গুপ্তচরবৃত্তি। ব্যাপারটির মধ্যে বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার রয়েছে। যাঁরা রহস্য ভালবাসেন, গুপ্তচরবৃত্তির প্রতি তাঁদের আগ্রহের অন্ত নেই। রহস্য-রোমাঞ্চের খুব বড় অনুগামী না হয়ে থাকলেও এ বিষয়ে আগ্রহ থাকে। গুপ্তচরেরা কী ভাবে কাজ করেন, ছোট থেকে তাঁদের জীবন কোন ছন্দে কাটে এ সমস্ত নানা বিষয় ঘিরে আমাদের মনে বহু প্রশ্ন জাগে।
অধিকাংশ দেশেরই নিজস্ব ‘ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক’ থাকে। তারা সকলেই নিজেদের গুপ্তচর সংস্থাগুলিকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে পছন্দ করে। অবশ্য এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করলে গুপ্তচরবৃত্তির আর কোনও মানেও থাকবে না। শত্রুরা খেলা ধরে ফেলবেন।
কিন্তু রাখঢাক থাকার পরও সামনে এসে যায় নানা গোপন কথা। সেগুলির সত্যতা যদিও সর্বদা যাচাই করে ওঠা যায় না। কিন্তু তা নিয়ে শোরগোল পড়ে। আড্ডার আসরে তা নিয়ে দুটো কথা হয়। তার পর আবার কালের নিয়মে অতল গহ্বরে মিলিয়েও যায়। কিন্তু গুপ্তচরেরা রয়ে যান। হয়তো সেই আড্ডার আসরেই চুপটি করে বসে সবটা শোনেন।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্রিটিশ উদ্যোগপতি, বিনিয়োগকারী এবং পডকাস্টার স্টিভেন বার্টলেটের পডকাস্টের অনুষ্ঠান ‘ডায়েরি অফ আ সিইও’তে এসেছিলেন মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা ‘সিআইএ’-র প্রাক্তন আধিকারিক জন কিরিকাউ। সেখানে এসে তিনি রাশিয়ার গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন, যা মানুষের নজর কেড়েছে।
জন কিরিকাউ বহু বছর আমেরিকার হয়ে গুপ্তচর হিসাবে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেই তিনি স্টিভেনের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। সেখানে কথায় কথায় স্টিভেন রাশিয়ার গুপ্তচরদের বিষয়ে জনকে জিজ্ঞাসা করেন। তার পর জন যা বলেন, তা শুনে সেই অনুষ্ঠানের দর্শক চমকে যান।
যদিও গুপ্তচরবৃত্তি বিষয়টি চমকানোর মতোই। তাঁদের জীবন সহজ হয় না। বহু দেশে কম বয়সেই অনেককে গুপ্তচর হিসাবে বেছে নেওয়া হয়। তখন থেকেই কঠিন অধ্যবসায়ের মধ্যে তাঁদের জীবন কাটাতে হয়।
জনের কথা অনুযায়ী, ভ্লাদিমির পুতিনের দেশের ‘স্লিপার এজেন্ট’রা ছড়িয়ে রয়েছেন বিশ্ব জুড়ে। খুব অল্প বয়সেই রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ নিজেদের এজেন্টদের নির্বাচিত করে নেন। একটু বয়স বাড়লেই তাঁদের দুঁদে গুপ্তচর হিসাবে গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়।
সেই প্রশিক্ষণ কেমন হয় তা নিয়েও পডকাস্টে নানা কথা জানিয়েছেন জন। জনের কথা অনুযায়ী, রাশিয়ার অন্দরেই অন্য দেশের শহরের আদলে জায়গা তৈরি করা হয়। তার পর পরিবারের সম্মতি-সহ মাত্র দুই-তিন বছর বয়স থেকেই শুরু হয়ে যায় গুপ্তচর হয়ে ওঠার প্রশিক্ষণ।
নির্বাচিত খুদেটিকে তাঁরা সেই নকল শহরে নিয়ে যান। তার পর তাকে যে দেশে পাঠাতে চাওয়া হয়, সেই দেশের আদলে গড়ে তোলা হয়। তাকে সেখানকার সংস্কৃতির পাঠ দেওয়া হয়। উক্ত দেশের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পরিচিতি ঘটানো হয়। এরই সঙ্গে সেখানকার সিনেমা, সিরিজ়, ভাষা, বাচনভঙ্গি প্রভৃতি পাখি পড়ানোর মতো করে শেখানো হয়।
গুপ্তচর হিসাবে বেছে নেওয়া শিশুটি যে আদতে রাশিয়ান তা তাঁকে ভুলতে এক প্রকার বাধ্য করা হয়। বয়স বাড়লে এবং তিনি কর্তৃপক্ষের মনের মতো গড়ে উঠলে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় নির্বাচিত দেশে।
