Pay Commission

৫০,০০০ টাকায় পৌঁছোতে পারে মূল বেতন! সাত বেতন কমিশনে এখনও পর্যন্ত কী হারে বেড়েছে সরকারি কর্মীদের মাস-মাইনে?

কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন সংশোধনের জন্য কমিশন বসিয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। প্রথম থেকে সপ্তম বেতন কমিশন পর্যন্ত কী ভাবে আর্থিক দিক থেকে লাভবান হয়েছেন তাঁরা?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ১৬:৫৪
Share:
০১ ২২

অষ্টম বেতন কমিশনের অনুমোদন দিয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। ফলে চওড়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের মুখের হাসি। বলা বাহুল্য, এর ফলে বাড়বে তাঁদের বেতন। এর সুবিধা পাবেন পেনশনভোগী অবসরপ্রাপ্তরাও। অষ্টম বেতন কমিশন কার্যকর হলে তাঁদের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের বেতনের পার্থক্য কতটা হবে? এই নিয়ে ইতিমধ্যেই তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।

০২ ২২

বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, অষ্টম বেতন কমিশন চালু হলে চাকরিজীবনের শুরুতেই নামী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মীর থেকে বেশি বেতন পাবেন কেন্দ্রীয় সরকারি পিয়ন। শুধু তা-ই নয়, কর্মচারীদের ন্যূনতম মূল বেতন (বেসিক পে) ছাড়াতে পারে ৫০ হাজার টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম বেতন কমিশন থেকে শুরু করে সপ্তম পর্যন্ত ৩২৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে তাঁদের ন্যূনতম মূল বেতন।

Advertisement
০৩ ২২

এ দেশের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রথম বেতন কমিশন কার্যকর হয় ১৯৪৬ সালের ১ এপ্রিল। ভারত তখনও স্বাধীন হয়নি। সেখানে প্রতি মাসের ন্যূনতম মূল বেতন ৫৫ টাকা ধার্য করা হয়েছিল। সর্বোচ্চ মূল বেতন ছিল ২,০০০ টাকা। ঠিক হয়, প্রতি ১০ বছর অন্তর কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর সংস্কার করবে সরকার। যদিও সেই নিয়ম সব সময়ে মানা হয়েছে, এমনটা নয়।

০৪ ২২

গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকের শেষের দিকে দ্বিতীয় বেতন কমিশনের অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। সেটাই ছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম বেতন কমিশন। ক্ষমতায় তখন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। ১৯৫৯ সালের ১ জুলাই থেকে দ্বিতীয় বেতন কমিশনের দেওয়ার সুপারিশ মেনে কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের সংশোধিত বেতন চালু করে তাঁর সরকার। সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয় মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ।

০৫ ২২

দ্বিতীয় কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের ন্যূনতম মূল বেতন ৫৫ থেকে বেড়ে হয় ৮০ টাকা। সর্বোচ্চ মূল বেতন ২,২৫০ টাকা ধার্য করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, প্রথম বেতন কমিশনের ১৩ বছর পর দ্বিতীয়টিকে কার্যকর করতে সক্ষম হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তবে বেতন কাঠামোকে অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত করতে সক্ষম হয় তাঁর প্রশাসন।

০৬ ২২

নেহরুর আমলে বসা কমিশনের কর্তা-ব্যক্তিদের যুক্তি ছিল, টানা ১০ বছর বেতন কাঠামোয় কোনও বদল না হলে বিপাকে পড়বেন কেন্দ্রীয় কর্মচারীরা। কারণ, মুদ্রাস্ফীতির জেরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি, তাঁদের জীবনযাপনের উপর প্রভাব ফেলবে। এই বর্ধিত ব্যয় মোকাবিলার জন্যেই ডিএ দেওয়ার সুপারিশ করেন তাঁরা। তা মেনেও নেয় তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা।

০৭ ২২

এ দেশে তৃতীয় বেতন কমিশন কার্যকর হয় ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি। প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে তখন নেহরু-কন্যা ইন্দিরা গান্ধী। ওই সময়ে ন্যূনতম মূল বেতন আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৫ টাকা। আর ৩,৫০০ টাকা করা হয় সর্বোচ্চ বেসিক পে। সে বার বেতন বৈষম্য হ্রাসের দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল সরকার। সেই লক্ষ্যে বাড়ানো হয় ভাতা এবং অন্তর্বর্তিকালীন ত্রাণ।

০৮ ২২

দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বেতন কমিশন কার্যকর হওয়ার মধ্যের সময়সীমা ছিল ১৪ বছর। আরও ১৩ বছর পর চতুর্থ কমিশনের সুপারিশ মেনে কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সংস্কার করে সরকার। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি যা কার্যকর করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তথা ইন্দিরা-পুত্র রাজীব গান্ধী।

০৯ ২২

চতুর্থ কমিশন বেতন কাঠামোর ব্যাপক সংস্কারের পাশাপাশি জোর দেয় পেনশনে। পাশাপাশি, সে বার থেকে কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের জন্য বেশ কয়েকটা নতুন ভাতা চালু করে সরকার। ফলে ন্যূনতম মূল বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫০ টাকা। পাশাপাশি, ৯,০০০ টাকায় পৌঁছে যায় সর্বোচ্চ বেসিক পে। তা ছাড়া বেতন বৃদ্ধির জন্য ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ ধার্য করা হয় ২.৩।

১০ ২২

আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, বেশ কয়েকটা ভিত্তির উপর নির্ভর করে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন (বেসিক পে) নির্ধারণ এবং সংশোধন করে কমিশন। একেই বলে ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’। নিয়ম অনুযায়ী, সংশোধিত মূল বেতন ঠিক করতে বর্তমান বেসিক পে-র সঙ্গে ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’কে গুণ করা হয়।

১১ ২২

১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি পঞ্চম বেতন কমিশন কার্যকর করে পিভি নরসিংহ রাওয়ের সরকার। সে বার ঠিক ১০ বছরের মাথায় সংশোধিত বেতনের সুবিধা পেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মচারীরা। শুধু তা-ই নয়, কমিশনের সুপারিশে তাঁদের প্রতি মাসের ন্যূনতম মূল বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ২,৫৫০ টাকা। আর ২৬,০০০ টাকায় পৌঁছে যায় সর্বোচ্চ মূল বেতন।

১২ ২২

পঞ্চম কমিশন মূল বেতন বৃদ্ধির দিকে সর্বাধিক নজর দিয়েছিল। বেতন কাঠামোকে আরও আধুনিক করে তারা। সংশোধন করা হয় ভাতার অর্থ। এর জেরে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরকে ২.৫৪ রেখেছিলেন পঞ্চম বেতন কমিশনের কর্তা-ব্যক্তিরা।

১৩ ২২

মনমোহন সিংহ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি ষষ্ঠ বেতন কমিশন কার্যকর করে কেন্দ্র। ফলে আগের বারের মতো ফের একবার ১০ বছরের মাথায় সংশোধিত বেতনের আর্থিক লাভ পেয়েছিলেন কর্মচারীরা। যদিও সে বার ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরকে কম রেখেছিল কমিশন। সেটা স্থির ছিল মাত্র ১.৮৬-এ।

১৪ ২২

ষষ্ঠ বেতন কমিশনের হাত ধরে এ দেশে চালু হয় গ্রেড পে ব্যবস্থা। পাশাপাশি, মহার্ঘ ভাতা বা ডিএকে মূল বেতনের সঙ্গে একীভূত করে সরকার। সংশোধন করা হয় পেনশন বিধি। ফলে আর্থিক দিক থেকে অনেক বেশি লাভবান হন অবসরপ্রাপ্তেরা। পাশাপাশি, ন্যূনতম এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭,০০০ এবং ৮০,০০০ টাকা।

১৫ ২২

সপ্তম বেতন কমিশনেও ১০ বছরের সময়সীমা বজায় রাখে কেন্দ্র। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি তা কার্যকর করে সরকার। তত দিনে দিল্লির রাজনীতিতে বড় পালাবদল ঘটে গিয়েছে। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিপুল আসনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদী। তাঁর আমলে হওয়া সেটাই প্রথম বেতন কমিশন।

১৬ ২২

সপ্তম বেতন কমিশনের হাত ধরে পুরোপুরি অবলুপ্তি ঘটে কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের গ্রেড পে ব্যবস্থা। সেই জায়গায় চালু হয় ১৮টি স্তরবিশিষ্ট ‘পে মেট্রিক্স’। তা ছাড়া বাড়িভাড়া ভাতার (এইচআরএ) পরিমাণ বৃদ্ধি করে সরকার। সেটা আট, ১৬ এবং ২৪ শতাংশ করা হয়। কর্মচারী কোন ধরনের শহরে থাকছেন তার উপর ভিত্তি করে বর্তমানে নির্ধারিত হয় এইচআরএ।

১৭ ২২

সপ্তম বেতন কমিশনে ন্যূনতম মূল বেতন ১৮,০০০ টাকা করা হয়। সর্বোচ্চ বেসিক পে ২.৫ লক্ষ টাকা ধার্য করে সরকার। ১০ বছর আগে এর ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.৫৭ রেখেছিলেন কমিশনের কর্তা-ব্যক্তিরা।

১৮ ২২

সূত্রের খবর, এ বছরের (২০২৬ সাল) ১ জানুয়ারি থেকে অষ্টম কমিশনের সুপারিশ মেনে নতুন বেতন কাঠামো চালু করতে পারে কেন্দ্র। যদিও বাস্তবে তা কার্যকর হবে সামনের বছর। সে ক্ষেত্রে এই সময়সীমার বর্ধিত বেতন ‘এরিয়ার’ হিসাবে এক বারে পেয়ে যাবেন কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা।

১৯ ২২

আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান, অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশ মেনে সংশোধিত বেতন কাঠামো চালু করতে কেন্দ্রের ২০ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে ‘এরিয়ার’ বাবদ একজন কর্মী ৩.৬ লক্ষ টাকা থেকে ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন। ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’-এর উপর ভিত্তি করে উঁচুতলার কর্মীদের বকেয়া বেশি হবে। সেই টাকা এক বা একাধিক কিস্তিতে দিতে পারে সরকার।

২০ ২২

সংশোধিত বেতনে ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কমিশনকে একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে একাধিক কর্মচারী সংগঠন। সূত্রের খবর, সরকারের নিচুতলার কর্মীদের ক্ষেত্রে সেটা ৩.০-৩.২৫-এর মধ্যে রাখার অনুরোধ জানিয়েছে তারা। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এই নিয়ে মুখ খোলেন ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারির সচিব শিবগোপাল মিশ্র।

২১ ২২

শিবগোপালের অনুমান, বেতন নির্ধারণের ভিত্তিগুলি (ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর) অন্তত ২.৮৬-তে গিয়ে দাঁড়াবে। সপ্তম বেতন কমিশনে এটি ছিল ২.৫৭। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে ২৯ বেসিস পয়েন্ট বৃদ্ধি পাবে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর। অন্য দিকে আর্থিক পরিষেবা সংস্থা অ্যাম্বিটের অনুমান, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি করবে অষ্টম বেতন কমিশন।

২২ ২২

বর্তমানে কেন্দ্রের যে সমস্ত কর্মচারী ৫০ হাজার টাকার কম আয় করেন, তাঁদের মোট আটটা পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। লেভেল ১-এর কর্মীদের মূল বেতন ১৮ হাজার টাকা। আর মূল বেতন বাবদ মাসে ৪৭,৬০০ টাকা পান লেভেল ৮-এর কর্মীরা। অষ্টম বেতন কমিশনে ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ ২.০-২.৫৭-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করলে লেভেন ১-এর কর্মীদের মূল বেতন বেড়ে ৩৬,০০০-৪৬,২৬০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একই ভাবে লেভেন ৮-এর কর্মীরা পাবেন ১.২২ লক্ষ টাকা।

ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement