Iran Leadership Crisis Amid War

একে একে নিবিছে দেউটি, প্রায় খতম শীর্ষ নেতৃত্ব, কোথায় সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা? কারা চালাচ্ছে ইরান?

আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে যুদ্ধরত শিয়া মুলুকটি এখন এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে সামরিক শক্তির চেয়ে ‘নেতৃত্বের সঙ্কট’ বেশি করে ভাবাচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের ‘অনুপস্থিতি’তে দেশের প্রকৃত দায়িত্বে কে আছেন? নেতৃত্বের অনিশ্চয়তায় ভুগছে ইরান। এই অবস্থায় ক্ষমতার রাশ উঠবে কার হাতে তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৩:১১
Share:
০১ ১৯

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত। শিয়া মুলুকের নেতাদের খুঁজে খুঁজে নিকেশ করছে ইজ়রায়েল। ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের বেঁচে থাকা নিয়ে একাধিক বার প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। বিভিন্ন সূত্রে দাবি উঠেছে আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের উপর যে হামলা হয়, সেই হামলাতে গুরুতর জখম হয়েছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা।

০২ ১৯

এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম সিএনএন দাবি করে, মোজতবার পায়ে গুরুতর চোট। এ ছাড়াও শরীরের একাধিক অংশে আঘাত লেগেছে তাঁর। তাঁর অবস্থান নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কারণ গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি মোজতবাকে। আর তা থেকেই জল্পনা জোরালো হতে শুরু করেছে। যদিও তেহরান বার বার দাবি করেছে, মোজতবা জীবিত এবং সুস্থ আছেন।

Advertisement
০৩ ১৯

তেহরানের ধর্মীয় শাসনকে উৎখাত করার লক্ষ্যে মোজতবা-সহ ইরানের প্রথম সারির নেতাদের সরিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। ইরানের শীর্ষ স্তরের নেতাদের ‘নির্মূল’ করাই লক্ষ্য বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকারের ফৌজের।

০৪ ১৯

শিয়া অধ্যুষিত দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান, ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-র কমান্ডার এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী-সহ ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিকল্পিত ভাবে অপসারণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইজ়রায়েল। দেশটির ক্ষমতাকাঠামোর বেশ কয়েক জন উচ্চ পর্যায়ের নেতা-মন্ত্রীকে ইতিমধ্যেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে ইহুদিরা।

০৫ ১৯

খামেনেইকে হত্যা করার পর ইজ়রায়েলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে থাকা দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি আলি লারিজানিকে হত্যা। ইরানের রাজনীতিতে কট্টরপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করতেন লারিজানি। শুধু লারিজানি নন, ইজ়রায়েলি হামলায় একই সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে তাঁর পুত্র এবং দেহরক্ষীরও।

০৬ ১৯

ইরানের প্রশাসনে দীর্ঘ দিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন লারিজানি। প্রয়াত আয়াতোল্লা আলি খামেইনির সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। আবার একই সঙ্গে প্রশাসন, ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড, মধ্যমপন্থীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন তিনি।

০৭ ১৯

এ ছাড়াও ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্সও গোপন ডেরা থেকে খুঁজে বার করে হত্যা করেছে বাসিজ রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিকে, এমনটাই দাবি। ইজ়রায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজ়রায়েল কাটজ় ঘোষণা করেছেন, ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্সের রাতভর হামলায় ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী তথা ধর্মগুরু ও রাজনীতিবিদ ইসমাইল খতিবকে নির্মূল করা হয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে ইরান এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি।

০৮ ১৯

ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর মাথাদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযানের সংবাদ প্রকাশ করার সময় কাটজ় ইরানের উদ্দেশে সতর্কবার্তায় জানান, এই অভিযান এখনও শেষ হয়নি। তিনি কোনও নির্দিষ্ট অভিযানের কথা উল্লেখ না করেই জানিয়ে দেন যে, সব দিক থেকে ইরানকে বড় ধরনের চমক দেবে ইজ়রায়েলি ফৌজ।

০৯ ১৯

আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেইনিকে গত ৯ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তিনি এখনও জনসমক্ষে আসেননি। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর এবং মোজতবার ক্ষমতাগ্রহণের মাঝখানের সময় একটি অন্তর্বর্তিকালীন কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল। বর্তমান সঙ্কটে এই কাউন্সিলটিই প্রশাসনিক ভাবে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় শিয়া মুলুকটি এখন এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে সামরিক শক্তির চেয়ে ‘নেতৃত্বের সঙ্কট’ বেশি করে ভাবাচ্ছে। একে একে শীর্ষনেতৃত্ব সরে যাওয়ার ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

১০ ১৯

বেশ কিছু সূত্রের দাবি, মোজতবা বর্তমানে অজ্ঞাত কোনও নিরাপদ স্থান থেকে লিখিত বার্তার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করছেন। তাঁর হয়ে ইরানের সরকারি সংবাদসংস্থা একের পর এক বিবৃতি প্রচার করছে। সোমবার কুয়েতি সংবাদসংস্থার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মোজতবার চিকিৎসার জন্য তাঁকে মস্কোয় উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যদিও রাশিয়ার তরফে এই তথ্য নিয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।

