তিন সপ্তাহ পেরিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ থামার নামগন্ধ নেই। একে অপরকে নিশানা করে ক্রমাগত আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছে যুযুধান ইরান ও ইজ়রায়েল-আমেরিকা। ফলে বারুদের গন্ধে ভরে উঠেছে আরবের আকাশ-বাতাস। সর্ব ক্ষণ সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে লড়াকু জেট, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন। লড়াইয়ে জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’কে নাকানিচোবানি খাওয়াতে খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের কৌশলগত সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করেছে তেহরান।
ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের’ (আইআরজিসি) এই রণকৌশলে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল যে হাবুডুবু খাচ্ছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। হরমুজ় অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে খনিজ তেলের দাম। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মারাত্মক চাপে পড়েছে ওয়াশিংটন। সূত্রের খবর, পশ্চিম এশিয়ার ওই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তায় আটকে আছে কম-বেশি ৭০০ তেলের ট্যাঙ্কার। এর মধ্যে ২২টা ভারতের। জাহাজগুলিকে ছেড়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষ শর্ত দিয়েছে তেহরান।
সাবেক পারস্যের সাফ কথা, হরমুজ় দিয়ে নিরাপদে ট্যাঙ্কার নিয়ে যেতে হলে, বদলাতে হবে তেলব্যবসার ধরন। ডলার নয়, সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলিতে থাকা তরল সোনা বিক্রি হোক চিনা মুদ্রা রেনমিনবিতে, যার একক ইউয়ানকে ভালই চেনে বিশ্ব। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সংযোগকারী ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং মাত্র ৩৩-৩৯ কিলোমিটার চওড়া হরমুজ় দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে থাকে পশ্চিম এশিয়ার প্রায় সমস্ত আরব রাষ্ট্র।
গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সৌদি আরবের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি করে আমেরিকা। সেই সমঝোতা মেনে ডলারে অপরিশোধিত খনিজ তেল বিক্রি করতে থাকে রিয়াধ। ফলে অচিরেই তরল সোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায় মার্কিন মুদ্রা। শুধু তা-ই নয়, বিশ্ব জুড়ে ‘পেট্রো ডলার’ হিসাবে পরিচিতি পায় সেটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তখন রিপাবলিকান পার্টির রিচার্ড নিক্সন। তাঁর এই সিদ্ধান্তে আরও শক্তিশালী হয় সারা দুনিয়ার রিজ়ার্ভ মুদ্রা ডলার।
১৯৭৪ সালে হওয়া ‘পেট্রো-ডলারের’ চুক্তির মেয়াদ ছিল ৫০ বছর। ২০২৪ সালে সেটা শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সমঝোতাটির পুনর্নবীকরণ করেনি সৌদি প্রশাসন। কিন্তু, তার পরেও দুনিয়া জুড়ে আধিপত্য বজায় রেখেছে ডলার। এখনও বিশ্বের তেলবাণিজ্যের ৮০ শতাংশ পরিচালিত হয় মার্কিন মুদ্রায়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, হরমুজ় অবরুদ্ধ করে সেই অর্থনীতির গোড়ায় কুড়ুলের ঘা মারতে চাইছে ইরান। ফলে ওয়াশিংটনের পক্ষে তেহরানের শর্তে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া অসম্ভব।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, যে রণকৌশলে আইআরজিসি যুদ্ধ লড়ছে, তাতে একসময় ভেঙে যাবে ডলারের ‘দাদাগিরি’। খনিজে তেলের লেনদেনে অনেক দেশই মেনে নেবে চিনা ইউয়ানকে। তার তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ভারতীয় অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। সে ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার, রুপির মূল্য, বন্ড এবং সোনা-রুপোর দামে আমূল বদল দেখতে পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
আর্থিক বিশ্লেষকদের অনুমান, ইরানি চাপে হঠাৎ করে পেট্রো-ডলারের বদলে পেট্রো-ইউয়ানে খনিজ তেলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুরু হলে অস্থির হবে ভারতের শেয়ারবাজার। তখন পশ্চিমের বিদেশি লগ্নিকারীদের মধ্যে বম্বে এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার হুড়োহুড়ি লক্ষ করা যেতে পারে। পাশাপাশি, বন্ড এবং মুদ্রাবাজারেও অনিশ্চয়তা আসার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা। তবে সেই ‘শক’ স্বল্পমেয়াদি হবে বলে জানিয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।
তা ছাড়া ডলারকে এড়িয়ে খনিজ তেলের ব্যবসা শুরু হলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্ব হারাবে মার্কিন মুদ্রা। তখন বিদেশি মুদ্রাভান্ডারে ডলারের পরিমাণ কমাতে পারে ভারত-সহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাটির দর নিম্নমুখী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, চাহিদা কমতে পারে আমেরিকার ট্রেজ়ারি বন্ডের। এ দেশের রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের (আরবিআই) কাছে যা বেশ ভাল পরিমাণে রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি সামলানো কেন্দ্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
অনেকের ধারণা, ডলারের দর নিম্নমুখী হলেই দাম বাড়বে ভারতীয় মুদ্রার। কিন্তু বাস্তবে তা না-ও হতে পারে। উল্টে সে ক্ষেত্রে আরও পড়তে পারে টাকার দাম। বর্তমানে ডলারের নিরিখে ৯৩-তে ঘোরাফেরা করছে রুপির মূল্য। অন্য দিকে, এক ইউয়ান পেতে আরবিআইয়ের খরচ হচ্ছে প্রায় ১৪ টাকা। চিনা মুদ্রার সঙ্গে খনিজ তেল সম্পৃক্ত হলে রেনমিনবির দাম যে রকেট গতিতে ঊর্ধ্বমুখী হবে, তা বলাই বাহুল্য। নয়াদিল্লির জন্য এটি বেশ উদ্বেগের।
এই ইস্যুতে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ব্রোকারেজ সংস্থা ‘এনরিচ মানি’-র চিফ এগ্জ়িকিউটিভ অফিসার পনমুদি আর। তাঁর কথায়, ‘‘ইরান-সঙ্কট ভারতীয় শেয়ারবাজারকে এক সন্ধিক্ষণের সামনে এনে ফেলেছে। আগামী দিনে ভূ-রাজনৈতিক ঘটনার জেরে বার বার সংবেদনশীল হয়ে উঠবে বম্বে ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ। খনিজে তেলের ব্যবসা থেকে ডলারের সরে যাওয়া একেবারেই সহজ বিষয় নয়। এতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে থাকা বাণিজ্যচুক্তি ও অন্যান্য লেনদেনের হিসাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে নয়াদিল্লিকে।’’
বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘সিকিউরিটিজ় অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া’ বা সেবির নিবন্ধিত বিশেষজ্ঞ অনুজ গুপ্ত মন্তব্য করেছেন, পেট্রো-ডলার থেকে পেট্রো-ইউয়ানে খনিজ তেলের ব্যবসা শুরু হলে চাহিদা বাড়বে সোনা ও রুপোর মতো মূল্যবান ধাতুর। এক কথায় মূল্যবৃদ্ধির প্রবল সম্ভাবনা থাকছে। সে ক্ষেত্রে বেশ লাভবান হবেন সোনা-রুপোর লগ্নিকারীরা। যদিও ইরান যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত হলুদ ধাতু মারাত্মক রকম অস্থির হয়ে উঠেছে, তেমনটা নয়।
আর্থিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আন্তর্জাতিক তেলবাণিজ্য মার্কিন ডলার থেকে চিন ইউয়ানে বদলে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আসবে মুদ্রাস্ফীতি। এর আঁচ লাগতে পারে ভারতের গায়েও। ব্রোকারেজ ফার্মগুলি জানিয়েছে, তখন পরিস্থিতি সামলাতে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হবে আমেরিকার শীর্ষ ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজ়ার্ভ, যা ওয়াশিংটনের বন্ডের বাজারকে জটিল করে তুলতে পারে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরানের দাবি ব্রিকস মুদ্রা চালু করার বিষয়টিকে উস্কে দিয়েছে। ২০০৯ সালে ব্রাজ়িল, রাশিয়া, ভারত, চিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে তৈরি করে এই সংগঠন। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ১০। এর একটি হল তেহরান। দীর্ঘ দিন ধরেই ডলারকে এড়িয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক চালু রাখার ব্যাপারে আলোচনা চালাচ্ছে ব্রিকস-ভুক্ত প্রায় সমস্ত দেশ। সেই লক্ষ্যে আলাদা একটি মুদ্রা চালু করার পক্ষে বার বার সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে।
যদিও নীতিগত জায়গা থেকে ব্রিকস মুদ্রা বা পেট্রো ইউয়ান চালু হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের আপত্তি রয়েছে। কারণ, দু’টি ক্ষেত্রেই আর্থিক দিক থেকে মজবুত হবে চিন। বেজিঙের মুদ্রা বিশ্ব জুড়ে বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। উত্তর ও উত্তর-পূর্বের প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত রয়েছে নয়াদিল্লির। লাদাখ থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় প্রায়ই আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়ে থাকে ড্রাগনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ।
১৯৬২ সালের যুদ্ধে লাদাখের আকসাই চিন এলাকাটি দখল করে নেয় বেজিঙের লালফৌজ। তার পর ছ’দশক কেটে গেলেও অধিকৃত এলাকা নয়াদিল্লির হাতে ফিরিয়ে দেয়নি পিএলএ। উল্টে গত কয়েক দশকে সামরিক ক্ষেত্রে চিনকে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে দেখা গিয়েছে। আর তাই কেন্দ্রের পক্ষে ড্রাগনের ইউয়ানকে পেট্রো মুদ্রা বা রিজ়ার্ভ মুদ্রা হিসাবে মেনে নেওয়া বেশ কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, উদ্ভূত পরিস্থিতি ঠেকাতে নয়াদিল্লির সামনে বেশ কয়েকটি বিকল্প রয়েছে। প্রথমত, ইরান, রাশিয়া-সহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় আমদানি-রফতানি চালাচ্ছে কেন্দ্র। পেট্রোপণ্যের ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম বজায় রাখতে পারে সরকার। ব্রিকসের সদস্য হওয়ায় তেহরানের উপর এ ব্যাপারে চাপ তৈরি করা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনের কাছে মোটেই শক্ত নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫ সাল) পরবর্তী সময়ে সোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি দেয় ইউরোপ। বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান, ইরান যুদ্ধের জেরে সেই পুরনো জায়গায় ফিরতে পারে ডলার। গত কয়েক বছরে দেশের স্বর্ণভান্ডার অনেকটাই বাড়িয়েছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক। নয়াদিল্লির জন্য সেই ব্যবস্থা যে শাপে বর হবে, তা বলাই বাহুল্য।
এ ছাড়া আরও একটি যুক্তি রয়েছে। ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে হরমুজ় থেকে একটা একটা করে ট্যাঙ্কার ঘরে ফেরাচ্ছে নয়াদিল্লি। এই কূটনীতি বজায় থাকলে পেট্রো ইউয়ান মেনে নেওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠবে না। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের সাঁড়াশি চাপের মুখে ওই সামুদ্রিক রাস্তা আইআরজিসি কত ক্ষণ ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।