এল নিনো। স্প্যানিশ শব্দটির অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। নামে ছোট হলেও তার দাপটে প্রাণ ওষ্ঠাগত হতে চলেছে বিশ্ববাসীর। আগামী দিনে রুদ্ররূপে নেমে আসতে পারে এল নিনো। সেই দিন আর বেশি দূরে নেই। আবহবিদদের শঙ্কা, ২০২৭ সালেই বিশ্ব জুড়ে দাপট দেখাতে শুরু করবে এল নিনো।
আবহাওয়া ও পরিবেশ সংক্রান্ত একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে সাধারণ এল নিনোর তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী রূপ প্রত্যক্ষ করবে সারা বিশ্ব। তাতেই চিন্তার ভাঁজ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে আবহবিদদের। সেই সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাবে নাভিশ্বাস উঠবে মানবজাতির, এমনটাই আশঙ্কা তাঁদের।
উষ্ণায়নের যে পথে বিশ্ব এগোচ্ছে, তাতে অচিরেই তা সুপার এল নিনোয় পরিণত হবে। সুপার এল নিনো হল এল নিনোর একটি চরম বা শক্তিশালী রূপ। এটি একটি উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত, যার প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ায়। এল নিনোর ঘটনা মূলত ঘটে চিলি, পেরু-সহ দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলবর্তী দেশগুলিতে। ডিসেম্বরে নাগাদ এক প্রকার দক্ষিণমুখী উষ্ণ স্রোতের সৃষ্টি হয়, মোটামুটি ভাবে ২ থেকে ৭ বছর অন্তর।
সেই সময় মহাসাগরের জলস্তরের (সি সারফেস) তাপমাত্রা অন্তত ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়। ফলে, উপকূলবর্তী এলাকার বায়ুমণ্ডলও তেতে ওঠে।
ওই সময় মহাসাগরের পিঠের জল দ্রুত হারে গরম হয়ে যায়। কারণ, ওই সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্ত থেকে গরম জলের স্রোত ধেয়ে আসে মহাসাগরের পূর্ব দিকে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তের জলস্তর অনেকটাই গরম। তুলনায় ঠান্ডা চিলি, পেরু-সহ দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলবর্তী জলস্তর।
এল নিনোর সময় পূর্ব উপকূলের সেই গরম জল তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় মহাসাগর সংলগ্ন স্থলভাগের বিভিন্ন দেশের বহু এলাকার। ওই সময় সমুদ্রের তলদেশ থেকে ঠান্ডা জলও উপরে উঠে আসতে পারে না। ফলে, সেখানকার সমুদ্রের পিঠের জলস্তর ঠান্ডা হওয়ার সুযোগই পায় না।
প্রশান্ত মহাসাগর নিয়ে গবেষণারত বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সাম্প্রতিক মডেল বিশ্লেষণ থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সেই তথ্য অদূর ভবিষ্যতে এল নিনোর বাড়বাড়ন্তের দিকেই নির্দেশ করছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেটি মেগা বা সুপার এল নিনোর রূপ নিতে পারে। ফলে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত হবে।
১৮৭৭ সালে এমনই এক দুঃসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাক্ষী থেকেছিল বিশ্ববাসী। তাপপ্রবাহ চরমে পৌঁছেছিল। এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চরম তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ফসলহানি এবং দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছিল। অসহ্য গরম আর ফসলের অভাবে সেই সময় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞেরা।
তৎকালীন বিশ্বে জনসংখ্যার প্রায় চার শতাংশ মানুষ এই ঘটনায় প্রাণ হারান। সেই সংখ্যাটি কয়েক লক্ষের গণ্ডি ছাড়িয়েছিল। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ হল এর ভয়াবহতা। সেই একই শক্তিশালী সুপার এল নিনোর খাঁড়া যদি নেমে আসে, তা হলে আজকের জনসংখ্যার নিরিখে প্রাণবিপর্যয়ের সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছে যেতে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলা স্থায়ী বাতাস ‘বাণিজ্য বায়ু’ অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি উল্টো দিকেও বইতে পারে। এল নিনোর প্রভাব কেবল প্রশান্ত মহাসাগরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সারা বিশ্বের আবহাওয়াকে ওলটপালট করে দেয়।
আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ এবং বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কম (খরা পরিস্থিতি) হয়। অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে ভয়াবহ খরা এবং দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণ আমেরিকার মরুভূমি অঞ্চলেও প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটে। উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ অংশে মাত্রাধিক বৃষ্টিপাত এবং উত্তরাঞ্চলে থাকে তুলনামূলক উষ্ণ শীতকাল।
আবহাওয়াবিদেরা ২০২৭-এর আশঙ্কার কথা শোনালেও চলতি বছরেই তার আঁচ পড়ছে বিশ্বে। ব্যতিক্রম নয় ভারতও। গ্রীষ্মের মরসুমের প্রথমেই তাপপ্রবাহ শুরু হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে। ভারতের এক একটি শহরে তাপমাত্রা সৌদি আরব, কাতারের পারদকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হল, বিশ্বের উষ্ণতম ২০টি শহরের মধ্যে ১৯টিই ভারতের। একটি মাত্র নেপালের লুম্বিনি। বাকি ১৯টি স্থান রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উত্তরপ্রদেশে। ৪৩-৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর ছুঁয়েছে এপ্রিলেই।
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি)-এর মতে প্রশান্ত মহাসাগরের ওই এল নিনোর প্রভাব সব সময়েই পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার কোনও না কোনও প্রান্তে। তা ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে নিয়ে আসে খরা। বাড়িয়ে দেয় দাবানলের মতো ঘটনা। তবে এল নিনোর জন্যই যে শুধু কোনও দেশের আবহাওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তন হয়, তা নয়। আরও নানা কারণ থাকে তার।
বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ, ভারতের জন্য এল নিনোর ঝুঁকিগুলো বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির কৃষি, জলসম্পদ এবং সামগ্রিক অর্থনীতি বর্ষার ওপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল। এল নিনোর প্রভাবে এটি দুর্বল হয়ে পড়বে। মধ্য ও পূর্ব ভারত জুড়ে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণ হবে এল নিনো, ফলে বর্ষাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতও হতে পারে।
পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ার কারণে ভারতের কৃষিব্যবস্থা প্রভূত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ঠিক সময়ে সংশ্লিষ্ট ফসল উৎপাদিত হয় না। চাহিদা অনুযায়ী জোগান না থাকায় মূল্যবৃদ্ধিও হয়ে পড়ে অবধারিত। সঙ্গে পর্যটন ব্যবসাও মার খায়। অতীতে এল নিনোর বছরগুলিতে এ ভাবেই ভুগতে হয়েছে ভারতকে।
ভয়াবহ এল নিনোর জন্য কয়েক দশক আগেও ভারতকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরে সাত বার এল নিনোর সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এল নিনোর দেখা মিলেছে অন্তত ১৫ বার। এল নিনোর এই ১৫টি বছরের মধ্যে ৯ বার ভারতে বর্ষাকালে পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টি হয়নি। স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কম বৃষ্টি হয়েছে এই বছরগুলিতে।
২০১৫ সালে খরায় শুকিয়ে গিয়েছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বহু এলাকা। সে বছর সারা দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গিয়েছিল উল্লেখযোগ্য ভাবে। আবার ভারতের বর্ষার মরসুমে ততটা প্রভাব না ফেললেও, ২০০৯ সালের এল নিনোও শক্তির নিরিখে যথেষ্টই ভয়াবহ। একই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭২, ১৯৮২, ১৯৮৩ সালে। ওই বছরগুলিতেও পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে জন্মানো এল নিনো বড়সড় প্রভাব ফেলেছিল ভারতের বর্ষার মরসুমে। ১৯৯২ সালের এল নিনোর দুঃসহ প্রভাব ভারতীয়েরা সম্ভবত এখনও ভুলতে পারেননি।
আবহাওয়া গবেষকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা। এল নিনোর সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হয়ে তাপমাত্রাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাচ্ছে, যা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। ইতিমধ্যেই স্বাভাবিক তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছে। এর অর্থ হল, এল নিনোর ফলে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হবে। ফলে চরমভাবাপন্ন পরিস্থিতি অতীতের চেয়ে আরও মারাত্মক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদেরা। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, যা একসময় বিরল বলে মনে করা হত, তা এখন আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং আরও তীব্র হয়ে উঠছে।