আদালতকক্ষের মধ্যেই ধর্ষককে পিটিয়ে এবং ছুরির কোপ মেরে খুন ক্ষিপ্ত জনতার। শুনে মনেই হতে পারে এ কোনও অপরাধ নিয়ে তৈরি বলিউড সিনেমার চিত্রনাট্য। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে বাস্তবেই এ রকম এক ঘটনার সাক্ষী থেকেছিল মহারাষ্ট্রের নাগপুর।
আদালতের কক্ষে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল নাগপুরের কুখ্যাত অপরাধী ভরত কালীচরণ ওরফে আক্কু যাদবকে। শুধু গণপিটুনি নয়, বার বার ছুরির কোপ পড়েছিল আক্কুর গলা-বুক-পেটে। এমনকি তাঁর যৌনাঙ্গও কেটে ফেলা হয়েছিল।
আক্কু ছিলেন নাগপুরের বাসিন্দা। অপহরণকারী, ধর্ষক, তোলাবাজ এবং সিরিয়াল কিলার হিসাবে কুখ্যাতি ছিল তাঁর। দাপট এমনই ছিল যে, পুলিশ-প্রশাসনও তাঁর নামে কাঁপত সে সময়।
আক্কুর জন্ম ১৯৭১ সালে। কমপক্ষে তিন জনকে খুন করার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। একাধিক অপহরণ, ডাকাতি এবং ৪০-এরও বেশি মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগও ছিল। বস্তির সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করা ছিল তাঁর নিত্য দিনের কাজ। কথিত ছিল, পুলিশকে হাতে রাখতেন আক্কু। সে কারণে বার বার অপরাধ করেও পার পেয়ে যেতেন।
আক্কু এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ১০ বছর ধরে একাধিক মহিলাকে যৌননিগ্রহ এবং গণধর্ষণের অভিযোগ ছিল। যাঁরা প্রতিবাদ করতেন, তাঁদের মারধর করে এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে রাখত আক্কুর দলবল।
নাগপুরের কস্তুরবা নগরের বাসিন্দাদের দাবি ছিল, সেই বস্তির কম-বেশি প্রত্যেক বাড়িতেই অন্তত এক জন মহিলা ছিলেন, যিনি আক্কুর লালসার শিকার হয়েছিলেন। আক্কুর বিরুদ্ধে ১২ বছরের নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগও উঠেছিল।
বস্তির বাসিন্দাদের দাবি ছিল, আক্কুর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে একাধিক বার পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার পরও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নিত না। তাই আক্কুর বিরুদ্ধে নাকি থানায় একটিও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।
পুলিশের বিরুদ্ধে এই অভিযোগও উঠেছিল, কোনও মহিলা যৌননিগ্রহের অভিযোগ নিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হলে সেই মহিলাদের চরিত্রের দিকে আঙুল তুলে থানা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হত।
আক্কুর নৃশংসতার কথা কস্তুরবা নগরের বাসিন্দাদের মুখে মুখে ঘুরত। শোনা যায়, আক্কু এবং তাঁর কিছু সহযোগী এক বার কলমা নামে এক মহিলাকে সন্তানপ্রসবের ১০ দিনের মাথায় গণধর্ষণ করে। এর পর গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন কলমা। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক মহিলাকেও প্রকাশ্যে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল আক্কু এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
মৃত্যুর আগে আক্কুকে প্রায় ১৪ বার গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু প্রতি বারই উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যেতেন তিনি। মনে করা হত, আক্কুর ভয়েই কেউ আদালতে সাক্ষী দিতে যেতেন না।
২০০০ সালের পর থেকে আক্কুর অত্যাচার লাগাম ছাড়িয়েছিল। ২০০৪ সালের ১৩ অগস্ট নাগপুর জেলা আদালতের ৭ নম্বর আদালতকক্ষে আক্কুর জামিন সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি চলছিল। আশপাশের এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ে, তাঁকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হতে পারে।
আক্কুর অত্যাচারে জর্জরিত কস্তুরবা নগর বস্তির বাসিন্দারা তাঁর জামিনের সম্ভাবনার খবরে একদমই খুশি ছিলেন না। পরিস্থিতি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, সকলে শান্ত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ আক্কুকে হেফাজতে রাখার এবং তার পর তাঁকে ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিল।
আক্কু ছাড়া পেতে পারে এই খবর শুনেই কয়েকশো মহিলা নাগপুরের কস্তুরবা নগর বস্তি এলাকা থেকে ছুরি, লঙ্কার গুঁড়ো নিয়ে মিছিল করতে করতে আদালতের দিকে পৌঁছোন। আদালতের কক্ষে ঢুকে পড়েন রায় শোনার জন্য আগ্রহী মহিলারা।
পুলিশ আক্কুকে নিয়ে আদালতকক্ষে ঢুকতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ওই মহিলাদের একাংশ। এর পর সেই ক্ষোভের আগুন সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আক্কু যখন আদালতকক্ষে প্রবেশ করছে তখন নাকি তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা লক্ষ করা যায়নি।
দুপুর ৩টে নাগাদ পুলিশের ঘেরাটোপে আদালতকক্ষে ঢুকে আক্কু এমন এক জন মহিলাকে দেখতে পান, যাঁকে তিনি ধর্ষণ করেছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। ওই মহিলাকে আদালতকক্ষে দেখতে পেয়েই নাকি উপহাস করা শুরু করেন আক্কু। মহিলাকে যৌনকর্মী বলেও উপহাস করেন। এমনকি, তাঁকে আবার ধর্ষণের হুমকিও দেন।
আক্কুর সেই হুমকি শুনে আর স্থির থাকতে পারেননি আদালতে উপস্থিত মহিলারা। কিছু ক্ষণের মধ্যেই সামনের এক মহিলা চপ্পল দিয়ে আক্কুর মাথায় মারতে শুরু করেন। চিৎকার করে বলতে শুরু করেন, ‘‘আমরা দু’জন একসঙ্গে এই পৃথিবীতে থাকতে পারব না। হয় এই শয়তান বেঁচে থাকবে, নয়তো আমি বেঁচে থাকব।’’
ওই মহিলার দেখাদেখি আক্কুর উপর চড়াও হন কয়েকশো মহিলা। প্রথমে ওই মহিলারা আক্কুর উপর লাথি-ঘুষি চালাতে থাকলেও পরে ছুরির কোপ মারতে শুরু করেন। কমপক্ষে ৭০ বার কোপানো হয় তাঁকে। পাশাপাশি, আক্কুর চোখে-মুখে নাকি লঙ্কার গুঁড়োও ছিটিয়ে দেওয়া হয়।
আক্কুকে যে পুলিশকর্মীরা পাহারা দিচ্ছিলেন, তাঁদের মুখেও নাকি লঙ্কার গুঁড়ো ছুড়ে দেন মহিলারা। আক্কুকে মারধর করার সময় তিনি নাকি ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করেন। বলতে থাকেন, ‘‘আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আর এ রকম কিছু করব না।’’ তার পরও চলতে থাকে এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাত।
শোনা যায়, উপস্থিত প্রত্যেক মহিলাই তাঁকে ছুরি মারার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এর মধ্যেই এক জন মহিলা ছুরি দিয়ে আক্কুর যৌনাঙ্গ কেটে ফেলেন। আদালতকক্ষের মার্বেলের মেঝে ভিজে যায় রক্তে।
প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ছুরি দিয়ে কোপানো হয়েছিল আক্কুকে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ৩২ বছর বয়সি আক্কুর। পরে অভিযুক্ত মহিলারা জানিয়েছিলেন, আক্কুকে খতম করার পরিকল্পনা তাঁরা আগে থেকে করেননি। রাগের বশে হঠাৎই সেই কাজ করেন।
আদালত থেকে কয়েক জন মহিলা কস্তুরবা নগরে ফিরে এসে আক্কুর মৃত্যুর খবর দেওয়ার পর রাস্তাতেই নাচ-গান করে উদ্যাপন শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খুনে জড়িত সন্দেহে পাঁচ জন মহিলাকে গ্রেফতার করা হলেও শহর জুড়ে বিক্ষোভ শুরুর পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ওই এলাকায় বসবাসকারী প্রত্যেক মহিলাই খুনের দায় স্বীকার করেছিলেন। আক্কুকে সম্মিলিত ভাবে খুনের প্রায় এক দশক পরে, অভিযুক্ত সমস্ত মহিলাকেই উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস করে দেওয়া হয়।