Chapra jail

প্রতিবেশী রাজ্যে জেলের দখল নেন ১২০০ বন্দি! তিন দিন পর জেলকে ‘স্বাধীন’ করেন অসমসাহসী আইপিএস অফিসার

২০০২ সালের ২৮ মার্চ সকালে বন্দিদের বিদ্রোহের মুখে পড়ে ছপড়া জেল। কর্মীদের তাড়িয়ে মারপিট শুরু করেন শয়ে শয়ে বন্দি। বন্ধ করা হয় মূল ফটক।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:৪২
Share:
০১ ২০

২০০২ সালের ২৮ মার্চ। আগের দিনই ছিল হোলি। ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল বিহার। ঠিক তখন বিহারের এক জেলে শুরু হচ্ছিল মারাত্মক এক ষড়যন্ত্র, যে ষড়যন্ত্রের বীজ পোঁতা হয়েছিল তার কয়েক দিন আগেই।

০২ ২০

ওই দিন বিহারের ছপড়া জেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন জেলবন্দি প্রায় ১২০০ কয়েদি। জেলকর্মীদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁদের। ছপড়া জেলকে কার্যত দুর্গে পরিণত করেন ওই কয়েদিরা।

Advertisement
০৩ ২০

তবে বন্দিদের সেই পরিকল্পনা একাই ভেস্তে দেন এক যুবা পুলিশকর্তা। দেহরক্ষী জিতেন্দ্র সিংহ এবং স্থানীয় স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক অর্জুন লালকে নিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। আর তা করার জন্য তিনি সরকারি প্রোটোকল বা আচরণবিধিও ভেঙেছিলেন। তাঁর সেই সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে সে রাজ্যের পুলিশের ইতিহাসে ঠাঁই পায়।

০৪ ২০

সাহসী সেই যুবা পুলিশকর্তার নাম ছিল কুন্দন কৃষ্ণণ। আইপিএস কুন্দন বিহারের সরন জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন।

০৫ ২০

২৮ মার্চ সকালে বন্দিদের বিদ্রোহের মুখে পড়ে ছপড়া জেল। কর্মীদের তাড়িয়ে জেলের দখল নেন প্রায় ১২০০ বন্দি। বন্ধ করা হয়েছিল মূল ফটক। সেই সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইপিএস কুন্দন, কনস্টেবল এবং সাব-ইনস্পেক্টরেরা ছপড়া জেলের উঁচু দেওয়াল বেয়ে প্রশাসনিক ভবনের ছাদে নেমে পড়েন।

০৬ ২০

কৌশল করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও আনেন কুন্দন এবং তাঁর সঙ্গীরা। সেই ঘটনার প্রায় ২৪ বছর পর চলতি বছরের সাধারণতন্ত্র দিবসে ছপড়া জেল অভিযানে তাঁর ভূমিকার জন্য কুন্দনকে পদক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। তাঁর সঙ্গে সম্মানিত করা হয় অর্জুন লাল (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) এবং জিতেন্দ্র সিংহকেও।

০৭ ২০

ঠিক কী হয়েছিল ২০০২ সালের ২৮ মার্চ? কী নিয়ে উত্তপ্ত হয় জেলের পরিস্থিতি? ছপড়া জেলে বন্দি পাঁচ জন কুখ্যাত অপরাধীকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরের নির্দেশের পর অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে ওই সংশোধনাগারে।

০৮ ২০

তিন দিন ধরে জেলের প্রায় ১,২০০ বন্দি কারাগার প্রাঙ্গণকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। জেল কর্তৃপক্ষকে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। কেড়ে নেওয়া হয় জেলকর্মীদের অস্ত্র। এর পর ইম্প্রোভাইজ়ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) এবং বাজেয়াপ্ত অস্ত্র হাতে নিয়ে ছপড়া জেলের নিয়ন্ত্রণ নেন বন্দিরা। সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করা হয়। কর্মীদের উপর আক্রমণ চলে ক্রমাগত।

০৯ ২০

ছপড়া জেলকে কার্যত দুর্গে পরিণত করেছিলেন ১২০০ বন্দি। প্রশাসনের তরফে কেউ সংশোধনাগারের ছাদে উঠলে বা জেল সংলগ্ন কোনও গাছে চড়লে সঙ্গ সঙ্গে তাঁদের দিকে বোমা এবং পাথর বর্ষণ শুরু হত।

