Thalapathy Vijay

স্বভাবে বদল আনে বোনের অকালমৃত্যু, ‘প্রেমিকা’র সঙ্গে কাজ করেননি ১৩ বছর! রাজনীতির ময়দানে নামতে বড় ত্যাগ করেন তলপতি

সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের অন্তত ১১ জন জয়ী প্রার্থীর সমর্থন দরকার ছিল বিজয়ের। একক সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদুসংখ্যা ছুঁতে না পেরে কংগ্রেস, ভিসিকে, সিপিআই, সিপিএম এবং ইউনিয়ন মুসলিম লিগের সমর্থনে সরকার গঠন করেন বিজয়। পাঁচ দিনের দীর্ঘ জটিলতার পর রবিবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন তলপতি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ১৫:০২
Share:
০১ ২২

মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে অভিনয়। বাবার হাত ধরে অভিনয়জগতে আসা। আবার রাজনীতির জন্য বাবার বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ করেছিলেন। তিন দশকের কেরিয়ারে ‘তলপতি’ নাম জু়ড়ে বক্সঅফিসের ‘সম্রাট’ হয়ে উঠেছিলেন। পরে অভিনয় থেকে বিচ্ছেদ নিয়ে পুরোপুরি রাজনীতির ময়দানে নামা। সেই ময়দানেও জয় হয়েছে বিজয়ের। রবিবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণ করলেন দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির ‘তলপতি’ জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর।

০২ ২২

১৯৭৪ সালের ২২ জুন ভারতের তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে জন্ম বিজয়ের। তাঁর বাবা এসএ চন্দ্রশেখর ছিলেন তামিল চলচ্চিত্রজগতের বিখ্যাত পরিচালক। বিজয়ের মা শোভা চন্দ্রশেখর ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী।

Advertisement
০৩ ২২

বাবার হাত ধরে ১৯৮৪ সালে ‘ভেত্রি’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসাবে প্রথম অভিনয় বিজয়ের। তার পর একাধিক ছবিতে শিশুশিল্পী হিসাবে কাজ করেছিলেন তিনি। বিজয়ের যখন ১০-১১ বছর বয়স, তখন তাঁর দুই বছর বয়সি বোন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

০৪ ২২

বিজয়ের বাবা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শৈশবে খুব চঞ্চল স্বভাব ছিল অভিনেতার। কিন্তু বোনের অকালমৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তিনি। তার পর থেকেই শান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। বোনের প্রতি তাঁর ভালবাসা এত গভীর ছিল যে, বোনের নামের আদ্যক্ষর অনুসারে নিজের প্রযোজনা সংস্থার নাম রেখেছিলেন।

০৫ ২২

স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর চেন্নাইয়ের একটি কলেজে ‘ভিস্যুয়াল কমিউনিকেশন’ নিয়ে ভর্তি হন বিজয়। সেই সময় থেকে অভিনয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। অভিনয় নিয়ে কেরিয়ার গড়ার জন্য মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে পূর্ণ সময়ের অভিনেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন বিজয়।

০৬ ২২

১৯৯২ সালে ‘নালাইয়া থেরপু’ ছবির মাধ্যমে প্রধান অভিনেতা হিসাবে অভিষেক হয় বিজয়ের। ১৯৯৬ সালে ‘পুভে উনাক্কাগা’ ছবির বিশাল সাফল্য বিজয়কে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয়। তার পর বহু রোম্যান্টিক ঘরানার ছবিতে বিজয়ের অভিনয় দেখা যায়।

০৭ ২২

অভিনয়ের পাশাপাশি একাধিক ছবিতে গানও গেয়েছেন বিজয়। ২০০৩ সালে ‘তিরুমালাই’ ছবিটি তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অ্যাকশন ঘরানার নায়ক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। কম সময়ের মধ্যেই তিনি বক্সঅফিসে আক্ষরিক অর্থেই ঝড় তুলতে শুরু করেন। বিজয় তখন হয়ে ওঠেন ‘ইলয়তলপতি’, বাংলায় যার অর্থ ‘তরুণ সেনাপতি’।

