রবিবার সংসদে বাজেট পেশ করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। এই নিয়ে টানা নবম বারের জন্য বাজেট বক্তৃতা করলেন তিনি। নরেন্দ্র মোদী তৃতীয় বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই নিয়ে তৃতীয় বার পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করল তাঁর সরকার।
বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই ২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরের ব্যয় বরাদ্দকে কেন্দ্র করে আমজনতা থেকে শুরু করে শিল্পসংস্থার মধ্যে চড়ছিল প্রত্যাশার পারদ। রবিবার সকাল ১১টা নাগাদ সংসদে বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন নির্মলা।
তবে নির্মলার বাজেটে প্রত্যাশার পতন হয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করার পর দেখা যায়, তাতে মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ কিছুই নেই। বাজেট হতাশাজনক বলেও মনে করছেন অনেকে। হতাশ মধ্যবিত্ত করদাতারাও।
কিন্তু বেতনভুক করদাতাদের ক্ষেত্রে কী কী পরিবর্তন আসছে এই বাজেটের পর? এই নিয়ে ধন্দে রয়েছেন অনেকেই। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সেই সব পরিবর্তন।
২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট বেতনভুক করদাতাদের জন্য উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়েছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের। এ বারের বাজেটে আয়করের ক্ষেত্রে সহজ সম্মতি, শাস্তি কমানো এবং অর্থবহ ছাড়ের উপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা।
এর মধ্যে একটি প্রধান আকর্ষণ হল আয়কর আইন ২০২৫ প্রবর্তন, যা ১৯৬১ সালের আইনকে প্রতিস্থাপন করবে এবং ১ এপ্রিল, ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
নির্মলা উল্লেখ করেছেন, সাধারণ নাগরিক কোনও অসুবিধা ছাড়াই যাতে আয়করের নিয়ম মেনে চলতে পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য কর সংক্রান্ত ফর্মগুলিতে পরিবর্তন করা হচ্ছে, যা অনেক বেশি ব্যবহার-বান্ধব।
বাজেটে নির্মলা ঘোষণা করেছেন, গাড়ি দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে আর কোনও কর দিতে হবে না এখন থেকে। রবিবার কেন্দ্রীয় বাজেটে গাড়ি দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণকে করমুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল (নতুন অর্থবর্ষ) থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
১৯৮৮ সালের মোটর ভেহিকল আইন অনুসারে, গাড়ি দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে ট্রাইবুনাল পরিবারের কাছে ক্ষতিপূরণ তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। গাড়ি দুর্ঘটনায় কারও অঙ্গহানি বা কোনও প্রত্যঙ্গ স্থায়ী ভাবে বিকল হয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারে ট্রাইবুনাল। তবে এই ক্ষতিপূরণের টাকাকে ‘আয়’ হিসাবে বিবেচনা করা যায় কি না, তা নিয়ে অতীতে দীর্ঘ আলোচনা চলেছে।
এত দিন এই ক্ষতিপূরণের টাকা পুরোপুরি করমুক্ত ছিল না। পথ দুর্ঘটনায় ৫০ হাজার টাকার বেশি ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে টিডিএস কাটা হত। নতুন অর্থবর্ষ থেকে তা আর কাটা হবে না। ট্রাইবুনালের নির্দেশে পাওয়া ক্ষতিপূরণের টাকাকে পুরোপুরি করমুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।
যদিও সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি আগেই বিবেচনা করে দেখতে বলেছিল। এ বার কেন্দ্রীয় বাজেটে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। কেন্দ্রীয় বাজেটের এই ঘোষণা ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনার শিকার হওয়া কোনও বেতনভুক করদাতা বা তাঁর পরিবারের উপর আর্থিক বোঝা কমিয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদেশে গিয়ে খরচের ক্ষেত্রেও করদাতাদের পকেট কিঞ্চিৎ কম ফাঁকা হবে এখন থেকে। বিদেশভ্রমণ প্যাকেজের উপর যে ‘ট্যাক্স কালেক্টেড অ্যাট সোর্স’ বা ‘টিসিএস’ (ভারতীয় কর আইনে টিসিএস হল, কোনও জিনিস বিক্রির সময় ক্রেতার কাছ থেকে নির্দিষ্ট পণ্যের উপর বিক্রেতা কর্তৃক সংগৃহীত অতিরিক্ত অর্থ, যা পরে সরকারকে দেওয়া হয়।) কাটা হত, তা ৫ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে বাজেটে। একই ভাবে, বিদেশে শিক্ষা এবং চিকিৎসা রেমিট্যান্সের উপর টিসিএস ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হচ্ছে।
বাজেট ভাষণে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে নতুন আয়কর আইন কার্যকর করবে কেন্দ্র। নতুন নিয়মে সামান্য টাকা জমা দিয়ে আয়কর রিটার্ন সংশোধনের সুযোগ থাকছে।
যাঁরা এক ও দু’নম্বর ফর্মে আয়কর রিটার্ন জমা করেন, নতুন নিয়মে তাঁরা ৩১ জুলাই পর্যন্ত সেটা ফাইল করতে পারবেন। নন-অডিট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং ট্রাস্টগুলির ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা করার শেষ তারিখ হল ৩১ অগস্ট।
রিটার্ন জমার সময়সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঘোষণা করেছেন, আয়করে ছোটখাটো ফাঁকিতে এখন থেকে আর জেল হবে না করদাতাদের। অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা দিলেই মিলবে স্বস্তি।
পাশাপাশি, পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে, করদাতারা এখন পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরেও রিটার্ন আপডেট করতে পারবেন। আপডেট করা রিটার্ন মূল্যায়নের ভিত্তি তৈরি করবে।
এ ছাড়া অনাবাসী ভারতীয়ের থেকে কোনও স্থাবর সম্পত্তি কিনলে ক্রেতাকে টিডিএস (ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স) দিতে হবে। আগে তা বিক্রেতাদের থেকে আদায় করা হত।
যদিও ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের থেকে ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষে আয়কর কাঠামোয় কোনও পরিবর্তন নেই। গত বছর মধ্যবিত্তদের স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, নতুন করকাঠামোয় বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে কোনও কর দিতে হবে না। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বছরে ১২ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ে করের পরিমাণ শূন্য বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
২০২৫ সালের বাজেটে করা আয়কর কাঠামো অনুযায়ী, শূন্য থেকে চার লক্ষ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক আয়ে কোনও কর নেবে না সরকার। কিন্তু চার থেকে আট লক্ষ টাকা বার্ষিক আয়ের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ পাঁচ শতাংশ ধার্য করা হয়েছিল।
আগে আট লক্ষ টাকা বার্ষিক আয়ে ৩০ হাজার টাকা কর দিতে হত। নতুন কাঠামো অনুযায়ী সেই অঙ্ক কমে দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, ১০ হাজার টাকা লাভ করবেন ওই করদাতা। কিন্তু সরকার ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ছাড় দেওয়ায় আরও ২০ হাজার টাকা রিবেট পাবেন করদাতারা। অর্থাৎ, করবাবদ কোনও টাকা দিতে হবে না তাঁদের।
১২ থেকে ১৬ লক্ষ টাকা বার্ষিক আয়ের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ ১৫ শতাংশ। ১৬ থেকে ২০ লক্ষ টাকা বার্ষিক আয়ে নতুন স্ল্যাবে ২০ শতাংশ কর ঘোষণা করা হয়েছে। ২০ থেকে ২৪ লক্ষ টাকা আয়ের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ এবং ২৪ লক্ষের বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ কর রাখা হয়েছে। আয়করে সেই নিয়মই জারি থাকবে।
চলতি বছরের বাজেটে মোট কর রাজস্ব ২৮.৭ লক্ষ কোটি টাকা এবং বাজেটের আকার ৫৩.৫ লক্ষ কোটি টাকা অনুমোদন করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা। কোনও বিদেশি সংস্থা ভারতে ক্লাউড ডেটা সেন্টার তৈরি করলে ২০৪৭ সাল পর্যন্ত তাদের কোনও কর দিতে হবে না বলে ঘোষণা করেছেন তিনি।