দেশের রাজার ঘরে প্রতি বছর নিয়ম করে আসেন নতুন রানি। ব্যক্তিগত বিমানে চড়ে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান রাজা। গ্যারাজে রয়েছে রোলস রয়েস থেকে শুরু করে একাধিক বিদেশি বিলাসবহুল গাড়ি। কোটি কোটি টাকা দিয়ে স্ত্রীদের জন্যও গাড়ি কেনেন রাজা। বিশ্বব্যাঙ্কের ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, এ দেশের জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশই দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন।
বিশ্বের সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার রয়েছে এই দেশেই। বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী এখানে বেকারত্বের হার অত্যন্ত চড়া। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের ৫৬ শতাংশই বেকার। গোটা দেশের বেকারত্বের হার ৩৪.২ শতাংশ। সম্পদের চরম অসম বণ্টনের কারণেই সাধারণ জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি দারিদ্রসীমার নীচে বাস করেন।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব জুড়ে অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসাবে সামনের সারিতে উঠে এসেছে বেকারত্ব। দারিদ্রের মতো বেকারত্বের ধারণাটি দেশের আর্থিক অবস্থার সূচক হিসাবে বহু আলোচিত।
বিশ্বব্যাপী বেকারত্ব নিয়ে সমীক্ষা চালায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (আইএইচডি)। তারা যৌথ ভাবে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রতি বছরই। সম্প্রতি তাদের সমীক্ষায় উঠে এসেছে বেকারত্বের শীর্ষতালিকায় থাকা দেশগুলির নাম।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা এখন বিশ্বের বহু দেশের প্রধান অর্থনৈতিক লক্ষ্য। যেখানে কিছু দেশ বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন চাকরি তৈরি করছে, সেখানে অন্য অনেক দেশ দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের ঘাটতির সমস্যায় লড়াই করছে।
তেমনই আফ্রিকার ছোট্ট দেশ ইসোয়াতিনি। এটি আফ্রিকার দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। উত্তর থেকে দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য মাত্র ২০০ কিলোমিটার এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার।
ইসোয়াতিনি আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের স্থলবেষ্টিত দেশ, যার কোনও সমুদ্রসীমা নেই। দেশটির তিন দিকে (উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ) রয়েছে সাউথ আফ্রিকা এবং পূর্ব দিকে রয়েছে মোজ়াম্বিক।
৬,৭০৪ বর্গমাইলের এই দেশটির পুরো নাম ‘দ্য কিংডম অফ ইসোয়াতিনি’। এর অর্থ সোয়াজ়িদের ভূমি। ২০১৮ সালে দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজা এমসোয়াতি দেশের নাম পাল্টে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সোয়াজ়িল্যান্ডের নতুন নামকরণ করা হয় ইসোয়াতিনি।
দেশটি আড়ে-বহরে ছোট। আফ্রিকার এই ছোট দেশটির নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান খুবই সাদামাঠা। দেশের জনগণের অবস্থা শোচনীয়। অর্থনৈতিক ভাবেও দেশটির বেহাল দশা।
এ দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিক হারে। দেশটির স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা। সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ওষুধের ঘাটতি। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা অনুদানের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ না করেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
বিশ্বব্যাঙ্কের অর্থনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এটি একটি নিম্ন-মধ্য আয়ের অর্থনীতির দেশ। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশটির জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রায় ৪ শতাংশ। ইসোয়াতিনির অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভাবে সাউথ আফ্রিকার ওপর নির্ভরশীল।
দেশটির মুদ্রার নাম লিলাঙ্গেনি, যা সরাসরি সাউথ আফ্রিকার র্যান্ডের সঙ্গে সমমূল্যে বাঁধা। ফলে সাউথ আফ্রিকার মুদ্রাস্ফীতি বা অর্থনৈতিক ওঠানামা সরাসরি ইসোয়াতিনিকে প্রভাবিত করে।
এর আগেও দেশটির বেকারত্বের সমস্যা নিয়ে সতর্ক করেছিল বিশ্ব ব্যাঙ্ক। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসোয়াতিনিতে ২০২১ সালে বেকারত্ব ২৩% থেকে বেড়ে ৩৩.৩% হয়ে গিয়েছিল। সেই অবস্থায় দেশের জাতীয় সম্পদ রাজপরিবারের কুক্ষিগত থাকায় জনগণের ৬০ শতাংশই দারিদ্রসীমার নীচে বাস করেন বলে জানা গিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও খরার কারণে দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। দেশটির বহু জায়গায় এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছোতে পারেনি।
বিশ্বের যে সব দেশে এইচআইভি ও এডস আক্রান্তের হার অত্যন্ত বেশি তার মধ্যে অন্যতম হল ইসোয়াতিনি। এটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতাকে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ১০ কোটি ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটিতে এইচআইভি রোগীর সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ ১০ হাজার জন।
ইসোয়াতিনির জনতা যতই কষ্টে দিন কাটাক না কেন, রাজা থাকেন মহাসুখে! প্রতি বছর একটি করে বিয়ে করেন এমসোয়াতি। প্রতি বছর তিনি ঐতিহ্যবাহী ‘রিড ড্যান্স’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এক জন করে নতুন কনে নির্বাচন করেন। সেইমতো বর্তমান রাজার ৩০ জন স্ত্রী রয়েছেন। যদিও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানে তাঁর সঙ্গে ১৫ জন স্ত্রী রয়েছেন। ৩৫-এরও বেশি সন্তান রয়েছে রাজার।
কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সঙ্কটের মুখে পড়ে ধুঁকতে থাকা দেশের তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে সাউথ আফ্রিকা ও জিবুতির নাম। সাউথ আফ্রিকার বেকারত্বের হার ৩২.৪ শতাংশ। জিবুতির মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশই কর্মহীন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুবসমাজের কর্মক্ষম একটি বড় অংশ স্থিতিশীল চাকরি খুঁজে পেতে প্রতি দিন সংগ্রাম করেন। এই সমস্যাগুলি কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির হারকে ক্রমশ সঙ্কুচিত করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সীমিত শিল্প-বাণিজ্য এবং ধীর গতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই দেশগুলিতে উচ্চ বেকারত্বের অন্যতম কারণ।