কিন্তু তাঁর পরিচয়পত্র জোগাড় হয় কী ভাবে? রাশিয়ার গুপ্তচর সংস্থার মাথাদের সেই হিসাবও করা থাকে। উক্ত দেশের মৃত সদ্যোজাতের খবর বা ছোট বয়সেই সেই দেশ ছেড়ে অপর দেশে পাড়ি দেওয়া শিশুদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন রাশিয়ার গুপ্তচর সংস্থার মাথারা। তার পর তাদের পরিচয় অবলম্বন করে সেই দেশে রাশিয়ার ‘স্লিপার এজেন্ট’দের পাঠানো হয়।
সেখানে গিয়ে তাঁরা আসলে ‘ঘুমন্ত’ অবস্থাতেই থাকেন। সেই কারণেই হয়তো এ-হেন নাম দেওয়া হয়েছে। ভিন্দেশে পাড়ি দিয়ে রাশিয়ার গুপ্তচরেরা সাধারণ মানুষের জীবন কাটান। তেমনটাই জানিয়েছেন জন।
কেউ কোনও সংস্থায় কাজে ঢুকে যান, কেউ আবার পড়াশোনায় মন দেন। এরই সঙ্গে চলতে থাকে তথ্য সংগ্রহের কাজ। অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়ার গুপ্তচর সংস্থার মাথারা নির্দিষ্ট কাজের বরাত দিয়ে পাঠান। হয়তো অমুক দেশের তমুক সংস্থার বিষয়ে তাঁদের খবরের প্রয়োজন। তখন তাঁরা তাঁদের গুপ্তচরকে সেই সংস্থায় কাজ জোগাড় করতে হবে, সে কথা বলেই পাঠান। গুপ্তচর সেইমতো নিজেকে গড়ে তোলেন তার পর ঊর্ধ্বতনদের বলে দেওয়া সেই সংস্থায় কাজে ঢোকেন।
এ ভাবেই নাকি বিভিন্ন দেশের নানা খবর সংগ্রহ করে চলেছে পুতিনের দেশ। তেমনটাই দাবি জনের। রাশিয়ার গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাস ঘাঁটলে তা যে ভুল, সেটিও অবশ্য হলফ করে বলা যায় না।
অতীতে আমেরিকা থেকে অনেককে রুশ গুপ্তচর হিসাবে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়। ২০১০ সালে নিউ ইয়র্কে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ১১ জনকে রাশিয়ার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার করে। তাঁদের মধ্যে রক্তিম কেশের সুন্দরী গুপ্তচর অ্যানা চ্যাপম্যান বেশ পরিচিত। তাঁকে অনেকে ‘ব্ল্যাক উইডো’ নামেও চেনেন।
রুশ গুপ্তচর হিসাবে চিহ্নিত হলেই কি তাঁদের গ্রেফতার করে নেওয়া হয়? জনের মতে, গ্রেফতার হলেও তাঁর দেশ রাশিয়ার সঙ্গে সওদা করে গুপ্তচরদের ছেড়েও দেওয়া হয়। প্রথমেই বলা হয়েছে, কমবেশি সমস্ত দেশের নিজস্ব গুপ্তচর সংস্থা রয়েছে। রুশ গুপ্তচরেরা যেমন অন্য দেশে গিয়ে ধরা পড়ছেন, তেমন অন্য দেশের গুপ্তচরেরাও তো রাশিয়ায় গিয়ে ধরা পড়েন। তাঁদের ঘিরেই বোঝাপড়া করে নেয় দেশগুলি।
এ ক্ষেত্রে জন একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। পডকাস্টে জন বলেন, তাঁর এক প্রতিবেশী মহিলা ছিলেন। তিনি আমেরিকার এক নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে বাচ্চাদের পড়াতেন। এফবিআইয়ের কর্মীরা এসে হঠাৎই একদিন তাঁকে ধরে নিয়ে যান। জানতে পারা যায় যে তিনি রাশিয়ার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছিলেন।
কিন্তু তাঁকে বেশি দিন হেফাজতে রাখা হয়নি। আমেরিকা থেকে তাঁকে রাশিয়ার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বদলে রাশিয়ার অধীনে থাকা আমেরিকার দুই গুপ্তচরকে তাঁরা ফিরিয়ে আনেন। এতে সাপও মরে কিন্তু লাঠিও ভাঙে না।
রাশিয়ান গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে হলিউডে নানা সিনেমাও তৈরি করা হয়েছে। লেখা হয়েছে অ্যানা চ্যাপম্যানের আত্মজীবনীও। তবে আদতে তাঁরা কী ভাবে কাজ করেন এবং কাদের মাঝে, কোথায় লুকিয়ে রয়েছেন সেটি কেবল রাশিয়ার মাথারাই জানেন।