মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র। জন্ম অবিভক্ত মেদিনীপুরের করকুলিতে (বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর)। বাবা এলাকার দাপুটে নেতা। শিশির অধিকারীর ডানপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী সেই মেজো পুত্র পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণ করলেন শনিবার। রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হলেন শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীও বটে।
শুক্রবার কলকাতা এসে রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দুর নামই ঘোষণা করেন বিজেপি নেতা তথা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খোদ অমিত শাহ। শনিবার ব্রিগেডের ময়দান থেকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণ করেছেন শুভেন্দু।
৩৫ বছরেরও বেশি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন শুভেন্দুর। হাতেখড়ি হয়েছিল ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে। কলেজে ছাত্র পরিষদ করতেন। পরে তৃণমূলে যোগদান। প্রকৃত উত্থান নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়।
তৃণমূলের হয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলালেও শেষমেশ দল ছাড়েন দলীয় নেতৃত্বের প্রতি একরাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে। যোগ দেন বিজেপি শিবিরে। ধনুকভাঙা পণ নিয়েছিলেন শাসকের গদি থেকে তৃণমূলকে সরানোর।
এর পর পাঁচ বছরের লড়াই। দু’টি বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যেই নিজেকে এবং দলকে দেওয়া কথা রাখলেন শুভেন্দু। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৩ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন পেয়েছে বিজেপি। প্রাক্তন শাসক তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন।
ভবানীপুর আসন থেকে তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছেন শুভেন্দু। ছাত্রনেতা থেকে রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী! কোন পথে এগিয়েছে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম জনপ্রিয় ‘দাদা’ শুভেন্দুর?
১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্ম শুভেন্দুর। বাবা শিশির অধিকারী, মা গায়েত্রী অধিকারী। বিগত প্রায় চার দশক ধরে পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনীতিতে অধিকারী পরিবারের রমরমা সন্দেহাতীত। শিশির রাজ্যের এক জন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ। মনমোহন সিংহের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।
১৯৮২ সালে শিশির দক্ষিণ কাঁথির বিধায়ক হন। কিন্তু ১৯৮৭ সালের বিধানসভা ভোটে টিকিট না পেয়ে তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির বিরুদ্ধে তোপ দেগে নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়ান। হারিয়ে দেন কংগ্রেসপ্রার্থীকে। সেই শিশিরেরই চার সন্তানের মধ্যে শুভেন্দু মেজো।
ছোটবেলায় প্রতিদিন নিয়ম করে রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন শুভেন্দু। বাড়ির খাবারের চেয়ে বেশি পছন্দের ছিল মিশনের ভোগ। শিশিরের আশঙ্কা ছিল, তাঁর এই ছেলে কোনও দিন সংসার ছেড়ে বিবাগী হয়ে যেতে পারেন।
আটের দশকে কলেজে পড়ার সময় থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন শুভেন্দু। কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে পড়তেন তিনি। সেখানেই ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদ করতেন।
১৯৯৫ সালে কংগ্রেসের হয়ে লড়ে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন শুভেন্দু। এর পরের পাঁচ বছর কংগ্রেসের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। ২০০০ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দেন শুভেন্দু। ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্রে শুভেন্দুকে প্রার্থী করেন মমতা। কিন্তু হেরে যান সিপিএমের কিরণময় নন্দের কাছে।
২০০৪ সালের লোকসভা ভোটেও তৃণমূলের টিকিটে তমলুক কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু সে বারও সিপিএমের তৎকালীন দাপুটে নেতা লক্ষ্মণ শেঠের কাছে পরাজিত হন। ২০০৬ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাাচনে কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্রে বাবার আসনে লড়েছিলেন শুভেন্দু। শিশির দাঁড়িয়েছিলেন এগরায়। দু’জনেই জিতে যান। জিতে প্রথম বার বিধানসভায় প্রবেশ করেন শুভেন্দু। একই বছরে কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যানও হন তিনি।
এর পরের বছর প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক উত্থান শুভেন্দুর। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের একটি বিতর্কিত নোটিস ঘিরে নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলন দানা বাঁধে। বিরোধীদের যৌথ মঞ্চ ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র পতাকায় প্রতিরোধ শুরু হলেও ধীরে ধীরে তৃণমূল বিধায়ক শুভেন্দুই ‘আন্দোলনের মুখ’ হয়ে ওঠেন। সারা রাজ্য একডাকে চিনতে শুরু করে তাঁকে। নন্দীগ্রাম আন্দোলনই ছিল তৃণমূল এবং শুভেন্দুর অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’।
২০১১ সালে বামদুর্গের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। কিন্তু তারও ৩ বছর আগে ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল প্রথম বার কোনও জেলা পরিষদ দখল করে। আর তা ছিল পূর্ব মেদিনীপুর। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যে এবং দলের অন্দরে প্রভাব বাড়ছিল তখনকার যুবনেতা শুভেন্দুর। সে বছরই মদন মিত্রকে সরিয়ে শুভেন্দুকে যুব তৃণমূলের সভাপতি করেছিলেন মমতা।
এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে তমলুক কেন্দ্রে প্রার্থী হন শুভেন্দু। ২০০৪ সালের মতো সে বারও মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন লক্ষ্মণ শেঠ। কিন্তু লক্ষ্মণকে বিপুল ভোটে হারিয়ে প্রথম বার সাংসদ নির্বাচিত হন শুভেন্দু।
এর পর আসে রাজ্য সরকার পরিবর্তনের বছর। ২০১১ সালে রাজ্যে ভূমিধ্বস জয় হয় তৃণমূলের। অবসান হয় ৩৪ বছরের বাম রাজত্বের। মমতা ক্ষমতায় আসার দু’মাসের মধ্যেই তৃণমূলের ‘শহিদ দিবসের’ সভা হয়েছিল ব্রিগেডে। শহিদ দিবসই হয়ে উঠেছিল ‘বিজয় দিবস’। সেই মঞ্চেই তৃণমূলের নতুন এক সংগঠনের জন্ম হয়। নাম ‘যুবা’।
সেই ‘যুবা’র মাথায় ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বসিয়েছিলেন মমতা। মমতার কথাবার্তায় অনেকেরই মনে হয়েছিল, তৃণমূলের যুব সংগঠনই হল ‘যুবা’। কিন্তু তার আগে থেকেই তৃণমূলের যুব সংগঠন যুব তৃণমূল ছিল। সভাপতি ছিলেন শুভেন্দু।
সেই প্রথম দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি শুভেন্দুর ক্ষোভের খবর প্রকাশ্যে আসে। মনে করা হয়, তখন থেকেই মমতার সঙ্গে শুভেন্দুর দূরত্বেরও সূত্রপাত। ‘যুবা’র গঠন নিয়ে তৃণমূলের অন্দরেও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
এর পর ২০১৪ সাল। ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও তমলুক কেন্দ্র থেকে জেতেন শুভেন্দু। তত দিনে রাজ্যে শাসক হিসাবে তিন বছর রাজত্ব হয়ে গিয়েছে তৃণমূলের। তবে সে বছর শুভেন্দুকে যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় বসানো হয় সৌমিত্র খাঁকে। অনেকে মনে করেন, এ নিয়েও ক্ষোভ জন্মেছিল শুভেন্দুর মধ্যে।
একই বছরের অক্টোবরে অন্য এক সভায় আবার সৌমিত্রকেও সরিয়ে তৃণমূলের যুব এবং ‘যুবা’কে মিলিয়ে দিয়ে সেই সংগঠনের জাতীয় এবং রাজ্য স্তরের দায়িত্ব অভিষেকের হাতে তুলে দেন মমতা। মাঠেঘাটে রাজনীতি না করা সত্ত্বেও তৃণমূলে তরুণ অভিষেকের দ্রুত উত্থান দলের অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ক্ষোভেরও জন্ম দিয়েছিল বলে মনে করেন দলেরই একাংশ।
২০১৬ সাল— তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বিধানসভা নির্বাচন। তত দিনে রাজ্যে তৃণমূলের ঘাঁটি যথেষ্ট পোক্ত। নন্দীগ্রাম অন্যতম গড়। সেই গড়ে অধিকারী পরিবারের যে কেউই দাঁড়ালে যে জিততেন, তা আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না।
কিন্তু বিধানসভা ভোটের সময় শুভেন্দুকে দিল্লি থেকে কলকাতায় নিয়ে আসেন মমতা। সাংসদ শুভেন্দুকে বিধায়ক পদে দাঁড় করান। দাঁড় করান নন্দীগ্রাম আসন থেকেই। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রাম থেকে জিতে বিধায়ক হন শুভেন্দু। মমতার মন্ত্রিসভায় পরিবহণ মন্ত্রী হন। ২০১৮ সালে পরিবেশমন্ত্রীও হন তিনি।
২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় ভাল ফল হয়নি তৃণমূলের। এর পরেই জেলার পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব থেকে শুভেন্দুকে সরিয়ে দেন মমতা। ২০২০-র অগস্টে শুভেন্দুকে তৃণমূলের রাজ্য সরকারি কর্মী সংগঠনের দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। আরও চওড়া হয় তৃণমূলের সঙ্গে শুভেন্দুর ফাটল।
সে সময় শুভেন্দু একাধিক জেলায় তৃণমূলের সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু মমতা দলীয় পর্যবেক্ষকের পদ তুলে দেন। ধীরে ধীরে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে শুভেন্দুর দূরত্ব তৈরি হওয়ার জল্পনা জোরালো হয়। অনুগামীদের নিয়ে বিভিন্ন জেলায় পরপর দলীয় ব্যানারহীন কর্মসূচি করেন শুভেন্দু। অবশেষে ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর মমতার মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন শুভেন্দু।
২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তৃণমূলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগ করেন শুভেন্দু। ১৯ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। তার পরেই তৃণমূলকে সরকার থেকে সরিয়ে ফেলার অঙ্গীকার নিয়ে রাজনীতির ময়দানে নামেন তিনি।
এর পরের বছরই ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন শুভেন্দু। মমতাকে ১,৯৫৬ ভোটে হারিয়ে বিধায়ক হন তিনি। বিধানসভার বিরোধী দলনেতাও হন।
এর পরের পাঁচ বছর তৃণমূলের বিরুদ্ধে সদলবলে এক প্রকার আন্দোলন চালিয়েছেন শুভেন্দু। বিভিন্ন দাবিতে সরব হয়েছেন বার বার। সদ্যসমাপ্ত ২০২৬-এর নির্বাচনে নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর— দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু। দু’টি আসনেই জেতেন। খোদ সদ্যপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে হারিয়ে ভবানীপুর আসেন জেতেন। রাজ্যে ২০৭টি আসন পায় বিজেপি।
গত ৪ মে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর থেকেই বঙ্গ রাজনীতিতে জোরদার হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে, তা নিয়ে জল্পনা। বার বার উঠে আসছিল শুভেন্দুর নামই। এর পর শুক্রবার সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দুর নাম ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ। শনিবার রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ব্রিগেডের ময়দান থেকে শপথগ্রহণ করলেন তিনি।