দেশের নতুন সেনা সর্বাধিনায়ক বা সিডিএস (চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ) বেছে নিল কেন্দ্র। এই পদের দায়িত্বভার পাচ্ছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এনএস রাজা সুব্রমণি। ৯ মে, শনিবার সকালে তাঁর নাম ঘোষণা করে নরেন্দ্র মোদী সরকার। আগামী দিনে স্থল, জল ও বায়ু— তিন বাহিনীর প্রধান হিসাবে কাজ করবেন সুব্রমণি। দেশের তৃতীয় সিডিএস হিসাবে নাম ঘোষণা হল তাঁর।
সিডিএস হিসাবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রমণিকে বেছে নেওয়ার পর এ ব্যাপারে একটি বিবৃতি দেয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। সেখানে বলা হয়েছে, তিন বাহিনীর প্রধান থাকার পাশাপাশি সামরিক বিষয়ক দফতরের সচিব হিসাবে কাজ করবেন তিনি। বর্তমানে সিডিএস পদে রয়েছে জেনারেল অনিল চৌহান। ৩০ মে শেষ হচ্ছে তাঁর কার্যকালের মেয়াদ। এর পরই সেই কুর্সিতে বসবেন সুব্রমণি।
ভারতের তৃতীয় সিডিএস ছিলেন ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমি’র (এনডিএ) ৬৭ নম্বর ব্যাচের ক্যাডেট। সেখানকার প্রশিক্ষণ শেষ হলে যোগ দেন দেহরাদূনের ‘ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমি’তে (আইএমএ)। লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রমণির ঝুলিতে রয়েছে বিদেশের ডিগ্রিও। কয়েক বছরের জন্য ব্রিটেনের জয়েন্ট সার্ভিসেস কমান্ড স্টাফ কলেজেও যোগ দেন তিনি।
এ ছাড়া নয়াদিল্লির ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে ছিলেন সিডিএস হতে চলা লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রমণি। পড়াশোনা করেছেন লন্ডনের কিংস কলেজে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল ডিগ্রি রয়েছে তাঁর। ১৯৮৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনায় অফিসার হিসাবে যোগ দেন তিনি। শুরু হয় সৈনিক জীবন।
সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর গঢ়বাল রাইফেল্সের অষ্টম ব্যাটেলিয়নে অফিসার হিসাবে যোগ দেন সুব্রমণি। চার দশকের কর্মজীবনে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। সামলেছেন বিভিন্ন কমান্ড, স্টাফ অফিসার এবং প্রশিক্ষণমূলক কাজের দায়িত্ব। বেশ কিছু দিন এনডিএ-র বিভাগীয় প্রধান ছিলেন সেখানকারই প্রাক্তনী এই সেনা শীর্ষকর্তা।
এনডিএ-র বিভাগীয় প্রধান থাকাকালীন উচ্চশিক্ষার জন্য ব্রিটেনের জয়েন্ট সার্ভিসেস কমান্ড স্টাফ কলেজে চলে যান সুব্রমণি। সেখানকার সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পর পার্বত্য ব্রিগেডের দায়িত্ব পান তিনি। ওই সময় ‘ব্রিগেডে মেজর’ পদে তাঁকে নিয়োগ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। পরবর্তী বছরগুলিতে তাঁর নেতৃত্বেই উত্তর-পূর্বে ‘অপারেশন রাইনো’র মতো সামরিক অভিযান চালায় ফৌজ।
১৯৯২-’৯৯ সালের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ অসম’ বা উলফার লাগাতার হামলায় রক্তাক্ত হয়ে ওঠে উত্তর-পূর্ব ভারত, যা আটকাতে সামরিক অভিযানে নামে ভারতীয় সেনা। এর সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন রাইনো’। এই অভিযানের অংশ হয়ে ফৌজকে নেতৃত্ব দেন সুব্রমণি। ওই সময় গঢ়বাল রাইফেল্সের ১৬ নম্বর ব্যাটেলিয়নের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
‘অপারেশন রাইনো’তে উলফার কোমর ভেঙে দেয় ভারতীয় সেনা, যার ষোলো আনা কৃতিত্বই সুব্রমণির। সেনা অফিসার হিসাবে নজরকাড়া সাফল্যের জন্য এ বার তাঁকে কাজ়াখস্তানে পাঠায় নয়াদিল্লি। সেখানে ভারতীয় দূতাবাসে ‘প্রতিরক্ষা সংযুক্তি’ (ডিফেন্স অ্যাটাচে) অফিসার হিসাবে কাজ করেন তিনি।
ব্রিগেড মেজর থেকে কর্নেলে পদোন্নতি হওয়ার পর নয়াদিল্লির সেনা সদর দফতরের এমএস শাখায় বদলি হন সুব্রমণি। সেখানে সামরিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে কর্নেল জেনারেল স্টাফ (অপারেশন) করে তাঁকে ইস্টার্ন কমান্ডের সদর দফতরে পাঠায় কেন্দ্র। এ ছাড়া জম্মু-কাশ্মীরেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গিহামলা আটকাতে ১৯৯০ সালে ‘রাষ্ট্রীয় রাইফেল্স’ বা আরআর নামের একটি বাহিনী তৈরি করে ভারতীয় সেনা। ভূস্বর্গে সন্ত্রাসবাদ দমনে দুর্দান্ত সাফল্য পেয়েছে তাঁরা। একসময়ে এই বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন সুব্রমণি। ব্রিগেডিয়ার হওয়ার পর কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জম্মু-কাশ্মীরের সাম্বা সেক্টরের ১৬৮ নম্বর পদাতিক ব্রিগেডের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে তুলে দেয় নয়াদিল্লি।
ব্রিগেডিয়ার থাকাকালীন নয়াদিল্লির ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ৫৫ নম্বর কোর্স করার সুযোগ পান সুব্রমণি। সেই পাঠ শেষ হলে সেনা সদর দফতরে ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের (ডিডিজিএমআই) মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব চাপে তাঁর কাধে। এ ছাড়া ইস্টার্ন কমান্ডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্টাফ (অপারেশন্স) পদেও ছিলেন তিনি।
ব্রিগেডিয়ার থেকে মেজর জেনারেল হওয়ার পর সিকিমের ১৭ নম্বর পার্বত্য ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং পদে নিযুক্ত হন সুব্রমণির। সেখান থেকে ওয়েলিংটনের ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজে চলে যান তিনি। সেখানে প্রধান প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন এই ফৌজি অফিসার। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল র্যাঙ্কে পদোন্নতি হয় তাঁর। দায়িত্ব পান উত্তর ভারতের জেনারেল অফিসার কমান্ডিংয়ের।
২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুরিন্দর সিংহ মহলের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ‘দ্বিতীয় কোর’-এর জেনারেল অফিসার কমান্ডিংয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রমণি। এর ঠিক এক বছরের মাথায় ২০২২ সালের মে মাসে জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুরের ‘নর্দার্ন কমান্ড’-এ চিফ অফ স্টাফ হন তিনি।
২০২৩ সালের মার্চে সেন্ট্রাল কমান্ডের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ হিসাবে নিযুক্ত হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রমণি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তাঁকে ভারতীয় ফৌজের স্থলবাহিনীর ৪৭তম ভাইস চিফ অফ দ্য আর্মি স্টাফের দায়িত্ব দেয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। ওই পদে থাকা জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীকে সেনাপ্রধান বা চিফ অফ দ্য আর্মি স্টাফ করে কেন্দ্র।
কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর সুব্রমণিকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সামরিক পরামর্শদাতা করে মোদী সরকার। বর্তমানে সেই পদেই রয়েছেন তিনি। এবার আরও বড় দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে সিডিএস বা সেনা সর্বাধিনায়ক করল প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।
দীর্ঘ চাকরিজীবনে বীরত্ব ও বাহিনীকে নেতৃত্বদানের জন্য একাধিক সম্মান পেয়েছেন সিডিএস হতে চলা সুব্রমণি। এর মধ্যে অন্যতম হল ২০২৪ সালের পরম বিশিষ্ট সেবা পদক এবং ২০২০ সালের অতি বিশিষ্ট সেবা পদক। এ ছাড়া সেনাপদক এবং বিশিষ্ট সেবাপদকও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের পর তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করতে সিডিএস পদ তৈরির চিন্তাভাবনা শুরু করে কেন্দ্র। ২০১৯ সালে এ ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত দেয় মোদী সরকার। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারিতে দেশের প্রথম সিডিএস হন জেনারেল বিপিন রাওয়াত। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তামিলনাড়ুর কুন্নুরে কপ্টার দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর।
জেনারেল রাওয়াতের মৃত্যুর পর অনিল চৌহানকে সিডিএসের দায়িত্ব দেয় কেন্দ্র। তাঁর আমলে গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামের সামরিক অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসবাদকে মদত দেওয়া পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দেয় ভারতীয় ফৌজ। সেই জায়গায় এ বার স্থলাভিষিক্ত হতে চলেছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রমণি।
সিডিএসের পাশাপাশি দেশের নতুন নৌসেনা প্রধানকেও বেছে নিয়েছে কেন্দ্র। বর্তমানে ওই পদে রয়েছেন অ্যাডমিরাল দীনেশকুমার ত্রিপাঠী। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন ভাইস অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ স্বামীনাথন। ৩১ মে দীনেশের কার্যকালের মেয়াদ শেষ হলে অ্যাডমিরালের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন তিনি।
নৌসেনা প্রধান হতে চলা স্বামীনাথন বর্তমানে মুম্বইয়ে পশ্চিম নেভাল কমান্ডের মাথায় রয়েছেন। এর আগে নৌসেনার উপপ্রধানের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ক্ষেপণাস্ত্রবাহী রণতরী আইএনএস বিদ্যুৎ, আইএনএস বিনাশ, ক্ষেপণাস্ত্রবাহী করভেট আইএনএস কুলিশ, ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী আইএনএস মহীশূর এবং বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রমাদিত্যের কমান্ডার হিসাবে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।