০৮ ২২

দক্ষিণী দর্শকের অধিকাংশ আবার বিজয়কে রজনীকান্তের পরেই স্থান দিয়ে ফেলেছিলেন। ২০১৭ সালে ‘মেরসাল’ ছবিটির মুক্তির পর থেকে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে কেবল ‘তলপতি’ হিসাবে পরিচিতি পান। এই জনপ্রিয়তা ছোঁয়ার আগেই বিজয়ের জীবনে এসেছিলেন সঙ্গীতা সোরনালিগম।

০৯ ২২

বিজয় তখন উঠতি তারকা। শিল্পপতির কন্যা সঙ্গীতা প্রথম থেকেই বিজয়ের অভিনয়ের একনিষ্ঠ অনুরাগী ছিলেন। ‘পুভে উনাক্কাগা’ ছবির সাফল্যের পর বিজয়ের সঙ্গে দেখা করতে সুদূর লন্ডন থেকে চেন্নাই পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।

১০ ২২

১৯৯৬ সালে বিজয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন সঙ্গীতা। তখন বিজয় চেন্নাইয়ের এক ফিল্ম স্টুডিয়োয় শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সেটেই পৌঁছে গিয়েছিলেন সঙ্গীতা। প্রথম দেখায় তরুণী ভক্তের সরলতার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন বিজয়। মনে মনে স্থির করে ফেলেছিলেন, সঙ্গীতাকেই বিয়ে করবেন।

১১ ২২

সেট থেকে সঙ্গীতাকে নিয়ে সোজা বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন বিজয়। সঙ্গীতাকে দেখামাত্রই অভিনেতার পরিবারের তাঁকে পছন্দ হয়ে যায়। বিজয়ের পরিবারের তরফ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সঙ্গীতার পরিবারেরও কোনও আপত্তি ছিল না।

১২ ২২

তিন বছর সম্পর্কে থাকার পর ১৯৯৯ সালের অগস্টে সঙ্গীতাকে বিয়ে করেন বিজয়। চেন্নাইয়ে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছরের মাথায় পুত্রসন্তানের জন্ম দেন সঙ্গীতা। ২০০৫ সালে জন্ম দেন কন্যাসন্তানের।

১৩ ২২

দীর্ঘ ২৭ বছরের সংসারের পর চেন্নাইয়ের চেঙ্গলপাট্টুর পরিবার আদালতে আইনি বিচ্ছেদের আবেদন জানিয়েছেন সঙ্গীতা। তাঁর অভিযোগ, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এক সহ-অভিনেত্রীর সঙ্গে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন বিজয়। সঙ্গীতার দাবি, এই সম্পর্কের কারণে তিনি মানসিক যন্ত্রণা এবং বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে দুই সন্তানের উপরেও।

১৪ ২২

জনশ্রুতি, দক্ষিণী নায়িকা তৃষা কৃষ্ণনের সঙ্গেই নাকি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে রয়েছেন বিজয়। ২০০৪ সালে ‘গিল্লি’ ছবির মাধ্যমে তাঁদের রসায়ন দর্শকের মন জয় করে। এর পর তাঁরা ‘তিরুপাচি’, ‘আথি’ এবং ‘কুরুভি’র মতো একাধিক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেন।

১৫ ২২

২০০৮ সালের পর একসঙ্গে ছবিতে অভিনয় করা বন্ধ করে দেন বিজয় এবং তৃষা। কারণ, তাঁদের রসায়ন ছায়া ফেলেছিল বিজয়ের সংসারে। তৃষার সঙ্গে ছবি না করার শর্ত চাপিয়েছিল অভিনেতার পরিবার। সেই সময় তাঁরা ঘোষণা করেন, সবটাই রটনা। তাঁরা শুধুমাত্রই বন্ধু। দীর্ঘ ১৪ বছরের বিরতির পর ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লিয়ো’ ছবিতে তাঁদের আবার স্বামী-স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়।

১৬ ২২

২০২৪ সাল থেকে একাধিক বার বিজয় এবং তৃষাকে পর্দার বাইরেও আবিষ্কার করেছেন ছবিশিকারিরা। কখনও বিমানবন্দরে, কখনও আবার বিজয়ের বাড়িতে। কখনও আবার একই অনুষ্ঠানে তাঁরা আলাদা ভাবে উপস্থিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু দুই তারকার পোশাকে ধরা পড়ত রংমিলান্তি! কানাঘুষো শোনা যায়, বিজয় এবং তৃষা একান্তে সময় কাটাতে নরওয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে, তৃষার জন্মদিনেই রাজনীতির ময়দানে বিজয়ী হন বিজয়।

১৭ ২২

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজনীতিতে যোগ দেন বিজয়। নিজের দল ‘তামিলাগা ভেটরি কাজ়াগম’ (টিভিকে) প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তবে, রাজনীতির জন্য বাবার বিরুদ্ধে ‘লড়তেও’ পিছপা হননি বিজয়। ঘটনাটি মূলত শুরু হয় ২০২০-২০২১ সালের দিকে।

১৮ ২২

শোনা যায়, বিজয়ের নাম ব্যবহার করে তাঁর বাবা ‘অল ইন্ডিয়া তলপতি বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনে নথিভুক্ত করেন। তিনি চেয়েছিলেন বিজয় দ্রুত রাজনীতিতে আসুক। কিন্তু বিজয় তখন সরাসরি রাজনীতিতে নামার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা সম্পূর্ণ তাঁর নিজের শর্তে শুরু হোক।

১৯ ২২

বিজয় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, বাবার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর কোনও রকম সম্পর্ক নেই। পরিস্থিতি এতটাই চরমে পৌঁছোয় যে, বিজয় তাঁর বাবা এবং মা-সহ আরও ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন যে, তাঁর নাম, ছবি বা ফ্যান ক্লাবের নাম ব্যবহার করে কেউ যেন কোনও রাজনৈতিক সভা বা দল পরিচালনা করতে পারবেন না। এই কারণে বাবা-ছেলের মধ্যে দীর্ঘ সময় কথাবার্তা বন্ধ ছিল। পরে অবশ্য সেই সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। বিজয়ের বাবা এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন যে, একজন পিতা হিসাবে তিনি সম্পূর্ণ আবেগের বশেই সব পদক্ষেপ করেছিলেন।

২০ ২২

২০০৯ সালে বিজয় আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর ভক্তদের নিয়ে একটি সংগঠন গ়ড়ে তুলেছিলেন। তখন সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ না করেও জনকল্যাণের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতেন তিনি। বিজয়ের সেই সংগঠন পরে বৃহদাকার ধারণ করে। গোড়ার দিকে সংগঠনটি শিক্ষামূলক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং যুবসমাজ ও জনসাধারণের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করত। পরে তা বিভিন্ন প্রতিবাদী আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।

২১ ২২

২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে অভিনয় থেকে পাকাপাকি ভাবে অবসর নেন বিজয়। নিজেকে রাজনীতিতে সম্পূর্ণ রূপে উৎসর্গ করে দেন তিনি। ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১১৮টি আসন। বিজয়ের দল ১০৮টি আসনে জিতেছিল। তার মধ্যে বিজয় নিজে দু’টি আসন থেকে লড়েছিলেন।

২২ ২২

গত ৪ মে, সোমবার বিধানসভা নির্বাচনের ফলঘোষণা হয়েছিল। সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের অন্তত ১১ জন জয়ী প্রার্থীর সমর্থন দরকার ছিল বিজয়ের। একক সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদুসংখ্যা ছুঁতে না পেরে কংগ্রেস, ভিসিকে, সিপিআই, সিপিএম এবং ইউনিয়ন মুসলিম লিগের সমর্থনে সরকার গঠন করেন বিজয়। পাঁচ দিনের দীর্ঘ জটিলতার পর বিজয়কে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেন রাজ্যপাল। রবিবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন বিজয়।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement