আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ অভিযানে মৃত্যু হয়েছে শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের। প্রাণ হারিয়েছেন একাধিক শীর্ষনেতা। তার পরও হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’কে কড়া কট্টর দিচ্ছে ইরান। শুধু তা-ই নয়, তেহরানের অদ্ভুত রণকৌশলে নাজেহাল যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই হারিয়ে ফেলেছে কয়েক কোটি ডলারের একাধিক লড়াকু জেট, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থার রেডার ও ট্যাঙ্কার বিমান।
পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে মার্কিন-ইহুদিদের ‘কাঁটে কা টক্কর’ দেওয়া ইরানি বাহিনীর পোশাকি নাম ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। তেহরানের সরকারি ফৌজ না হওয়া সত্ত্বেও গত দু’মাস ধরে খবরের শিরোনামে রয়েছে তারা। শুধু তা-ই নয়, সস্তার ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে ‘মহাশক্তিধর’ শত্রুর ব্যাপক ক্ষতি করার কৌশল রয়েছে তাঁদের নখদর্পণে। এর ফলে তেহরানকে হারাতে নাকানিচোবানি খেতে হচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেল আভিভকে।
এ-হেন আইআরজিসি গঠনের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। ১৯৭৯ সালে ‘ইসলামিক বিপ্লব’-এর জেরে রাজতন্ত্রের পতন হয় ইরানে। পরিবার নিয়ে দেশ ছেড়ে পালান তেহরানের শেষ রাজা মহম্মদ রেজা শাহ পহেলভি। ফলে ক্ষমতা চলে যায় বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া রুহুল্লাহ খোমিনির হাতে। অচিরেই সাবেক পারস্য মুলুকটিকে শিয়া ধর্মাবলম্বী-প্রজাতন্ত্রে (ইসলামিক রিপাবলিক) পরিণত করেন তিনি। কিন্তু, গোল বাধে সেনাবাহিনীকে নিয়ে।
বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) হন শিয়া ধর্মগুরু খোমিনি। তেহরানের সরকারি ফৌজের উপর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস ছিল না তাঁর। খোমিনি মনে করতেন, সুযোগ পেলেই বিদ্রোহ ঘোষণা করবে এই বাহিনী। কারণ, শাহ পহেলভির প্রতি আনুগত্য ছিল সেনা কমান্ডারদের একাংশের। ফলে ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করতে পৃথক সেনাদল তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি, যেটা গ্রহণ করে সাবেক পারস্যের তৎকালীন প্রশাসন।
এর পর খোমিনির নির্দেশে তৈরি হয় আইআরজিসি নামের একটি পৃথক আধা সামরিক বাহিনী। সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা এই বাহিনীকে ইরানের মূল ফৌজ বলা যেতে পারে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পহেলভির আমলের সরকারি সেনাদলকে রুহুল্লাহ পুরোপুরি ভেঙে দেননি। সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদের। বকলমে একে স্বাধীন রাখা হলেও বাহিনীর মূল চাবিকাঠি রয়েছে আইআরজিসি কমান্ডারদের হাতেই।
আইআরজিসি গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতিবেশী ইরাকের হামলার মুখে পড়ে ইরান। বাগদাদের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন কিংবদন্তি সাদ্দাম হুসেন। ১৯৮০ সাল থেকে টানা আট বছর তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান তিনি। সেই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় সাবেক পারস্যের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’। অত্যাধুনিক হাতিয়ারে সজ্জিত সাদ্দামের ফৌজকে সীমান্তেই আটকে দেয় তারা। উল্টে আইআরজিসির প্রত্যাঘাতে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাগদাদের অর্থনীতি।
ইরাক-ইরান যুদ্ধে আইআরসিজি-কে নেতৃত্ব দিয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পান রহুল্লাহের অত্যন্ত আস্থাভাজন আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। সাদ্দামের ফৌজের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে গুরুতর জখম হন তিনি। ডান হাত পঙ্গু হয়ে যায়। ১৯৮৯ সালে খোমিনির মৃত্যু হলে তাঁকেই পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে বেছে নেয় তেহরানের শিয়া ধর্মগুরুদের কাউন্সিল। ক্ষমতা হাতে পেয়ে আধা সামরিক বাহিনীটিতে একাধিক সংস্কার করেন খোমেনেই। ফলে পরবর্তী বছরগুলিতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে আইআরজিসি।
ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’-এর মোট পাঁচটি শাখা রয়েছে। সেগুলি হল গ্রাউন্ড ফোর্স, অ্যারোস্পেস ফোর্স, আইআরজিসি নেভি (নৌবাহিনী), কুর্দস ফোর্স এবং বাসিজ়। আধা সামরিক বাহিনীটির শীর্ষ পদে (কমান্ডার-ইন-চিফ) থাকেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার একজন অফিসার। বর্তমানে এই দায়িত্ব পালন করছেন আহমেদ ভাহিদি। চলতি বছরের ১ মার্চ তাঁর হাতে এই দায়িত্ব তুলে দেয় তেহরান।
আইআরজিসি-র গ্রাউন্ড ফোর্স হল ইরানের স্থলসেনা। অ্যারোস্পেস ফোর্সকে সংশ্লিষ্ট আধা সামরিক বাহিনীটির সবচেয়ে শক্তিশালী শাখা বললে অত্যুক্তি হবে না। তেহরানের যাবতীয় ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার রয়েছে তাদের হাতে। মার্কিন ও ইজ়রায়েলি গুপ্তচরদের দাবি, পরমাণু বোমা বানাতে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের কাজ চালাচ্ছে উপসাগরীয় শিয়া মুলুক। সেই প্রতিরক্ষা কর্মসূচির উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে তাদের অ্যারোস্পেস ফোর্সের।
বিশ্বের তাবড় শক্তিশালী দেশগুলির নিরিখে আইআরজিসির নৌবাহিনী বেশ দুর্বল। তাদের হাতে নেই কোনও বিমানবাহী রণতরী। সেই জায়গায় ড্রোনবহনকারী একটি যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করছে তেহরান। তবে ছোট ছোট অসংখ্য রণতরী রয়েছে সাবেক পারস্যের এই শিয়া ফৌজটির হাতে, যা দিয়ে সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তায় অনায়াসেই বড় যুদ্ধজাহাজকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ শানাতে পারে তারা। ফলে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তাদের।
আইআরজিসির বহরে কোনও অতিশক্তিশালী ডুবোজাহাজও নেই। তবে ২৩টি ঘাদির ক্লাসের আধা ডুবোজাহাজ বা মিনি সাবমেরিন ব্যবহার করে তারা। এগুলির কোনওটাই সমুদ্রের অনেকটা গভীরে যেতে পারে না। তবে চোরাগোপ্তা টর্পেডো হামলায় শত্রুর কয়েক কোটি ডলারের রণতরী ধ্বংস করে বেশ কিছু ক্ষণ জলে ডুব দিয়ে থাকার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। এ ছাড়া সামুদ্রিক মাইন বিছোনোর জন্য আলাদা জলযান রয়েছে আইআরজিসি নৌবহিনীর।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, গেরিলা যুদ্ধে শত্রুকে নাস্তানাবুদ করতে কুর্দস ফোর্স তৈরি করেছে আইআরজিসি। কোনও প্রথাগত যুদ্ধকৌশলের শিক্ষা পান না এই বাহিনীর সৈনিক ও কমান্ডারেরা। আর তাই আধা সামরিক বাহিনীটিতে কুর্দস ফোর্সটির আলাদা কদর রয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগে তাদের বার বার বিদ্ধ করেছে পশ্চিমি গণমাধ্যম। হামাস, হিজ়বুল্লা ও হুথির মতো পশ্চিম এশিয়ার একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে মদত দেওয়ার কালিও লেগেছে আইআরজিসির এই শাখার গায়ে।
সব শেষে বলতে হবে বাসিজ় ফোর্সের কথা। এটি আইআরজিসির একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। মূলত, ঘরোয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা এবং নীতিপুলিশির কাজ করে তারা। তবে সংঘাত পরিস্থিতিতে রিজ়ার্ভ বাহিনী হিসাবে বাসিজ়কে ব্যবহার করে থাকে আইআরজিসি। এর সদস্যসংখ্যা নিয়ে মার্কিন ও ইহুদি গুপ্তচরদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে আনুমানিক ৯০ হাজার থেকে এক লক্ষ স্বেচ্ছাসেবক বাসিজ়ে রয়েছেন বলে মনে করা হয়।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৮২ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আইআরজিসি। যদিও বাগদাদের সঙ্গে লড়াই তীব্র হওয়ায় গোড়ার দিকে আধা সামরিক বাহিনীটি সে দিকে বেশি নজর দিতে পারেনি। পরে তাদের মদতেই সেখানে জন্ম হয় প্যালেস্টাইনপন্থী একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর, নাম হিজ়বুল্লা। ইহুদিদের ধ্বংস চাওয়া এই সংগঠনটিকে বহু বার ইজ়রায়েলের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়াতে দেখা গিয়েছে। যদিও তেল আভিভের সঙ্গে কখনওই এঁটে উঠতে পারেনি তারা।
২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়দার ফিদায়েঁ হামলায় কেঁপে ওঠে আমেরিকা। যাত্রিবাহী বিমান অপহরণ করে নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার) জোড়া গগনচুম্বী ইমারতে ধাক্কা মারে তারা। ফলে চোখের নিমেষে গুঁড়িয়ে যায় ওই দুই অট্টালিকা। মৃত্যু হয় ২,৯৭৭ জনের। এই ঘটনার পর আল-কায়দাকে নিশ্চিহ্ন করতে আফগানিস্তান আক্রমণ করে মার্কিন ফৌজ, যে সামরিক অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন এন্ডুয়েরিং ফ্রিডম’।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, ২০২১ সাল পর্যন্ত চলা আফগানিস্তান যুদ্ধে পর্দার আড়ালে থেকে বড় ভূমিকা নেয় আইআরজিসি। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে পঠান লড়াকুদের হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরবরাহের অভিযোগ। এ ছাড়া ইরানের অভ্যন্তরে সিস্তান-বালোচিস্তান প্রদেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলে তা গুঁড়িয়ে দিতে এই আধা সামরিক বাহিনীকেই কাজে লাগান খামেনেই। বিক্ষোভ থামাতে কোনও রকম দয়ামায়া দেখায়নি তারা।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইহুদি ও মার্কিন ফৌজ একসঙ্গে আক্রমণ শানালে শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। তাদের প্রথম আঘাতেই প্রাণ হারান খোমেনেই-সহ আইআরজিসির একগুচ্ছ কমান্ডার। কিন্তু, তাতে আধা সামরিক বাহিনীটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েনি। উল্টে ৩২টি কমান্ডে বাকি সেনা অফিসারদের ছড়িয়ে দিয়েছে তারা। নিজের সিদ্ধান্তে জোড়া শত্রুর উপর প্রত্যাঘাত শানানোর অনুমতিও তাদের দেওয়া হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, আইআরজিসির এই ধরনের রণকৌশলের জেরেই ইরানের কোমর ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা। ফলে তেহরানের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতির কথা ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংঘাত থামাতে দু’পক্ষের মধ্যে চলছে আলোচনাও। সেখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। যদিও আইআরজিসির সম্মতি না থাকলে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফেরানো কঠিন বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।