১০ ২০

জেলের প্রধান লোহার ফটকটিও তালাবন্ধ করা হয়। সামনে রেখে দেওয়া হয় একাধিক গ্যাস সিলিন্ডার। জায়গায় জায়গায় বাঁধা হয় বোমা। পুলিশের প্রবেশ ঠেকাতেই সেই বন্দোবস্ত করেছিলেন বন্দিরা।

১১ ২০

ফলে বন্দিদের দখলে থাকা ছপড়া জেলে প্রবেশ অসম্ভব হয়ে প়ড়ে জেল কর্তৃপক্ষের তরফে। প্রশাসনের তরফে কেউই সেখানে ঢুকতে পারছিলেন না।

১২ ২০

এর পর জেলবন্দিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য জেল কর্তৃপক্ষের তরফে কারাগারের জল এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের দু’দিনের আলোচনা এবং প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অচলাবস্থা কাটেনি।

১৩ ২০

ছপড়া জেলের অন্দরে বন্দিদের বিদ্রোহের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কারাগারের বাইরে ভিড় করতে শুরু করেন অনেক সাংবাদিক। অন্য দিকে, বন্দিদের আত্মীয়স্বজনেরা কারাগারের বাইরে নিরাপত্তাবাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া শুরু করেন।

১৪ ২০

৩০ মার্চের পর বিহার সরকারের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। আইপিএস কুন্দনকে কারাগারের নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কুন্দন সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে কাজে লেগে পড়েন। পরিকল্পনামাফিক জেলের অন্দরে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

১৫ ২০

কুন্দনের পরিকল্পনা ছিল বন্দিদের বিভ্রান্ত করে ছপড়া জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল করা এবং তিনটি আলাদা আলাদা জায়গা দিয়ে কারাগারে প্রবেশ করা, যাতে অন্তত একটি দল মূল দরজা খুলতে পারে। ওই তিনটি দলের একটিতে ছিলেন স্বয়ং কুন্দন। সঙ্গে জিতেন্দ্র এবং অর্জুন নামে আরও দুই পুলিশকর্মী। অন্য দু’টি দল কারাগারে প্রবেশ করতে না পারলেও অসমসাহসী কুন্দন সদলবলে ঢুকে পড়েন কারাগারে।

১৬ ২০

কার্বাইন হাতে নিয়ে কুন্দনেরা কারাগারের প্রশাসনিক ব্লক পেরিয়ে উঠোনে ঢুকে পড়েন। কোনও সহায়তা না থাকা এবং হাজারেরও বেশি ক্ষিপ্ত বন্দির দ্বারা বেষ্টিত থাকা সত্ত্বেও, তিন জন মূল ফটকের সামনে থেকে হাতে করে গ্যাস সিলিন্ডারগুলি টেনে সরিয়ে ফেলেন। বার্তাও পাঠান মূল ফটকের বাইরে থাকা দলকে। গ্যাসকাটার দিয়ে লোহার ফটক কাটতে শুরু করে তারা।

১৭ ২০

পুলিশবাহিনীর বাকি সদস্যেরা জেলে ঢুকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দিদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন তাঁরা। চার ঘণ্টা ধরে চলে ভয়াবহ সংঘর্ষ। বন্দিদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। কাঁদানে গ্যাস এবং গ্রেনেড ছোড়া হয়। আত্মরক্ষার জন্য গুলিও চালায় পুলিশ।

১৮ ২০

ধোঁয়া পরিষ্কার হওয়ার পরে এবং জেলপ্রাঙ্গণ আবার প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসার পরে দেখা যায় জেলের অন্দরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কার্তুজ এবং বোমা। অভিযানে নিহত হন চার জন। আহত হন সাত বন্দি এবং ২৮ জন পুলিশ।

১৯ ২০

কুন্দনও আহত হয়েছিলেন। পাথর লেগে তাঁর আঙুলের হাড় ভাঙে। বোমা বিস্ফোরণে পায়ে চোট লাগে। পুলিশের সেই ভয়ঙ্কর অভিযানের সাফল্যের কারিগর হিসাবে বিবেচিত হন কুন্দন। এর জন্য তাঁকে অনেক প্রোটোকলও ভাঙতে হয়েছিল।

২০ ২০

কুন্দন বর্তমানে বিহার পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (অপারেশনস) পদে কর্তব্যরত। ২৬ জানুয়ারি পদক পাওয়ার পর ২৪ বছর আগের সেই ঘটনা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন তিনি।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement