বাংলায় বিজেপি সরকারের পথচলা শুরু। ৯ মে, শনিবার ব্রিগেডে রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন পাঁচ জন। সেই তালিকার একেবারে শীর্ষে নাম দিলীপ ঘোষের। বাকিরা অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু। অনুষ্ঠানে শুভেন্দুর ঠিক পরেই শপথ নেন দিলীপ, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
খড়্গপুর সদরের বিধায়ক দিলীপের বাংলার রাজনীতিতে বরাবরই ‘ঠোঁটকাটা’ হিসাবে আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তবে সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য সমালোচকদের কাছেও সমীহ আদায় করে নিয়েছেন তিনি। তাঁর হাত ধরেই এই রাজ্যে রকেটের গতিতে বিজেপির উত্থান হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। একসময় সমস্ত দলীয় পদ হারিয়ে ফেলা দিলীপ ব্রিগেডের মঞ্চে মন্ত্রী হয়ে যেন বার্তা দিলেন, ‘এ ভাবেও ফিরে আসা যায়’!
১৯৬৪ সালের অগস্টে ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুরে জন্ম হয় দিলীপের। ঝাড়গ্রাম পলিটেকনিক কলেজ থেকে স্নাতক হন তিনি। ১৯৮৪ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সদস্য হলে সেখানকার রাজনৈতিক মতাদর্শে হাতেখড়ি হয় তাঁর। দীর্ঘ দিন সঙ্ঘের প্রচারক হিসাবে কাজ করেছেন দিলীপ। ছিলেন আন্দামানেও। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বঙ্গোপসাগরের দ্বীপগুলিতে জনসেবার কাজের মধ্যে দিয়ে সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায় তাঁর।
সঙ্ঘের বহু প্রচারকের মতোই একসময় ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন দিলীপ। ২০১৬ সালে খড়্গপুর সদর থেকে জিতে প্রথম বার বিধানসভায় পা রাখেন তিনি। হারিয়ে দেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা জ্ঞান সিংহ সোহনপালকে। ফলে দলের মধ্যে বাড়তে থাকে তাঁর গুরুত্ব। ধীরে ধীরে রাজ্য নেতৃত্বের সামনের সারিতে উঠে আসেন খড়্গপুর সদরের বিধায়ক।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজ্য সভাপতি হিসাবে দিলীপকে বেছে নেয় পদ্মশিবির। দায়িত্ব পেয়েই সংগঠনকে মজবুত করার কাজে কোমর বেঁধে লেগে পড়েন তিনি। ফলও মেলে হাতেনাতে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বাংলা থেকে মোট ১৮টি আসন জেতে বিজেপি, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যা ছিল মাত্র দুই। শুধু তা-ই নয়, সে বার ৪০.২৫ শতাংশ ভোট পায় গেরুয়া শিবির। এর পুরোটাই দিলীপের কৃতিত্ব বলে উল্লেখ করেছিল রাজনৈতিক মহল।
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে মেদিনীপুর থেকে জিতে সাংসদ হন দিলীপ। ফলে হু-হু করে বাড়তে থাকে তাঁর জনপ্রিয়তা। ২০২০ সালে দ্বিতীয় বারের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি নির্বাচিত তিনি। তত দিনে অবশ্য অত্যন্ত সফল ভাবে তৈরি হয়ে গিয়েছে তাঁর ‘ফায়ারব্র্যান্ড’ ভাবমূর্তি। পাশাপাশি, তাঁর নানা মন্তব্য বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি করলেও তৃণমূলকে পাল্টা চোখরাঙানোর মতো এক জন নেতা পাওয়া গিয়েছে বলে মনে করেছিল পদ্মশিবির।
২০১৯ সালের লোকসভা ভোট পরবর্তী উপনির্বাচনগুলিতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন দিলীপ। ওই সময় তিনটি বিধানসভা আসনে হেরে যায় বিজেপি। প্রত্যেকটিতেই লোকসভার নিরিখে এগিয়ে ছিল পদ্মশিবির। সেই তালিকায় ছিল খড়্গপুর সদর বিধানসভা কেন্দ্রও। সাংসদ হয়ে সেটা ছেড়ে দেন তিনি। পাশাপাশি, দলের বড় অংশের আপত্তি অগ্রাহ্য করে সেখানে নিজের অনুগামী প্রেমচাঁদ ঝাকে টিকিট দেন দিলীপ। তবে জয় পায় তৃণমূল কংগ্রেস।
দিলীপের নেতৃত্ব ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ‘প্রত্যাশা’ অনুযায়ী বাংলায় ফল করতে পারেনি বিজেপি। সে বার ৭৭টা আসন জেতে পদ্মশিবির। ফলে দলের ভিতরে ও বাইরে কড়া সমালোচনার মুখে পড়তে হয় রাজ্য সভাপতিকে। তাঁর ‘ফায়ারব্র্যান্ড’ ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন তথাগত রায়-সহ একাধিক বর্ষীয়ান নেতা। ফলে ২০২১ সালে দিলীপকে সরিয়ে বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদারকে রাজ্য সভাপতি করে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
রাজ্য সভাপতির পদ হারালেও দলে দিলীপের গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছিল এমনটা নয়। ২০২১ সালে তাঁকে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি মনোনীত করে তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কিন্তু ২০২৩ সালে সেখান থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেন নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ এবং জেপি নড্ডারা। এ ছাড়া ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পুরনো কেন্দ্র মেদিনীপুরে তাঁকে টিকিট দেয়নি বিজেপি। বর্ধমান-দুর্গাপুরে প্রার্থী করা হয় তাঁকে।
চেনা মাঠ ছেড়ে অন্য জেলায় গিয়ে ভোটের ময়দানে অবশ্য ‘কামাল’ করতে পারেননি দিলীপ ঘোষ। বর্ধমান-দুর্গাপুরে বিপুল ভোটে হেরে যান তিনি। অন্য দিকে তাঁর পুরনো আসন মেদিনীপুরেও পরাজিত হয় বিজেপি। ফলে লোকসভায় বাংলা থেকে মাত্র ১২ আসন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় পদ্মশিবিরকে। ভোটের ফল ঘোষণার পর কেন্দ্র বদলের সিদ্ধান্ত নিয়ে দলীয় নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করেন খড়্গপুর সদরের বিধায়ক।
২০২৪-’২৬ সালের মধ্যে দলের কোনও পদে ছিলেন না দিলীপ ঘোষ। তবে সংগঠন মজবুত করার কাজ থামামনি তিনি। ভোটে হেরে ফিরে যান পুরনো কেন্দ্র মেদিনীপুর ও খড়্গপুর সদরে। জোর দেন জনসংযোগে। ফের পুরনো মেজাজে রাজনীতি শুরু করায় নতুন করে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে তাঁর।
২০২৪ সালের ভোটে বালুরঘাট থেকে পুনরায় সাংসদ নির্বাচিত হয়ে নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভায় জায়গা পান সুকান্ত মজুমদার। কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন তিনি। এর পরই ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি মেনে রাজ্য সভাপতির পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেয় পদ্মশিবির। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন শমীক ভট্টাচার্য। গত বছরের (২০২৫ সাল) জুলাইয়ে দায়িত্ব নেন তিনি।
রাজ্য সভাপতি হয়ে দলের পুরনো দিনের সৈনিকদের গুরুত্ব দিতে শুরু করেন শমীক। সেই তালিকায় নাম ছিল দিলীপের। এ বছরের ভোটে পছন্দের কেন্দ্র খড়্গপুর সদরে ফের তাঁকে প্রার্থী করে পদ্মশিবির। এ বার আর হতাশ করেননি তিনি। ৩০ হাজারের বেশি ভোটে জিতে বিধায়ক হয়েছেন দিলীপ। অন্য দিকে ২০৭ আসনে জিতে বাংলায় বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিজেপি। অবসান ঘটে ১৫ বছরের তৃণমূল রাজত্বের।
বিজেপি এ রাজ্যে ক্ষমতা দখল করতেই দিলীপ মন্ত্রী হচ্ছেন বলে দলের ভিতরে ও বাইরে বাড়তে থাকে গুঞ্জন। এই আবহে মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করতে রাজ্যে আসেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ৮ মে, শুক্রবার পরিষদীয় দলের সঙ্গে বৈঠকের পর শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা করেন তিনি। অন্য দিকে দিলীপের ব্যাপারে ‘সাসপেন্স’ বজায় রাখে দল। ৯ মে ব্রিগেডে তিনি শপথ নেওয়ায় অবসান ঘটেছে তার।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহুবার ‘বিতর্কিত’ মন্তব্যের জন্য দলকেই বিড়ম্বনায় ফেলেছেন দিলীপ। বরাবর তাঁর আক্রমণের মূল্য লক্ষ্যে থেকেছেন তৃণমূলনেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডায়মন্ডহারবারের সাংসদ তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট প্রচারে বেরিয়ে অভিষেকের জন্য মমতাকে ‘চোর চোর’ স্লোগান শুনতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করে বসেন তিনি।
দলীয় সংগঠন মজবুত করতে গিয়ে বহুবার কর্মীদের ‘ভোকাল টনিক’ দিয়েছেন দিলীপ ঘোষ। একবার বিজেপির কর্মসূচিতে গিয়ে নীচুতলার কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘‘রাজনীতি ঠিক করে করতে না পারলে গরু চরাও গে যাও।’’ তাঁর এই ধরনের কথায় পদ্মশিবির যে চাঙ্গা হয়ে উঠত, তা বলাই বাহুল্য। দিলীপকে মন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার আগেও বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছে।
গত বছর (২০২৫ সাল) দলীয় সহকর্মী রিঙ্কু মজুমদারের সঙ্গে বিয়ে হয় দিলীপের। মালাবদল পর্ব মিটে যাওয়ার পর সংবাদমাধ্যমকে খড়্গপুর সদরের বিধায়ক বলেন, মায়ের দায়িত্ব যাতে আরও ভাল ভাবে পালন করতে পারেন, তাই এই সিদ্ধান্ত। ওই সময় স্বামীর পাশে থাকার বার্তা দেন রিঙ্কু।
অবিবাহিত থাকাকালীন চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে কাটছিল দিলীপের রাজনৈতিক জীবন। ২০২৪ সালের পর ছিল না কোনও পদও। তবে খড়্গপুর সদরের বিধায়কের ‘লেডি লাক’ ভাল বলতেই হবে। রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রী হচ্ছেন তিনি।