারেই নিরাপদ জায়গা নয়। মনে রাখতে হবে ইরান একটা অসম যুদ্ধ লড়ছে। সেই কারণেই নানা দিক থেকে আঘাত হেনে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করছে তারা।’’
পশ্চিম এশিয়ায় লড়াইয়ে অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে তেহরানের আইআরজিসি কমান্ডারদের যুদ্ধ পরিচালনা করার এই পদ্ধতিটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন দুনিয়ার তাবড় সামরিক বিশেষজ্ঞেরা। হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ রেখে ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের দাম চড়াতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা। আরব দুনিয়ায় গুগ্ল, মাইক্রোসফ্ট বা অ্যামাজ়নের পরিকাঠামো ধ্বংস হলে প্রভাব পড়বে ভারতেও? তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।