১১ ১৯

দেশের প্রকৃত দায়িত্বে কে আছেন, সেই অনিশ্চয়তাকে আরও তীব্র করে তুলেছে মোজতবার অনুপস্থিতি। এই অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আইআরজিসি। ইরানের এই এলিট আধা সেনা বাহিনীকে ‘রাষ্ট্রের মধ্যে আরও একটি রাষ্ট্র’ বলে মনে করা হয়। এই আইআরজিসির পরিচালন কাঠামোর রাশ মোজতবার হাতেই।

১২ ১৯

সাবেক পারস্যের ‘পর্দার পিছনের শক্তি’ বলা হয় মোজতবাকে। ইরানি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে ‘সক্ষম’ এবং ‘বলশালী’ হলেন মোজতবা। তবে তাঁর বিরুদ্ধেও নেহাত কম অভিযোগ ওঠেনি। আইআরজিসি এবং বাসিজ় ভাড়াটে বাহিনীকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করেন মোজতবা। মোজতবার সিংহাসন আরোহণকে ভাল চোখে দেখেনি তেহরানের অভ্যন্তরের বিভিন্ন মহল।

১৩ ১৯

মোজতবাকে সর্বোচ্চ নেতা করতে চাপ দেয় আইআরজিসিই। সেই কথা ফেলতে পারেনি ইরানি ধর্মগুরুদের ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’। শীর্ষ নেতৃত্বের অনেক সদস্য নিহত হওয়ায় পর ইরানের শাসনভার রয়েছে বকলমে আইআরজিসি কমান্ডারদের হাতেই। সাবেক পারস্যদেশের মাটিতে তাঁদের প্রতিপত্তিই এখন সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন ইরানের জনতার একাংশ।

১৪ ১৯

যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করছে আইআরজিসিই। নেতৃত্বের এই শূন্যতায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরই এখন রাষ্ট্রের ভাগ্যবিধাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কেবল খামেনেই নন, আইআরজিসি প্রধান মহম্মদ পাকপুর এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ-সহ ডজনখানেক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এর ফলে কোনও কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছাড়াই বিভিন্ন ইউনিট বিচ্ছিন্ন ভাবে যুদ্ধ চালাচ্ছে বলে সূত্রের খবর।

১৫ ১৯

পর্দার আড়ালে ইরানের রাজনৈতিক মহল বিভক্ত। ইরানের ক্ষমতার অলিন্দে আইআরজিসি-র সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে ধরা হয়। ইরানের বিভিন্ন সরকারি পদ, সংসদ এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ আলো করে রেখেছেন এই আইআরজিসি-র সদস্যরাই। নেতৃত্বের উপর যে কোনও আঘাত সামাল দেওয়ার জন্য একমেবাদ্বিতীয়ম বলে মনে করা হয় আইআরজিসিকেই।

১৬ ১৯

ইরানের অভ্যন্তরেও রব উঠেছে যে পর পর ‘নেতৃত্ব হরণ’ হামলা এবং মোজতবার আহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আইআরজিসি তাদের স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছে। কার্যত, এটি একটি মিলিটারি জুন্টার মতো আচরণ করতে শুরু করেছে। সামরিক নেতাদের কমিটির নেতৃত্বে একটি সরকারের মতো কাজ করছে। যুদ্ধকালীন কৌশল নির্ধারণ করছে এবং অসামরিক সরকারকে ছাপিয়ে যাচ্ছে তারা।

১৭ ১৯

দেশের সঙ্কটকালে কে হাল ধরবে এই জল্পনার মধ্যেই প্রয়াত আলি লারিজানির ভাই সাদেক লারিজানির দিকে নজর ঘুরেছে সকলের । বর্তমানে এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সম্ভাব্য অন্তর্বর্তিকালীন নেতা হিসাবে উঠে আসছে তাঁর নামও। ইজ়রায়েলের মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ইগাল কারমনের মতে, আইআরজিসি-র পছন্দের প্রার্থী হতে পারেন সাদেক। কারণ আইআরজিসি একজন কট্টরপন্থী শিয়াকেই ক্ষমতার বৃত্তে রাখতে চায়।

১৮ ১৯

উত্তরাধিকারের এই লড়াইয়ের আরও একটি গুরুত্ব নাম হল মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ। তিনি সংসদের বর্তমান স্পিকার এবং আইআরজিসি-র দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আইআরজিসি বিমানবাহিনীর প্রাক্তন কমান্ডার হিসাবে পরিচিতি থাকায় গালিবফের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

১৯ ১৯

জনস হপকিন্স স্কুল অফ অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়ের অধ্যাপক ভালি নাসরের মতে, লারিজানির উত্তরসূরিকে আইআরজিসিই নিয়োগ করবে। শীর্ষনেতাদের গুপ্তহত্যা ইরানের নেতৃত্বকে আরও বেশি উগ্রপন্থাকে আঁকড়ে ধরতে উৎসাহী করছে । ইরান, ইরানের জনগণ ও এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক নাসর। তাঁর মতে, ইরান এখন এমন এক অবস্থায় আছে যেখানে মোজতবা যদি দ্রুত নিজেকে সক্রিয় শাসক হিসাবে প্রমাণ করতে না পারেন, তবে আইআরজিসি সরাসরি সামরিক শাসন জারি করতে পারে অথবা দেশ বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ভাঙনের মুখে পড়তে পারে।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement